৩০শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রে ইমিগ্রেশন বিচারকদের গণহারে ছাঁটাই করছে ট্রাম্প প্রশাসন, উদ্বেগ জানাল জাতিসংঘ

যুক্তরাষ্ট্রে ইমিগ্রেশন বিচারকদের গণহারে ছাঁটাই করছে ট্রাম্প প্রশাসন, উদ্বেগ জানাল জাতিসংঘ

যুক্তরাষ্ট্রে শতাধিক ইমিগ্রেশন বিচারককে গণছাঁটাই এবং অবৈধ অভিবাসীদের তড়িঘড়ি করে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটি সতর্ক করে জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প প্রশাসনের গৃহীত এসব সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী হতে পারে এবং অভিবাসীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার মৌলিক অধিকারকে চরমভাবে বিঘ্নিত করতে পারে।

ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর থেকে শিকাগোসহ দেশজুড়ে অন্তত ১০০ জনেরও বেশি ইমিগ্রেশন বিচারককে পদচ্যুত করা হয়েছে। এছাড়া বহাল থাকা বিচারকদের ওপর বিচার বিভাগ থেকে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির মাধ্যমে অভিবাসীদের ফেরত পাঠাতে অভূতপূর্ব চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।

বিচারক ও আইনজীবীদের স্বাধীনতা বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ র‍্যাপোর্টার মার্গারেট স্যাটারথওয়েট এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এই পদক্ষেপগুলো কেবল বিচার বিভাগ পুনর্গঠন বা ছোট করার বিষয় নয়, বরং নিরপেক্ষ বিচারকদের সরিয়ে তাদের জায়গায় মূলত ‘বহিষ্কার কার্যকর করার বিচারক’ বসানোর একটি রাজনৈতিক চেষ্টা।

তিনি জানান, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যারা নির্যাতন বা বৈষম্যের ভয়ে আশ্রয়ের আবেদন করছেন, তাদের মামলা অবশ্যই একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থার অধীনে শুনানির অধিকার রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর প্রযোজ্য বাধ্যতামূলক আইনি বাধ্যবাধকতার স্পষ্ট লঙ্ঘন ঘটাচ্ছে।

এদিকে শিকাগোর সাবেক ইমিগ্রেশন বিচারক কার্লা এস্পিনোজা জানান, বর্তমান বিচারকদের ওপর মামলা দ্রুত শেষ করার জন্য প্রশাসনিক চাপ দিন দিন বাড়ছে। অভিবাসীদের তাদের আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কিংবা মুক্তির আবেদন জানানোর জন্য পর্যাপ্ত সময় পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে না।

জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে একজন বিচারককে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ১০০ থেকে ২০০টি মামলা নিষ্পত্তি করতে বাধ্য করা হচ্ছে, যা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগকে কার্যত অসম্ভব করে তোলে। সংস্থাটি মনে করিয়ে দিয়েছে, মার্কিন সংবিধানের ১৪তম সংশোধনী অনুযায়ী নাগরিক বা অনাগরিক নির্বিশেষে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত প্রত্যেকেরই আইনি সুরক্ষার (ডিউ প্রসেস) অধিকার রয়েছে। উল্লেখ্য, চলতি সপ্তাহে ইউএস ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস)-এর প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, গত বছরের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত ৩ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পাওয়ার আইনি প্রক্রিয়া আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে ১০ ধাপের একটি নির্দেশনা প্রকাশ করেছে দেশটির নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সেবা সংস্থা ইউএসসিআইএস। বিশেষ করে গ্রিন কার্ডধারীদের নাগরিকত্বের আবেদন করার আগে কী কী ধাপ সম্পন্ন করতে হবে, সেই প্রক্রিয়াই এতে ধারাবাহিকভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

ইউএসসিআইএসের নির্দেশনা অনুযায়ী, নাগরিকত্বের আবেদন করার আগে প্রথমেই নিশ্চিত হতে হবে যে আবেদনকারী ইতোমধ্যে কোনোভাবে মার্কিন নাগরিকত্বের অধিকারী কি না। যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ না করলেও কিছু ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ থাকতে পারে। এমন কোনো সুযোগ না থাকলে আবেদনকারীকে ন্যাচারালাইজেশন বা আইনি প্রক্রিয়ায় নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য আবেদন করতে হবে।

