২২শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

অর্থনীতি

মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের নতুন চুক্তিতে এবার এয়ারবাসের ১০টি উড়োজাহাজ কিনছে বাংলাদেশ বিমান

মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের নতুন চুক্তিতে এবার এয়ারবাসের ১০টি উড়োজাহাজ কিনছে বাংলাদেশ বিমান

রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার জন্য আগামী ৩১ আগস্টের মধ্যে আরও একটি মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের চুক্তি স্বাক্ষর করতে যাচ্ছে। মার্কিন এভিয়েশন জায়ান্ট বোয়িংয়ের সঙ্গে সাম্প্রতিক ৩৭০ কোটি ডলারের চুক্তির পর – এটি হতে যাচ্ছে বিমানের দ্বিতীয় বড় ক্রয়াদেশ।

“সরকার এয়ারবাসের ১০টি এয়ারক্রাফট (উড়োজাহাজ) কেনার প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে,” টিবিএস-কে গতকাল এ কথা জানান বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। তিনি বলেন, “আমরা আশা করছি ৩১ আগস্টের মধ্যে চুক্তিটি সই করতে পারব।”

তিনি আরও বলেন, “তবে এয়ারবাসের উড়োজাহাজগুলো এখনই পাওয়া যাবে না। ২০৩১ সাল থেকে ডেলিভারি শুরু হতে পারে। তাই নতুন উড়োজাহাজ না আসা পর্যন্ত লিজে (ইজারায়) উড়োজাহাজ এনে আমাদের বহর শক্তিশালী করতে হবে।”

আলোচনা এখনো অব্যাহত রয়েছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী মিল্লাত বলেন, চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পর মূল্য এবং অন্যান্য শর্তাবলীসহ কেনাকাটার বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করা হবে।

ফার্নবোরো এয়ারশোতে আলোচনার অগ্রগতি

এয়ারবাস সূত্র জানায়, যুক্তরাজ্যের ফার্নবোরো ইন্টারন্যাশনাল এয়ারশো ২০২৬-এ প্রস্তাবিত এই চুক্তিটি নতুন গতি পায়, যেখানে চুক্তি স্বাক্ষরের সময়সূচি নিয়ে আলোচনার জন্য গতকাল এয়ারবাস ও বিমানের কর্মকর্তারা বৈঠক করেন।

দক্ষিণ এশিয়ায় দায়িত্বরত এয়ারবাসের এক মুখপাত্র টিবিএসকে বলেন, “ফার্নবোরো এয়ারশোর বৈঠকে প্রস্তাবিত চুক্তির অগ্রগতি এবং সময়সীমার পরবর্তী ধাপগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে।” তিনি জানান, জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স চলতি সপ্তাহে এয়ারবাসের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে আগামী ৩১ আগস্টের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

এয়ারবাসের মুখপাত্র বলেন, “এই প্রথমবারের মতো আমরা বিমানের কাছ থেকে এমন স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি পেয়েছি।”

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কায়জার সোহেল আহমেদ—ফ্লাইট অপারেশনস, ইঞ্জিনিয়ারিং ও কর্পোরেট প্ল্যানিং বিভাগের চারজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে এয়ারশোতে যোগ দিতে গত ১৯ জুলাই যুক্তরাজ্যে যান।

প্রস্তাবের আলোচনা এগিয়ে নিতে সম্প্রতি ঢাকায় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম, প্রতিমন্ত্রী মিল্লাত এবং বিমানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন এয়ারবাসের ভাইস-প্রেসিডেন্ট এডওয়ার্ড ডেলাহাই।

বিমানের বহর সম্প্রসারণের পরিকল্পনা

জাতীয় পতাকাবাহী বিমানকে আধুনিকায়ন, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ জোরদার করা এবং বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক যাত্রী ও কার্গো হাবে পরিণত করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে, ২০৩৪-৩৫ অর্থবছরের মধ্যে বিমানের বহর ৪৭টি উড়োজাহাজে উন্নীত করার এক দীর্ঘমেয়াদী রোডম্যাপ পর্যালোচনা করছে সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় প্রস্তাবিত এই ক্রয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিমান বাংলাদেশ বর্তমানে ১৯টি উড়োজাহাজ পরিচালনা করছে, যার মধ্যে ১৪টিই বোয়িংয়ের তৈরি। বোয়িং ও এয়ারবাসের নতুন অর্ডারগুলো বাস্তবায়িত হলে, বহরের আকার বেড়ে ৪৩টি উড়োজাহাজে দাঁড়াবে।

অবশ্য কোনো নির্মাতার কাছ থেকেই ২০৩০ সালের আগে নতুন উড়োজাহাজ পাওয়ার সম্ভাবনা না থাকায়, বহরের ঘাটতি মেটাতে আগামী বছরের মধ্যে ১০টি উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে বিমান।

খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, চলতি বছরের শেষের দিকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল চালু হওয়ার পর – যাত্রী চাহিদা বৃদ্ধি ও অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে – বাংলাদেশের এয়ারলাইনগুলো তাদের বহর সম্প্রসারণ করছে।

পর্ষদের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষা

এয়ারবাস জানিয়েছে, বাংলাদেশ সরকার প্রকাশ্যে এয়ারবাসের উড়োজাহাজ কেনার আগ্রহ প্রকাশ করলেও—চুক্তিটির জন্য এখনো অভ্যন্তরীণ কর্পোরেট ও সরকারি অনুমোদনের প্রয়োজন রয়েছে।

এয়ারবাসের মুখপাত্র বলেন, “যদিও বিমানের পরিচালনা পর্ষদ আগেই কিছু বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছিল, কিন্তু ডাউন পেমেন্টের (অগ্রিম অর্থ প্রদান) বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ফলে চুক্তি স্বাক্ষরের আগে প্রস্তাবটি আবারও পর্ষদের সামনে উপস্থাপন করতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, উড়োজাহাজ কেনাকাটায় অগ্রিম অর্থ প্রদান একটি আন্তর্জাতিক নিয়ম। সাধারণত চুক্তির মোট মূল্যের প্রায় ১ শতাংশ অগ্রিম হিসেবে পরিশোধ করতে হয়, তবে আলোচনার ওপর ভিত্তি করে এই পরিমাণের তারতম্য হতে পারে।

বিমানের ভারপ্রাপ্ত মুখপাত্র মো. মহিউদ্দিন নিশ্চিত করেছেন যে বর্তমানে সরকারের অনুমোদন প্রক্রিয়ার কাজ চলছে।

উড়োজাহাজের দাম সম্পর্কিত প্রশ্নে এয়ারবাসের মুখপাত্র বলেন, “আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে আমরা দাম জনসম্মুখে প্রকাশ করতে পারছি না। তবে চুক্তি স্বাক্ষরের পর ক্রেতা এটি প্রকাশ করতে পারে।”

এভিয়েশন বিষয়ক সংবাদ পোর্টাল ‘সিম্পল ফ্লাইং’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের শেষের দিকে এয়ারবাসের ফ্ল্যাগশিপ ‘এ৩৫০-৯০০’ ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজের আনুমানিক তালিকাভুক্ত মূল্য (লিস্ট প্রাইস) ছিল ৩১.৭৪ কোটি ডলার। তুলনামূলক বড় ‘এ৩৫০-১০০০’-এর মূল্য ছিল ৩৬.৬৫ কোটি ডলার। এছাড়া ‘এ৩২০সিইও’-র তালিকাভুক্ত মূল্য ছিল ১০.১ কোটি ডলার এবং ‘এ৩২০নিও’-র দাম ছিল ১১.০৬ কোটি ডলার।

এয়ারবাসের সংশোধিত প্রস্তাব

এয়ারবাস ও বাংলাদেশ বিমানের সূত্রগুলো জানিয়েছে, গত এপ্রিলে বোয়িংয়ের সঙ্গে বিমানের চুক্তি হওয়ার পর ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা এয়ারবাস তাদের আগের ১৪টি উড়োজাহাজ সরবরাহের প্রস্তাব সংশোধন করে ১০টিতে নামিয়ে এনেছে।

বিমানের টেকনো-ফাইন্যান্স কমিটিতে জমা দেওয়া সর্বশেষ প্রস্তাবে, চারটি ‘এ৩৫০-৯০০’ ওয়াইড-বডি ও ছয়টি ‘এ৩২১নিও’ ন্যারো-বডি উড়োজাহাজের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

