কানাডায় বাংলাদেশি কমিউনিটি দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা, পেশা, ব্যবসা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের সাফল্য যেমন কমিউনিটির জন্য গর্বের, তেমনি সাম্প্রতিক কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নতুন করে নাগরিক আচরণ, সামাজিক দায়িত্ব ও কমিউনিটির সামগ্রিক ভাবমূর্তি নিয়ে ভাবনার সুযোগ তৈরি করেছে।
মন্ট্রিয়লের একটি সুপারমার্কেটে চুরির ঘটনায় অভিযুক্ত কয়েকজন বাংলাদেশি তরুণের সঙ্গে কথা বলার সময় একজন বাংলাদেশি কর্মীকে অনুবাদ করতে হয়েছে। আরেকটি ঘটনায় বাংলাদেশি এক দম্পতির বিরুদ্ধেও পণ্য চুরির অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনায় কানাডায় দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করা অনেক বাংলাদেশি বিব্রত ও হতাশ হয়েছেন। তবে অভিযোগ ওঠা ব্যক্তি বা কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে পুরো কমিউনিটির পরিচয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
টরন্টো, সাসকাটুনসহ বিভিন্ন শহরেও বাংলাদেশিদের কিছু আচরণ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা দেখা গেছে। পার্কে ময়লা ফেলে যাওয়া, অনুমতি ছাড়া শিশুদের ভিডিও ধারণ, জনসমক্ষে উচ্চস্বরে কথা বলা কিংবা নারীদের বিব্রত করার মতো অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের সবগুলো একই মাত্রায় সত্য বা প্রমাণিত, এমন দাবি করারও সুযোগ নেই। তবে এ ধরনের ঘটনা স্থানীয় সমাজে বাংলাদেশিদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে, তাই অভিযোগগুলো থেকে নাগরিক আচরণ ও সামাজিক সচেতনতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
কানাডায় বাংলাদেশি কমিউনিটির অবদান অবশ্য এর চেয়ে অনেক বিস্তৃত। চিকিৎসা, প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা, গবেষণা, ব্যবসা, রাজনীতি, সরকারি-বেসরকারি চাকরি ও বিভিন্ন পেশায় বাংলাদেশিরা কাজ করছেন। নিজেদের দক্ষতা, পরিশ্রম ও পেশাগত সাফল্যের মাধ্যমে অনেকেই কানাডার সমাজ ও অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। নতুন প্রজন্মও উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, পেশা ও উদ্যোক্তা কার্যক্রমে নিজেদের পরিচিতি তৈরি করছে।
কানাডায় বাংলাদেশিদের অভিবাসনের ইতিহাসও কয়েক দশকের পুরোনো। টরন্টো, মন্ট্রিয়ল, অটোয়া, ক্যালগেরি, ভ্যাঙ্কুভার ও এডমন্টনসহ বিভিন্ন শহরে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে প্রবাসীরা নিজেদের সংস্কৃতি ও পরিচয় ধরে রাখার পাশাপাশি কানাডার বহুসাংস্কৃতিক সমাজের অংশ হিসেবেও ভূমিকা রাখছেন।
সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার পর দীর্ঘদিনের প্রবাসীদের একটি অংশ মনে করছেন, নতুন-পুরোনো সবাইকে কানাডার আইন, সামাজিক শিষ্টাচার, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, পরিবেশ এবং নাগরিক দায়িত্ব সম্পর্কে আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। নতুন দেশে বসবাসের ক্ষেত্রে আইন মেনে চলা যেমন ব্যক্তিগত দায়িত্ব, তেমনি নিজের আচরণের মাধ্যমে কমিউনিটির পরিচয়কে কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে অনুমতি ছাড়া কারও ছবি বা ভিডিও ধারণ, জনসমক্ষে অন্যকে বিব্রত করা, যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলা কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানে আইনবিরুদ্ধ আচরণ করা স্থানীয় সমাজে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। এ ধরনের আচরণ এড়িয়ে চলা এবং শিশু-কিশোরদেরও স্থানীয় আইন ও সামাজিক শিষ্টাচার সম্পর্কে সচেতন করা কমিউনিটির দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত।
একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তির অপরাধ বা অসচেতনতার দায় পুরো বাংলাদেশি কমিউনিটির ওপর চাপিয়ে দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়। একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সেটি প্রমাণের আগে তাকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনার ভিত্তিতে একটি পুরো জনগোষ্ঠী সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও অনুচিত।
কানাডার বহুসাংস্কৃতিক সমাজে নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয় ধরে রাখার পাশাপাশি দেশটির আইন ও সামাজিক রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা জরুরি। একজন বাংলাদেশির সাফল্য যেমন কমিউনিটির জন্য ইতিবাচক পরিচয় তৈরি করে, তেমনি দায়িত্বহীন আচরণও সেই পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
তাই সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে পুরো কমিউনিটির বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসেবে না দেখে আত্মসমালোচনা ও সচেতনতার সুযোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে। পরিবার, কমিউনিটি সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক নেতাদেরও নতুন প্রজন্মের মধ্যে আইন মেনে চলা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি সম্মান, পরিবেশ সচেতনতা ও নাগরিক দায়িত্বের বিষয়ে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।
কানাডায় বাংলাদেশি কমিউনিটির অর্জন বহু মানুষের দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের ফল। সেই সুনাম ধরে রাখতে নতুন-পুরোনো সব প্রজন্মের দায়িত্বশীল আচরণ, পারস্পরিক সম্মান এবং স্থানীয় সমাজের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কানাডার মূলধারায় নিজেদের পরিচয়কে মর্যাদার সঙ্গে তুলে ধরাই হতে পারে প্রবাসী বাংলাদেশিদের দীর্ঘমেয়াদি সম্মিলিত লক্ষ্য। – ওয়েব পোর্টাল “প্রজন্ম কথা” থেকে













