১৯শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার ইলন মাস্ক

নজরুল ইসলাম মিন্টু: রাতের আকাশে মানুষ সাধারণত তারা দেখে। কেউ দেখে সৌন্দর্য, কেউ দেখে রহস্য, কেউ দেখে দূরের আলো। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ার এক কিশোর সেই আকাশে দেখেছিল সম্ভাবনা। তখনও সে জানত না, একদিন তার কল্পনা রকেট হয়ে আকাশে উঠবে, গাড়ি হয়ে রাস্তায় নামবে, স্যাটেলাইট হয়ে পৃথিবী ঘিরে ঘুরবে, আর প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে মানবসভ্যতাকে নতুন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করাবে। ছেলেটির নাম ইলন রিভ মাস্ক।

বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। শুধু সম্পদের হিসাবে তিনি ধনী নন, ধনসম্পদের ভাষাও যেন তিনি নতুন করে লিখে দিয়েছেন। ২০২৬ সালের জুনে তাঁর সম্পদ এক ট্রিলিয়ন ডলারের সীমা ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু এই গল্পটি শুধু অর্থের নয়। এটি একটি অদ্ভুত মনের গল্প। সাফল্য, ব্যর্থতা, জেদ, বিতর্ক এবং ভবিষ্যৎকে নিজের হাতে টেনে আনার এক বিপজ্জনক উচ্চাকাঙ্ক্ষার গল্প।

১৯৭১ সালের ২৮ জুন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ায় জন্ম নেন ইলন মাস্ক। মায়ের নাম মায়ে মাস্ক, কানাডায় জন্ম নেওয়া মডেল ও পুষ্টিবিদ। বাবা এরল মাস্ক, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রকৌশলী ও ব্যবসায়ী। পরিবারটি শিক্ষিত, স্বচ্ছল, উচ্চাভিলাষী হলেও ইলনের শৈশব রঙিন ছিল না।

সে ছিল বইপোকা। স্কুলের আড্ডার চেয়ে বইয়ের পাতায় তার আশ্রয় ছিল বেশি। বন্ধুরা যখন মাঠে ছুটত, সে ডুবে থাকত বিজ্ঞানকল্প, কম্পিউটার আর মহাকাশের গল্পে। শিশুকালেই তার ভেতরে তৈরি হয় এক অদ্ভুত অভ্যাস, কোনো জিনিস শুধু ব্যবহার করা নয়, জিনিসটি কীভাবে কাজ করে তা বুঝতে হবে। পৃথিবীকে সে দেখত খুলে রাখা যন্ত্রের মতো।

মাত্র ১২ বছর বয়সে সে নিজেই একটি ভিডিও গেম বানায়। নাম দেয় Blastar। পরে সেটি একটি কম্পিউটার ম্যাগাজিনে বিক্রি করে। অনেক শিশুর কাছে এটি হতো আনন্দের ঘটনা। ইলনের কাছে ছিল সংকেত। সে বুঝে গেল, মাথার ভেতরের অদৃশ্য ধারণাও একদিন বাস্তব জিনিসে পরিণত হতে পারে।

ব্যক্তিগত জীবনে সে সহজ পথ পায়নি। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ, স্কুলে একাকিত্ব, অপমান ও কঠিন সম্পর্ক তাঁর ভেতরে এক ধরনের কঠোরতা তৈরি করে। শৈশব তাঁকে কোমল করেনি, বরং ভেতরে জেদ জমিয়েছে। এই জেদই পরবর্তীতে তাঁর শক্তি হয়েছে, আবার অনেক বিতর্কের উৎসও হয়েছে।

ইলন মাস্ক দক্ষিণ আফ্রিকা ছাড়েন মূলত আমেরিকায় পৌঁছানোর পথ খুঁজতে। তাঁর মা কানাডিয়ান হওয়ায় কানাডার পাসপোর্ট পাওয়ার সুযোগ ছিল। দক্ষিণ আফ্রিকার বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা, বর্ণবৈষম্যের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং প্রযুক্তির বড় মঞ্চে পৌঁছানোর স্বপ্ন, সব মিলিয়ে কানাডা হয় তাঁর প্রথম সেতু।

