মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট একটি দলকে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তারা উপসাগরীয় মিত্রদের ওপর ইরানের হামলার ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক হিসাব তৈরি করে। ইরানের রাজধানী তেহরানের একটি সড়কে দেশটির প্রয়াত দুই নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি এবং আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছবি সংবলিত বিলবোর্ড। ছবি: রয়টার্স ইরানের হামলায় উপসাগরীয় মিত্রদের যে ক্ষতি হয়েছে, তা পূরণ করতে ইরানের সম্পদ ব্যবহার করার কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। এমন এক সময়ে এ তথ্য সামনে এল যখন তেহরান কুয়েত ও বাহরাইনে দফায় দফায় হামলার পর আবারও নতুন করে ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
ওই সূত্র জানায়, মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট একটি দলকে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তারা উপসাগরীয় মিত্রদের ওপর ইরানের হামলার ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক হিসাব তৈরি করে। তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে কোনো ধ্বংসযজ্ঞ হলেও তার মেরামতে ইরানের সম্পদ ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করবে যুক্তরাষ্ট্র।
এর ঠিক এক দিন আগেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মহসেন রেজাই সিএনএনকে বলেছিলেন, তিন মাস ধরে চলা এই যুদ্ধের অবসান ঘটাতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই তাদের আটকে রাখা ২৪ বিলিয়ন ডলারের ইরানি সম্পদ ছেড়ে দিতে হবে।
তবে ওই সূত্র এটি স্পষ্ট করেনি যে ট্রেজারি বিভাগ ঠিক কোন ধরনের সম্পদ নিয়ে কাজ করছে। নতুন এই পদক্ষেপগুলোর বর্ণনা দেখে মনে হচ্ছে না, তারা শুধু অবরুদ্ধ সম্পদ নিয়েই কাজ করবে। ইরানের সম্পদ অন্য খাতে ব্যবহারের এই হুমকি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে থাকা ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিকে আরও ভঙ্গুর করে তুলতে পারে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলার পর এই যুদ্ধবিরতি আবারও বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে পড়েছে।
শান্তি আলোচনা এখন অনেকটাই থমকে আছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের একজন মন্ত্রী শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির জন্য একটি চিঠি নিয়ে তেহরান সফর করেছেন বলে আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা আইএসএনএ জানিয়েছে।
পাল্টাপাল্টি হামলা
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, শনিবার হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত ইরানের গোরুক এবং কেশম দ্বীপে রাডার ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। এর আগে ‘সামুদ্রিক চলাচলের জন্য হুমকি’ তৈরি করা কয়েকটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। শনিবার রাতে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানায়, প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে হুমকি তৈরি করা আরও দুটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। অন্যদিকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা কুয়েত ও বাহরাইনে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
শনিবার কুয়েতের সেনাবাহিনী জানায়, আবাসিক এলাকার ওপর দিয়ে যাওয়া সাতটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তারা প্রতিহত করেছে। এতে সম্পদের ক্ষতি হলেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। বাহরাইনেও সাইরেন বাজানো হয় এবং বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়। কুয়েত ও বাহরাইন উভয় দেশই এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
পরে ইরান দাবি করে যে তারা উভয় দেশেই মার্কিন ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আঘাত হেনেছে। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ছয়টি ক্ষেপণাস্ত্র মাঝপথেই ধ্বংস করা হয়েছে এবং সপ্তমটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারেনি।
তেহরানে পাকিস্তানের মন্ত্রী
তিন মাসের এই যুদ্ধ থামাতে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান মূলত পরোক্ষ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এই চুক্তিতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ অন্যান্য অমীমাংসিত বিষয় নিয়ে পরবর্তী সময়ে আলোচনার পথ খোলা রাখা হবে। কিন্তু দুই পক্ষই মাঝে ছোটখাটো সংঘাতে জড়িয়ে পড়ায় চুক্তিটি এখনো অধরাই রয়ে গেছে।
তেহরান চায় তাদের তেল রাজস্বের শত শত কোটি ডলারের ছাড়পত্র, অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইরানি বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া এবং হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই পরিবহন করা হতো, যা ইরান এখন কার্যত অবরুদ্ধ করে রেখেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিসহ ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে শনিবার তেহরানে পৌঁছেছেন। আইএসএনএ-এর খবর অনুযায়ী, নকভি জানিয়েছেন যে তিনি তার দেশের সেনাপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে খামেনির জন্য একটি ‘বিশেষ চিঠি’ নিয়ে এসেছেন।
ট্রাম্পের ওপর চাপ
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় এই অজনপ্রিয় যুদ্ধ শেষ করার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়ছে। তিনি এনবিসিকে জানিয়েছেন, ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির বেশির ভাগ কারখানাই ধ্বংস করা হয়েছে। তবে ইরানিদের হাতে এখনো তাদের মোট ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অবশিষ্ট রয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, ‘তাদের কাছে কিছু মিসাইল আছে, কিছু ড্রোনও আছে। আমি বলব, শতাংশের হিসাবে হয়তো তাদের ২১ বা ২২ শতাংশ মিসাইল এখনো আছে। এটা অনেক মিসাইল, কিন্তু আমরা যখন প্রথম আক্রমণ করেছিলাম, তখনকার তুলনায় কিছুই না।’ এই সংঘাতের কারণে তেলের দাম বেড়ে গেছে এবং মানবিক সহায়তাসহ অন্যান্য পণ্যের সাপ্লাই চেইন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।














