৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আগস্টে অভিষেক, আগস্টেই বিদায়!

লাল কার্ড, ভগ্ন হৃদয়, অবসর ভেঙে ফিরে বিশ্বকাপ জয়, আর্জেন্টিনার সঙ্গে ২১ বছরের সম্পর্ক শেষ মেসির আর্জেন্টিনাকে তিনি সব কিছু দিয়েছেন। অনবরত সমালোচনা, তুলনা, দিয়েগো মারাদোনায় ছায়ায় কাটাতে হয়েছে। বিদায়বেলায় হাতে বিশ্বকাপ না থাকলেও, লিয়োনেল মেসি অবসর নিলেন মাথা উঁচু করেই।

কোনও ডিফেন্ডারকে কাটাতে হয়নি। কোনও গোলকিপারকে ধোঁকা দিতে হয়নি। কোনও বাঁপায়ের জাদু দেখাতে হয়নি। স্রেফ ডায়েরি থেকে ছেঁড়া তিনটি পাতায় কয়েকশো শব্দ। তাতেই শেষ হয়ে গেল ২১ বছরের একটি সম্পর্ক। এই ২১ বছরে তিনি যে অবিস্মরণীয় সব স্মৃতি, হাসি, কান্না, আনন্দ, উৎসবের মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন, সোমবার রাতের পর থেকে সব অতীত হয়ে গেল। লিয়োনেল মেসি রবিবার পর্যন্ত আর্জেন্টিনার অধিনায়ক ছিলেন। সোমবার থেকে ‘প্রাক্তন’ হয়ে গেলেন। থেকে গেল অভিষেকেই লাল কার্ড, প্রথম অবসর ভেঙে ফিরে বিশ্বকাপ, দু’বার ফাইনালে স্বপ্নভঙ্গের স্মৃতি।

২১ বছর ধরে তিনি বিপক্ষ ডিফেন্ডারদের অগণিত কড়া ট্যাকল সামলেছেন। কোটি কোটি ভক্তের প্রত্যাশার মূল্য দিতে চেয়েছেন। অনবরত তুলনায় বিদ্ধ হয়েছেন। আর্জেন্টিনার জার্সিতে দিয়েগো মারাদোনার ছায়ায় জীবনের অধিকাংশ সময়টা কাটিয়েছেন। সোমবার, ৩১ অগস্ট, ৩৯ বছরের ফুটবলার জীবনের শেষ ড্রিবলটা আর করতে পারলেন না। বয়স, আবেগ, প্রত্যাশার কাছে হার মেনে জানিয়ে দিলেন, এই শেষ। আর নয়। আর তাঁকে নীল-সাদা জার্সিতে দেখা যাবে না।

সত্যিই কি সোমবার মেসি অবসর নিলেন? তা তো নয়। তিনি নিজেই লম্বা বার্তায় জানিয়েছেন, অবসরের সিদ্ধান্ত লেখা হয়ে গিয়েছিল স্পেনের কাছে বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের দু’দিন পরেই। বাবার মৃত্যু, মানসিক ক্লান্তি এবং বিবিধ সমস্যা কাটিয়ে উঠে অবশেষে সোমবার সেই ঘোষণাটি করতে পেরেছেন। মাঝের এই সময়ে ক্লাবের জার্সিতে দেখে এক বারও মনে হয়নি তাঁর অবসর আসন্ন। দিন দুয়েক আগেই একটি ম্যাচে চার গোল করলেন। সমর্থকেরা বলাবলি শুরু করলেন, মেসির কাছে বয়স নেহাতই সংখ্যা। মেসি সোমবারের বার্তায় বুঝিয়ে দিলেন, বয়স সংখ্যা নয়। বয়সের কাছে হার মানতে হয় সকলকেই।

“আমার হৃদয় ভারাক্রান্ত। কিন্তু আমি জানি সেই সময়টা এসে গিয়েছে। আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর সেরা সময় এটাই।” মেসির লম্বা বার্তার আসল নির্যাস এই কয়েকটি বাক্যেই। এমন নয় যে তিনি এই ঘোষণা করে সকলকে চমকে দিয়েছেন। বরং বিশ্বকাপের আগে, মাঝে এবং পরেও জল্পনা চলছিলই। কবে বিদায় জানাবেন তিনি? অপেক্ষা ক্রমশই বেড়ে যাচ্ছিল। সোমবার মেসি সব অপেক্ষার অবসান ঘটালেন। জানিয়ে দিলেন, আর তাঁকে নিয়ে বেশি ভাবার প্রয়োজন নেই।

আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৭টি ম্যাচে ১২৫টি গোল করেছেন মেসি। আন্তর্জাতিক ফুটবলে গোলের নিরিখে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর পরেই। বিশ্বকাপে গোলের নিরিখে কিলিয়ান এমবাপের পিছনে। দেশের হয়ে ২০২১, ২০২৪-এর কোপা আমেরিকা, ২০২২-এর ফাইনালিসিমা এবং সর্বোপরি, ২০২২-এর বিশ্বকাপ রয়েছে। এ ছাড়াও দু’টি বিশ্বকাপ ফাইনালে পরাজিতের পদকও রয়েছে।

৪৭ সেকেন্ডে লাল কার্ড

এক অগস্টেই নীল-সাদা জার্সি গায়ে অভিযান শুরু হয়েছিল মেসির। বুদাপেস্টে হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে খেলতে নেমেছিলেন ১৮ বছরের মেসি। পরনে ছিল ১৮ নম্বর জার্সি। ম্যাচের ৪৭ সেকেন্ডের মাথায় ভিলমোস ভানচাক তাঁর জার্সি টেনে ধরেছিলেন। ঝাঁকড়া সোনালি চুলের বিরক্ত মেসি সপাটে চালিয়েছিলেন হাত। রেফারির নজর এড়ায়নি। অভিষেক ম্যাচে ৪৭ সেকেন্ডেই লাল কার্ড! যে কোনও ফুটবলারের কাছেই এমন ঘটনা কেরিয়ার শেষ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

মেসির ক্ষেত্রে তা হয়নি। ভাগ্যিস হয়নি! আর্জেন্টিনার হয়ে খেলা এমনিতেই সহজ নয়। প্রতিটি স্পর্শ পরীক্ষা করা হয়। প্রতিটি ব্যর্থতাকে জোরালো ভাবে তুলে ধরা হয়। বার্সেলোনার হয়ে প্রতিটি সাফল্যের সঙ্গে তুলনা করে বলা হয়েছে, কী দিয়েছেন তিনি আর্জেন্টিনাকে? কেন ক্লাবের ফর্ম দেশের হয়ে দেখাতে পারেন না?