বাংলাদেশ সোসাইটি নিউইয়র্ক আয়োজিত মতবিনিময় সভায় শ্রম ও কর্ম সংস্থান এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী অতীতের ভেদাভেদ ভুলে স¤প্রীতির নতুন বাংলাদেশ গড়তে প্রবাসীদের সহযোগিতা কামনা করে বলেছেন, নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে নতুন সরকার নতুন বাংলা গড়তে কাজ শুরু করেছে। সিলেট সহ দেশব্যাপী আগামী তিন মাসের মধ্যে মহাসড়ক, রেলপথ ও বিমানবন্দর সহ সকল পর্যায়েই সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ড দৃশ্যমান হবে। মন্ত্রী বলেন, আমি একসময় প্রবাসী ছিলাম, দেশের প্রধানমন্ত্রীও দীর্ঘদিন প্রবাসী ছিলেন, তাই প্রবাসীদের সমস্যা আমরা জানি-বুঝি। সরকার প্রবাসীদের সমস্যার সমাধানে সাধ্যমত সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করবে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, প্রবাসীদেরকে ‘প্রবাসী কার্ড’ প্রদান ছাড়াও প্রবাসী মন্ত্রণালয়ে একটি বিশেষ সেল গঠন করা হবে এবং সেই সেলে প্রবাসীদের ইমেইল থেকে প্রাপ্ত অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এজন্য যুগ্ম সচিব পর্যায়ের উচ্চ পদস্থ একজন কর্মকর্তার নেতৃত্বে মন্ত্রনালয়ে একটি কমিটি গঠন করা হবে। থাকবে হটলাইন-এর ব্যবস্থা।
সিটির উডসাইডের গুলশান ট্যারেসে রোববার (১০ মে) সন্ধ্যায় এর সভার আয়োজন করা হয়। সোসাইটির সভাপতি আতাউর রহমান সেলিমের সভাপতিত্বে আয়োজিত সভাটি বিপুল সংখ্যক প্রবাসীর উপস্থিতিতে এবং বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রবাসী মন্ত্রীকে ফুলেল শুভেচ্ছায় সংবর্ধিত করায় মতবিনিময় সভাটি কার্যত সংবর্ধনা সভায় পরিণত হয়।

পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াতের মাধ্যমে শুরু হওয়া অনুষ্ঠান শুরুর পর বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশিত হয়। সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলীর সঞ্চালনায় সভা মঞ্চে উপবিষ্ট থেকে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ সোসাইটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান শাহ নেওয়াজ, ট্রাষ্টি বোর্ডের সদস্য যথাক্রমে কাজী আজহারুল হক মিলন, আজিমুর রহমান বোরহান, আব্দুর রহিম হাওলাদার, কাজী আজম, আহসান হাবীব, ফখরুল ইসলাম দেলোয়ার, আতরাউল আলম ও নাইম টুটুল, সোসাইটির সাবেক সভাপতি ডা. ওয়াদুদ ভূঁইয়া, ডা. মোহাম্মদ হামিদুজ্জামান ও আজমল হোসেন কুনু, সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হোসেন খান ও রানা ফেরদৌস চৌধুরী।

এ ছাড়াও কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সিলেট পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান বাবলুর হোসেন বাবুল, সোসাইটির সাবেক ট্রাষ্টি বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী ইমাম, এনআরবি’র চেয়ারপার্সন সেকিল চৌধুরী, সোসাইটির নির্বাচন কমিশনার ও জালালাবাদ এসোসিয়েশন অব আমেরিকার সভাপতি বদরুল হোসেন খান, সোসাইটির সহ সভাপতি কামরুজাজামান কামরুল, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন ভূঁইয়া, ফোবানা’র সাবেক চেয়ারম্যান বেদারুল ইসলাম বাবলা, ঢাকা জেলা এসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি এম এ বাসেত, স›দ্বীপ সোসাইটি ইউএসএ’র সভাপতি ফিরোজ আহমেদ, বাংলাদেশী আমেরিকান সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক আমিন মেহেদী, খামার বাড়ী সুপার মার্কেটের অন্যতম পরিচালক আব্দুর রহমান বিশ্বাস, কমিউনিটি অ্যাক্টিভিষ্ট আবু সাঈদ আহমদ, এম এ বাতেন, সাইফুর খান হারুন, সোসাইটির কার্যকরী সদস্য জাহাঙ্গীর শহীদ সোহরাওয়াদী ও হারুন অর রশীদ চেয়ারম্যান প্রমুখ।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সোসাইটির পক্ষ থেকে কর্মকর্তারা প্রথমে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান এবং মন্ত্রীর হাতে ক্রেস্ট তুলে দেন। এছাড়াও জালালাবাদ এসোসিয়েশন অব আমেরিকা, বৃহত্তর সিলেট গণদাবী পরিষদ যুক্তরাষ্ট্র, সিলেট এমসি কলেজ এসোসিয়েশন, গোলাপগঞ্জ সোসাইটি, প্রবাসী আইন সুরক্ষা কমিটি, কামাল স্মৃতি পরিষদ প্রভৃতি সংগঠনের পক্ষ থেকে স্ব স্ব সংগঠনের কর্মকর্তারা মন্ত্রীকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান।
এর আগে সভার শুরুতে সোসাইটির সভাপতি আতাউর রহমান সেলিম তার স্বাগত বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশ সোসাইটির ্কটি অরাজনৈতিক সংগঠন, সকল প্রবাসীদের সংগঠন। তিনি সভাটি সুন্দর করার জন্য সবার সার্বিক সহযোগিতা কামনা এবং সভায় কোন রাজনৈতিক বক্তব্য না দেওয়ার জন্য বক্তাদের প্রতি অনুরোধ জানান। এরপর সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী সংক্ষেপে বাংলাদেশ সোসাইটির ৫০ বছর পূর্তীসহ দীর্ঘ সময়ে কমিউনিটির কল্যাণে সোসাইটির কার্যক্রম ও ভূমিকা তুলে ধরার পাশাপাশি প্রবাসীদের পক্ষ থেকে ৯ দফা সম্বলিত দাবী ও প্রস্তাবনা তুলে ধরেন।

সভায় বক্তারা সিলেট’র ওসমানী বিমানবন্দরকে পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পরিণত করা সহ সকল বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানী বন্ধ ও জানমালের নিরাপত্তা, ঢাকা-নিউইয়র্ক-ঢাকা রুট চালু, প্রবাসীদের মরদেহ সরকারী ব্যয়ে দেশে নেয়া, বিনিয়োগের পরিবেশ সহ অর্থের নিশ্চয়তা, দ্বৈত নাগরিকত্ব প্রদান, বসুন্ধরা গ্রুপসহ বিভিন্ন হাউজিং কোম্পানির স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ ও প্লট বুঝিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা প্রভৃতি দাবী মন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন।
সভায় বাবলুর হোসেন বাবুল তার বক্তব্যে বলেন, আমি যখন সিলেট পৌরসভার চেয়ারম্যান তখন আরিফুল হক চৌধুরী ১০ম শ্রেনীর ছাত্র। তিনি কর্মী থেকে জাতীয় নেতায় পরিণত হয়েছেন। পৌরসভার ওয়ার্ড কমিশনার থেকে এমপি-মন্ত্রী হয়েছেন, মানুষের নেতায় পরিণত হয়েছেন। এ আমাদের শিক্ষার রয়েছে। তিনি সিলেটবাসীদের গর্ব। আমার জীবনের ৬০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে আমি কারো সংবর্ধনা সভায় যাইনি। কিন্তু আজকের সভায় আমি লক্ষ লক্ষ সিলেটবাসীদের পক্ষ থেকে আরিফুল হক চৌধুরীকে ‘সিলেট রত্ন’ হিসেবে প্রস্তাব করছি। তার এই প্রস্তাব উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা করতালির মাধ্যমে সমর্থন জানান।