এরপর আবেদনকারীকে নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্যতা যাচাই করতে হবে। সাধারণভাবে আবেদনকারীর বয়স, যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ স্থায়ী বসবাসের সময়কাল, নির্দিষ্ট সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে শারীরিকভাবে অবস্থান এবং ভালো নৈতিক চরিত্রের মতো বিষয় বিবেচনা করা হয়। আবেদনকারীর ব্যক্তিগত পরিস্থিতি অনুযায়ী অতিরিক্ত যোগ্যতার শর্তও প্রযোজ্য হতে পারে।

যোগ্যতা নিশ্চিত করার পর নাগরিকত্বের জন্য ফরম এন-৪০০, অর্থাৎ ন্যাচারালাইজেশনের আবেদনপত্র প্রস্তুত করতে হবে। ইউএসসিআইএসের অনলাইন অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে অনেক আবেদনকারী অনলাইনে এই ফরম জমা দিতে পারেন। আবেদনকারীর পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সহায়ক নথিও প্রস্তুত করতে হয়।

পরবর্তী ধাপে ফরম এন-৪০০ জমা দেওয়া এবং নির্ধারিত আবেদন ফি পরিশোধ করতে হয়। আবেদন গ্রহণের পর ইউএসসিআইএস একটি রসিদ নোটিশ দেয়। অনলাইন অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে আবেদনকারী নিজের মামলার অগ্রগতি ও আবেদনের বর্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।

কিছু আবেদনকারীর ক্ষেত্রে বায়োমেট্রিকস দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ইউএসসিআইএস নির্দিষ্ট তারিখ, সময় ও স্থান উল্লেখ করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নোটিশ পাঠায়। প্রয়োজন অনুযায়ী আঙুলের ছাপ, ছবি বা স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হতে পারে।

বায়োমেট্রিকস ও প্রাথমিক যাচাইয়ের ধাপ শেষ হলে আবেদনকারীকে ইউএসসিআইএসের নির্ধারিত কার্যালয়ে সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকা হয়। এই সাক্ষাৎকারে আবেদনপত্রের তথ্য যাচাইয়ের পাশাপাশি নাগরিকত্বের যোগ্যতা এবং প্রযোজ্য ইংরেজি ও নাগরিকত্ব জ্ঞান পরীক্ষার বিষয়গুলোও মূল্যায়ন করা হতে পারে।

সাক্ষাৎকারের পর ইউএসসিআইএস আবেদনটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানায়। আবেদন অনুমোদিত হতে পারে, অতিরিক্ত নথি বা তথ্যের প্রয়োজন হলে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হতে পারে, অথবা আবেদনকারী যোগ্য নন বলে আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হতে পারে। ইংরেজি বা নাগরিকত্ব পরীক্ষার ক্ষেত্রে প্রথমবার সফল না হলে আইন ও প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ থাকতে পারে।

আবেদন অনুমোদিত হলে পরবর্তী ধাপে আবেদনকারীকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের শপথ বা ওথ অব অ্যালিজিয়েন্স গ্রহণের জন্য ন্যাচারালাইজেশন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে সাক্ষাৎকারের দিনই শপথ গ্রহণের সুযোগ থাকতে পারে। তা সম্ভব না হলে ইউএসসিআইএস আলাদা নোটিশের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের তারিখ, সময় ও স্থান জানিয়ে দেয়।

শপথ গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আবেদনকারী আইনগতভাবে মার্কিন নাগরিক হিসেবে গণ্য হন না। অনুষ্ঠানে সাধারণত নির্ধারিত ফরমের প্রশ্নমালা পূরণ, ইউএসসিআইএস কর্মকর্তাদের কাছে উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং গ্রিন কার্ড জমা দেওয়ার পর আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করতে হয়। এরপর আবেদনকারীকে ন্যাচারালাইজেশনের সনদ দেওয়া হয়।

শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে নাগরিকত্বের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও নতুন নাগরিকের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকাও এই প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর মধ্যে ফেডারেল নির্বাচনে ভোট দেওয়া, জুরি হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান ও আইন মেনে চলার মতো নাগরিক দায়িত্ব রয়েছে।

ইউএসসিআইএসের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, নাগরিকত্বের আবেদনসংক্রান্ত ফরম, নির্দেশনা এবং আবেদনের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের সরকারি ব্যবস্থা তাদের অফিসিয়াল প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যায়। তবে নাগরিকত্বের যোগ্যতা ও আবেদন প্রক্রিয়া ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে নিজের পরিস্থিতি অনুযায়ী ইউএসসিআইএসের সর্বশেষ সরকারি নিয়ম ও নির্দেশনা যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।