কানাডায় এসে কোনো রাজকীয় জীবন তিনি পাননি। আত্মীয়ের বাড়ি, ছোটখাটো কাজ, অনিশ্চয়তা, শীত, অচেনা দেশ, সবকিছুর ভেতর দিয়ে তাঁকে যেতে হয়েছে। পরে Queen’s University-তে পড়াশোনা, তারপর যুক্তরাষ্ট্রে University of Pennsylvania। অর্থনীতি ও পদার্থবিজ্ঞান, দুই দিকেই তাঁর আগ্রহ। কারণ তাঁর কাছে অর্থনীতি ছিল পৃথিবীর চলার হিসাব, আর পদার্থবিজ্ঞান ছিল মহাবিশ্বের চলার নিয়ম।

১৯৯৫ সালে ইলন মাস্ক Stanford University-তে পিএইচডি করতে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু মাত্র দুই দিন পরই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, তাঁর জায়গা ক্লাসরুমে নয়, ইন্টারনেটের নবীন দুনিয়ায়। তখনও ইন্টারনেট আজকের মতো সর্বব্যাপী হয়ে ওঠেনি। সবাই বুঝতে পারেনি, এই অদৃশ্য নেটওয়ার্ক একদিন দোকান, পত্রিকা, ব্যাংক, রাজনীতি, সম্পর্ক, সংবাদ, সবকিছু বদলে দেবে।

মাস্ক বুঝেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন। অতঃপর ভাই কিম্বল মাস্ককে সঙ্গে নিয়ে তিনি শুরু করেন Zip2। এটি সংবাদপত্র ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে অনলাইন ম্যাপ এবং ডিরেক্টরি সেবা দিত। আজ এটি সাধারণ মনে হলেও নব্বইয়ের দশকে ধারণাটি ছিল সময়ের চেয়ে এগিয়ে। মানুষ যখন কাগজের ফোনবুক ও মুদ্রিত বিজ্ঞাপনে অভ্যস্ত, মাস্ক তখন পর্দায় পথ খোঁজার ভবিষ্যৎ দেখছিলেন।

১৯৯৯ সালে Compaq কোম্পানি Zip2 কিনে নেয় ৩০৭ মিলিয়ন ডলারে। মাস্ক পান প্রায় ২২ মিলিয়ন ডলার। অনেকেই এত টাকা পেলে নিরাপদ জীবন বেছে নিতেন। মাস্ক করলেন উল্টো কাজ। তিনি ঝুঁকি আরও বাড়ালেন।

Zip2 বিক্রির টাকা দিয়ে তিনি শুরু করলেন X.com। এটি ছিল অনলাইন ব্যাংকিংয়ের ধারণা। তখন মানুষ ইন্টারনেটে টাকা পাঠাতে ভয় পেত। মাস্ক ভাবলেন, টাকা কেন কাগজে থাকবে, ব্যাংকের কাউন্টারে থাকবে? টাকা তো তথ্যও হতে পারে। যদি মেইল পাঠানো যায়, টাকা পাঠানো যাবে না কেন?

X.com পরে Confinity-এর সঙ্গে একীভূত হয়, এবং জন্ম নেয় PayPal। সেখানে ক্ষমতার লড়াই, মতবিরোধ, পরিচালনা-সংকট, সবই ছিল। মাস্ক এক সময় সিইও পদ থেকেও সরে যান। কিন্তু PayPal তাঁকে শুধু অর্থ দেয়নি, বড় ঝুঁকি নেওয়ার সাহসও দিয়েছে। ২০০২ সালে eBay কোম্পানি PayPal কিনে নেয় ১.৫ বিলিয়ন ডলারে। মাস্ক পান বিশাল অঙ্কের অর্থ।