সভায় মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী রক্তের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক সরকারকে এগিয়ে নিয়ে যেতে তিনি ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহবান জানিয়ে বলেন, মাত্র আইড়াই মাস হলো বিএনপি সরকার ক্ষমতায়। ইতিমধ্যেই আমাদের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবয়ন শুরু হয়েছে। বিশ্ব পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমরা প্রবাসীদের মরদেহ দেশে নেওয়ার ব্যবস্থা করেছি। মন্ত্রী বলেন, প্রবাসীদের সর্বস্বান্ত করা ম্যানপাওয়ার ব্যবসার মাফিয়াচক্রকে আইনের আওতায় আনা হবে। চিহ্নিত করা হয়েছে সিন্ডিকেট। ইতিমধ্যেই কয়েকজনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
বসুন্ধরা গ্রæপের প্লট না পওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন, প্লট ও জমি বিক্রির নামে প্রবাসীদের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এব্যাপারে বসুন্ধরা গ্রæপের বিরুদ্ধে অচিরেই মন্ত্রী সভার বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে এবং সংশ্লিস্ট এলাকা ঢাকা সিটি করপোরেশনের আওতায় আনা হবে বলেও উল্লেখ করেন। তিনি প্রবাসী বাংলাদেশীর কল্যাণ সহ দেশ ও জাতির কল্যাণে যেকোন ভালো প্রস্তাবও তার মাধ্যমে সরকারকে জানানোর আহবান জানান। প্রবাসীদের অপর এক দাবী প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দুই দেশে সরকারী ছুটি কেন স্ব স্ব দেশের ছুটিই ভোগ করবেন এবং বিষয়টি তিনি সরকারকে জানাবেন। মন্ত্রী অতীতের সব ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে স¤প্রীতির মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহবানের মধ্য দিয়ে তাঁর বক্তব্য শেষ করেন।

বাংলাদেশ সোসাইটির ৯ দফা সম্বলিত দাবী ও প্রস্তাবনা : গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রবাসীকল্যাণ, বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর সদয় অবগতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশীদের পক্ষ থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি ও প্রস্তাবগুলো নিম্ররূপ- ১। প্রবাসীরা বাংলাদেশে ভ্রমণকালে দেশের সকল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর যেন কোনো ধরনের হয়রানির শিকার হতে না হয়, সে বিষয়ে কার্যকর ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ২। প্রবাসীদের মৃত্যুর পর তাঁদের মরদেহ বিনা খরচে বাংলাদেশে প্রেরণের জন্য সরকারি উদ্যোগে স্থায়ী ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ৩। বাংলাদেশে অবস্থানরত প্রবাসীদের জানমাল ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা। ৪। বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী প্রবাসীদের জন্য নিরাপদ, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা। ৫। দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা প্রবাসীদের উৎসাহিত করতে রেমিট্যান্স প্রণোদনা বর্তমান ২% থেকে বৃদ্ধি করে ন্যূনতম ৪% বা তার অধিক করার উদ্যোগ গ্রহণ করা। ৬। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশন ও কনস্যুলেটসমূহের সেবার মান আরও উন্নত করা এবং প্রবাসীদের জরুরি সহায়তার জন্য ২৪ ঘণ্টার হটলাইন সেবা চালু করা। ৭। যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা অনুযায়ী বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট পুনরায় চালুর বিষয়ে দ্রæত বাস্তবসম্মত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। ৮। নিউইয়র্ক ও পার্শ্ববর্তী শহরগুলোতে বসবাসরত প্রবাসীদের সুবিধার্থে মাসে অন্তত একদিন সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বাংলাদেশ সোসাইটির ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন স্থানে মোবাইল কনস্যুলার সেবা প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ৯। প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিতকরণ এবং জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) কার্যক্রম আরও সহজ, দ্রুত ও কার্যকর করার লক্ষ্যে জরুরি উদ্যোগ গ্রহণ করা। -খবর ও ছবি ইউএনএ