গত ৩০ এপ্রিল বোয়িংয়ের সঙ্গে ৩.৭ বিলিয়ন ডলারের চুক্তিতে ৮টি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, ২টি বোয়িং ৭৭৭-৯ এবং ৪টি বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স উড়োজাহাজসহ মোট ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করে বিমান। সেই চুক্তি স্বাক্ষরের তিন মাসেরও কম সময়ের মধ্যে এয়ারবাস এই সংশোধিত প্রস্তাব দিল।

বিমানের ভবিষ্যৎ বহরে স্থান পেতে এয়ারবাস ও বোয়িংয়ের মধ্যে কয়েক বছর ধরে প্রতিযোগিতা চলছে, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ উভয় তরফ থেকেই উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক আগ্রহ দেখানো হচ্ছে।

মিশ্র বহর নিয়ে বিতর্ক

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এম মফিদুর রহমান জানান, তিনি বোয়িং ও এয়ারবাস উভয় ব্র্যান্ডের উড়োজাহাজের সমন্বয়ে গঠিত ‘মিশ্র বহর’ (মিক্সড ফ্লিট)-এর সমর্থক।

মফিদুর রহমানের মতে, একটি মাত্র নির্মাতার ওপর একক নির্ভরতা এয়ারলাইনের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে; কারণ সেই কোম্পানির উড়োজাহাজে কোনো প্রযুক্তিগত বা নিয়ন্ত্রণমূলক সমস্যা দেখা দিলে এয়ারলাইনের সামগ্রিক পরিচালন কার্যক্রম ঝুঁকিতে পড়ে। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, দুই প্রস্তুতকারকের উড়োজাহাজ একসঙ্গে পরিচালনা করলে রক্ষণাবেক্ষণ খরচ, কর্মীদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা এবং প্রযুক্তিগত জটিলতা বাড়বে।

তিনি বলেন, “মিশ্র বহর পরিচালনায় নিশ্চিতভাবেই অতিরিক্ত খরচ জড়িত। তবে সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এর থেকে কৌশলগত সুবিধা পাওয়া সম্ভব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিমানকে একটি সুনির্দিষ্ট বাণিজ্যিক ও পরিচালন পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে, যাতে এই বিনিয়োগ থেকে কী সুবিধা পাওয়া যাবে—তা সরকার এবং দেশের জনগণ স্পষ্টভাবে বুঝতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, বিমানের রাজস্ব ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগী সক্ষমতা বাড়ানোর বড় সুযোগ রয়েছে, তবে সেই লক্ষ্য অর্জনে পেশাদার ব্যবস্থাপনা, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদী কৌশল প্রয়োজন।

ইউরোপের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা

খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী বহর সম্প্রসারণ কর্মসূচিতে নিজেদের প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখার কৌশলগত অংশ হিসেবে এয়ারবাস তাদের মূল প্রস্তাবটি পুনর্বিন্যাস ও ছোট করেছে।

কোম্পানিটি আগে ১০টি এ৩৫০ ওয়াইড-বডি এবং ৪টি এ৩২০নিও ন্যারো-বডি উড়োজাহাজসহ মোট ১৪টি উড়োজাহাজ সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছিল। একটি ভারসাম্যপূর্ণ ক্রয় কৌশলের অংশ হিসেবে এয়ারবাসের উড়োজাহাজ বিবেচনা করার জন্য ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও জার্মানির কূটনীতিকরা বাংলাদেশকে বারবার তাগিদও দিয়ে আসছিলেন।

২০২৩ সালে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর বাংলাদেশ সফর এবং বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য যৌথ ঘোষণায় ফ্রেইটারসহ ১০টি এয়ারবাস এ৩৫০ উড়োজাহাজ সংগ্রহের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করার পর এয়ারবাসের প্রচারণা গতি পায়।

গত বছরের ৪ নভেম্বর ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত এবং হাইকমিশনাররা বিমানের বোয়িং-নির্ভর বহরে বৈচিত্র্য আনার জন্য প্রকাশ্যে আহ্বান জানান। তাঁদের যুক্তি ছিল, আরও ভারসাম্যপূর্ণ বহর বিমানের পরিচালন সক্ষমতা এবং প্রতিযোগিতা করার সামর্থ্য বাড়াবে।

এই বিষয়ের সাথে পরিচিত সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রস্তাবটি নিয়ে আলোচনার জন্য চলতি মাসে ইউরোপীয় দূত এবং বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্যে অন্তত দুটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।