২০০২ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন SpaceX। লক্ষ্য ছিল মহাকাশযাত্রাকে রাষ্ট্রীয় প্রকল্পের বাইরে এনে বেসরকারি উদ্যোগের ভেতরে দাঁড় করানো। তাঁর বড় স্বপ্ন ছিল মানুষকে এক গ্রহে আটকে না রাখা। প্রথম দিকে SpaceX ছিল হাসির খোরাক। রকেট বানানো কি কোনো তরুণ ইন্টারনেট উদ্যোক্তার কাজ? রাষ্ট্র ও মহাকাশ সংস্থাগুলো যেখানে দশকের পর দশক ধরে কাজ করছে, সেখানে বেসরকারি কোম্পানি এসে কী করবে?

ইলন মাস্কের Falcon 1 রকেটের প্রথম তিনটি উৎক্ষেপণ পরপর ব্যর্থ হয়। প্রতিটি ব্যর্থতা মানে ছিল কোটি কোটি ডলার পুড়ে যাওয়া। SpaceX প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার মুখে ছিল। চতুর্থ উৎক্ষেপণের সাফল্য তাই শুধু প্রযুক্তিগত বিজয় ছিল না, ছিল মাস্কের উদ্যোক্তা জীবনের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত।

পরবর্তীতে NASA-র সঙ্গে চুক্তি হয়। তারপর SpaceX মহাকাশ ব্যবসার নিয়ম বদলে দেয়। রকেট একবার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া নয়, আবার ফিরিয়ে এনে ব্যবহার করা যায়, এই ধারণাই বদলে দেয় খরচের অঙ্ক। যে মহাকাশ একসময় প্রায় পুরোপুরি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে ছিল, মাস্ক সেখানে বেসরকারি ব্যবসার নতুন দরজা খুলে দেন।

ইলন মাস্ক Tesla প্রতিষ্ঠা করেননি। তবে তিনি ছিলেন কোম্পানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক বিনিয়োগকারীদের একজন। পরে তিনিই Tesla-র মুখ হয়ে ওঠেন এবং ২০০৮ সালে সিইও হন। সেই সময় বৈদ্যুতিক গাড়ি নিয়ে দুনিয়ার বড় গাড়ি কোম্পানিগুলোর আগ্রহ সীমিত। অনেকের চোখে ইলেকট্রিক কার ছিল দুর্বল, ধীর, অপ্রয়োজনীয়। মাস্ক Tesla-কে শুধু গাড়ি কোম্পানি হিসেবে দেখেননি। তিনি দেখেছিলেন জ্বালানির রাজনীতির বিপরীতে এক প্রযুক্তিগত বিদ্রোহ। পেট্রোলের যুগ থেকে ব্যাটারির যুগে যাওয়ার সাহসী ঘোষণা।

ইলন মাস্কের ব্যবসার ধরন আলাদা। তিনি সাধারণত শুধু প্রচলিত লাভের অঙ্ক দেখে কোম্পানি শুরু করেন না। তিনি বড় সমস্যাকে সামনে রাখেন। রকেটের খরচ থেকে SpaceX, পেট্রোলনির্ভর গাড়ির বিপরীতে Tesla, বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেটের স্বপ্ন থেকে Starlink, মস্তিষ্ক ও কম্পিউটারের সংযোগ থেকে Neuralink, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ থেকে xAI। এই মানসিকতা তাঁকে সাহসী করেছে, একই সঙ্গে বেপরোয়া বলেও চিহ্নিত করেছে।

