১০ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আর্ন্তজাতিক

আবারও ইরান যুদ্ধ শুরু করে রাজনৈতিক সংকটেই নিজেকে সঁপে দিলেন ট্রাম্প – দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট

আবারও ইরান যুদ্ধ শুরু করে রাজনৈতিক সংকটেই নিজেকে সঁপে দিলেন ট্রাম্প – দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি “শেষ” বলে গত বুধবার (০৯ জুলাই) ঘোষণা করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অথচ এই ঘোষণা তাকে এবং তার প্রশাসনকে আবারও একটি চেনা সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর চার মাসেরও কম সময় বাকি থাকতে – তিনি এমন এক অজনপ্রিয় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন, যা থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় তিনি দেখছেন না।

গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হওয়ার পর রিপাবলিকানরা কিছুটা আশাবাদী হয়েছিলেন। গত ফেব্রুয়ারির শেষদিকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এটি ছিল সর্বশেষ একটি যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টা, যা অন্তত কিছুদিন কার্যকর ছিল। এর আগের উদ্যোগগুলো এই পর্যায়েও আসতে পারেনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটিও ভেঙে গেল সংঘাতের জেরে।

কিন্তু, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে ফেরার রাজনৈতিক মূল্যও চুকাতে হতে পারে ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান দলকে। এজন্য রিপাবলিকান নেতারা আগেই সতর্ক করে হোয়াইট হাউসকে জানিয়েছিলেন, এই সংঘাতের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে তার চড়া মূল্য দিতে হতে পারে আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে।

এখন সেই যুদ্ধবিরতির চুক্তি ভেস্তে যাওয়ায়, রিপাবলিকানদের এমন একটি যুদ্ধ মাথায় নিয়ে নির্বাচনে নামতে হচ্ছে—যা অধিকাংশ মার্কিন ভোটারই সমর্থন করেন না। তারা এই যুদ্ধ শেষও করতে পারছেন না, আবার এই যুদ্ধ শুরু করা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতেও চান না।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সংঘাতের ঘটনায়, বুধবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম এক লাফে বেড়ে গেছে, পুঁজিবাজারেও ধস নেমেছে। সেদিনের শেষভাগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নতুন করে হামলা চালায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক বিবৃতিতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, “হরমুজ প্রণালীতে নৌযান চলাচলের স্বাধীনতাকে বিপন্ন করার ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতা আরও গুঁড়িয়ে দিতে এই হামলা চালানো হয়েছে।”

প্রতিদ্বন্দিতাপূর্ণ নির্বাচনী এলাকাগুলোতে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের সমর্থনকারী সংগঠন ‘রিপাবলিকান মেইন স্ট্রিট পার্টনারশিপ’-এর প্রেসিডেন্ট সারাহ চেম্বারলেইন বলেন, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া নিশ্চিতভাবেই আমাদের একটি বড় মাথাব্যথার কারণ।

চেম্বারলেইন বলেন, ট্রাম্পকে সমর্থন দিতে গিয়ে রিপাবলিকান ভোটাররা গত কয়েক মাস ধরে তেলের বাড়তি দাম মুখ বুজে সহ্য করছিলেন। কিন্তু এখন গ্রীষ্মকালীন ভ্রমণের (ড্রাইভিং সিজন) সময় চলে এসেছে এবং এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের কোনো স্বস্তি পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।

তিনি বলেন, “ভোটারদের কাছে মূল বিষয় হলো জীবনযাত্রার ব্যয়। আর যদি জ্বালানি তেল এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আবার বাড়তে শুরু করে, তবে তা বড় সমস্যা তৈরি করবে।।”

অবশ্য চেম্বারলেইন মনে করেন, হরমুজ প্রণালী অতিক্রমের সময় তেলবাহী ট্যাংকারগুলোতে ইরানের সাম্প্রতিক হামলার ক্ষয়ক্ষতি রিপাবলিকান প্রার্থীদের এমনভাবে তুলে ধরা উচিত—যাতে সেটি এই বার্তা দেয় যে, যুদ্ধ শুরু করা ছাড়া ট্রাম্পের কাছে আর কোনো উপায় ছিল না। তিনি বলেন, “তিনি (ট্রাম্প) ইরানকে এভাবে যা খুশি তা করতে দিতে পারেন না।”

বুধবার হোয়াইট হাউসও ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের পক্ষে সাফাই গেয়েছে। তারা বলেছে, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে প্রেসিডেন্টের নেওয়া পদক্ষেপ সম্পূর্ণ যৌক্তিক।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস এক বিবৃতিতে বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জনমত জরিপের ওঠানামার ওপর ভিত্তি করে এসব সিদ্ধান্ত নেন না, বরং মার্কিন জনগণের সর্বোচ্চ স্বার্থ বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেন।”

এই যুদ্ধ এবং এর প্রভাব ট্রাম্পের জন্য বড় ধরনের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত একাধিক জাতীয় জনমত জরিপ অনুযায়ী, অধিকাংশ আমেরিকানই এই সংঘাতে ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

জুনের মাঝামাঝি সময়ে নেওয়া ফক্স নিউজের এক জরিপে দেখা গেছে, ৫৮ শতাংশ নিবন্ধিত মার্কিন ভোটার মনে করেন ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করার সিদ্ধান্তটি যুক্তরাষ্ট্রের ভুল ছিল। অন্যদিকে ৪১ শতাংশ ভোটার একে সঠিক সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন। ওই জরিপে অংশ নেওয়া ৮৭ শতাংশ মানুষ ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাত এড়ানো গুরুত্বপূর্ণ বলে মত দিয়েছেন, যার মধ্যে ৫৯ শতাংশই একে “অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ” বলে মনে করেন।

এমন প্রেক্ষাপটে, ভেঙে যাওয়া যুদ্ধবিরতি নিয়ে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা মূলত নীরব ভূমিকা পালন করছেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই তাঁরা একদিকে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন বজায় রাখা এবং অন্যদিকে তাঁদের নির্বাচনী এলাকার জনগণের যুদ্ধবিরোধী মনোভাবের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন। খুব কম রিপাবলিকানই এই সংঘাতের সরাসরি নিন্দা জানিয়ে দল থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছেন। এদের মধ্যে সবচেয়ে সোচ্চার কণ্ঠস্বর ছিলেন কেনটাকির রিপাবলিকান থমাস ম্যাসি। মে মাসে তিনি এই যুদ্ধ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন, যার ফলে পরবর্তীতে ট্রাম্পের সমর্থনপুষ্ট এক প্রার্থীর কাছে তিনি রিপাবলিকান দলের প্রাইমারিতে হেরেও যান।

বুধবার ম্যাসি এই যুদ্ধ এবং একই সঙ্গে রিপাবলিকান নেতাদের নিয়ে উপহাস করেন, যেখানে বলা হয়েছিল যে তাঁরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সিনেটর মিচ ম্যাককনেলের সঙ্গে কথা বলেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ম্যাসি রসিকতা করে বলেন যে, তিনিও ম্যাককনেলের সঙ্গে কথা বলেছেন।

ব্যঙ্গাত্মক এক পোস্টে ম্যাসি লেখেন, “তিনি (ম্যাককনেল) বলেছেন, আমাদের উচিত ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ করা, ইসরায়েলকে সাহায্য দেওয়া বন্ধ করা, ওয়ারেন্ট ছাড়া মার্কিন নাগরিকদের ওপর নজরদারি চালানো বন্ধ করা এবং আমার প্রাইমারি নির্বাচনের ফলাফল যে এমন হয়েছে— সেজন্য তিনি সত্যিই দুঃখিত।”

এদিকে ডেমোক্র্যাটরা যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যাওয়াকে ট্রাম্পের সমালোচনার হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তারা এই যুদ্ধকে সাধারণ আমেরিকানদের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সংকটের সঙ্গে যুক্ত করছেন, যা আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাদের প্রধান রাজনৈতিক এজেন্ডায় রূপ নিচ্ছে। গত কয়েক মাস ধরেই ডেমোক্র্যাটিক পার্টি যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে জড়ানোর বিষয়ে প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তকে অবিবেচকের মতো পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করে আসছে। তারা বারবার একে ট্রাম্পের “নিজের ইচ্ছায় চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ” বলে অভিহিত করছে।

নিউইয়র্কের ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা ড্যান গোল্ডম্যান সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, “খাবার, বাড়িভাড়া এবং স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক চাহিদার খরচ যখন ক্রমাগত বেড়েই চলেছে, তখন ট্রাম্পের এই অবিবেচকের মতো ইরান যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে আমেরিকানরা এখন বিমান ভাড়ার ক্ষেত্রেও আকাশচুম্বী দাম দিতে বাধ্য হচ্ছে।” তিনি আরও যোগ করেন, “প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তা রাখা হয়নি। তিনি (ট্রাম্প) যে জীবনযাত্রার ব্যয়সংকট সমাধানের দাবি করেছিলেন, তাঁর নীতি মূলত সেই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে।”

ডেমোক্র্যাটরা এই সুযোগে কংগ্রেসে আবারও ‘ওয়ার পাওয়ার্স রেজ্যুলিউশন’ পাসের দাবি তুলেছে, যার মাধ্যমে ট্রাম্পকে ইরানের সঙ্গে এই সংঘাত থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারে বাধ্য করা যাবে।

১৯৭৩ সালের ‘ওয়ার পাওয়ার্স রেজ্যুলিউশন’অনুযায়ী, কংগ্রেস নির্দেশ দিলে প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া বিদেশে যুদ্ধে লিপ্ত বাহিনীকে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য থাকবেন। যদিও দীর্ঘকাল ধরে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট- উভয় দলের প্রেসিডেন্টরাই তাদের মেয়াদকালে এই আইনি প্রক্রিয়ার সাংবিধানিক বৈধতা প্রশ্ন তুলে এসেছেন।

ইরানের ওপর নতুন করে মার্কিন হামলার পর তুরস্কের আঙ্কারায় ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা চলতে পারে। তবে তিনি ইরানি নেতাদের “অসুস্থ” বলে আখ্যায়িত করেন এবং ইঙ্গিত দেন যে তাদের সঙ্গে পরবর্তী আলোচনা হবে স্রেফ “সময়ের অপচয়”। বুধবার তিনি ইরানের অবকাঠামো ধ্বংস করার বিষয়েও প্রকাশ্যে নিজের চিন্তাভাবনা প্রকাশ করেন।

ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপের কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, “আমরা মাত্র একদিনেই ইরানের প্রতিটি সেতু গুঁড়িয়ে দিতে পারি। এ ব্যাপারে তাদের কিছুই করার থাকবে না। … যদি প্রয়োজন হয়, আমরা সেগুলোকে ধ্বংস করব। তাদের লোনা পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট (ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট) রয়েছে। প্রয়োজন হলে আমরা সেগুলোও গুঁড়িয়ে দেব। … হয়তো আমরা খার্গ দ্বীপের নিয়ন্ত্রণও নিজেদের হাতে নিয়ে নেব।”