মাস্কের ব্যক্তিগত জীবনও তাঁর ব্যবসার মতোই আলোচিত। প্রথম স্ত্রী কানাডিয়ান লেখক Justine Wilson। তাঁদের পরিচয় বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে, বিয়ে ২০০০ সালে, বিচ্ছেদ ২০০৮ সালে। এরপর ব্রিটিশ অভিনেত্রী Talulah Riley-কে তিনি দুবার বিয়ে করেন এবং দুবারই বিচ্ছেদ ঘটে। কানাডিয়ান সংগীতশিল্পী Grimes এবং Neuralink নির্বাহী Shivon Zilis-এর সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ও সন্তান নিয়ে বিশ্বমাধ্যমে আলোচনা হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তাঁর সন্তানসংখ্যা ১৪ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইলন মাস্ক বহুবার বলেছেন, জন্মহার কমে যাওয়া মানবসভ্যতার জন্য বড় ঝুঁকি। তাঁর সন্তানসংখ্যা নিয়ে আলোচনা তাই শুধু ব্যক্তিগত কৌতূহল নয়, তাঁর দর্শনের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যায়।

২০২২ সালে ইলন মাস্ক Twitter কিনে নেন এবং পরে নাম বদলে করেন X। তাঁর লক্ষ্য ছিল এটিকে একটি “everything app” বানানো, যেখানে সামাজিক যোগাযোগ, সংবাদ, ভিডিও, মতামত ও পেমেন্ট এক জায়গায় থাকবে। কিন্তু অধিগ্রহণের পর কর্মী ছাঁটাই, কনটেন্ট নীতির বদল এবং রাজনৈতিক বিতর্ক X-কে প্রযুক্তি-জগতের সবচেয়ে আলোচিত প্ল্যাটফর্মে পরিণত করে।

মাস্ক নিজেও এই প্ল্যাটফর্মের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যবহারকারীদের একজন। তাঁর একেকটি পোস্ট শেয়ারবাজার কাঁপাতে পারে, রাজনীতি উত্তপ্ত করতে পারে।

ইলন মাস্কের প্রভাব এখন শুধু প্রযুক্তি বা ব্যবসার ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই। রাজনীতি, শেয়ারবাজার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সব জায়গাতেই তাঁর উপস্থিতি আলোচনার জন্ম দেয়। এই প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাঁর অভূতপূর্ব সম্পদের হিসাব।

এক ট্রিলিয়ন ডলার সংখ্যাটি সাধারণ কল্পনায় ধরা কঠিন। সহজ করে বললে, এক ট্রিলিয়ন ডলার পৃথিবীর প্রায় ৮১০ কোটি মানুষের মধ্যে ভাগ করলে মাথাপিছু পড়বে প্রায় ১২৩ ডলার। আর ১.১ ট্রিলিয়ন ডলার হলে তা দাঁড়ায় প্রায় ১৩৬ ডলার। এটি বাস্তব বণ্টনের প্রস্তাব নয়, শুধু সংখ্যাটির আকার বোঝানোর একটি সহজ হিসাব।

ইলন মাস্কের জীবন তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণা। তাঁর জীবন শেখায়, বড় স্বপ্ন দেখতে হয়, কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তব করতে পরিকল্পনা, পরিশ্রম ও ঝুঁকি নেওয়ার সাহস লাগে। ব্যর্থতা মানেই শেষ নয়, যদি আবার উঠে দাঁড়ানোর শক্তি থাকে।

ইলন মাস্কের গল্প কেবল পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষের গল্প নয়। এটি সময়ের গল্প। এমন এক সময়ের গল্প, যখন প্রযুক্তি রাজনীতিকে প্রভাবিত করে, ব্যবসা মহাকাশে যায়, আর একজন মানুষের ধারণা কোটি মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে।

প্রিটোরিয়ার সেই কিশোর একদিন আকাশের দিকে তাকিয়েছিল। আজও সে তাকিয়ে আছে। পার্থক্য শুধু এতটুকু, এখন তার হাতে রকেট আছে। তথ্যসূত্র: Forbes (১২ জুন, ২০২৬) Reuters (১২ জুন, ২০২৬) নজরুল ইসলাম মিন্টু কানাডা থেকে প্রকাশিত দেশেবিদেশে পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ।