২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

যুক্তরাষ্ট্র

গুরুত্বপূর্ণ এক বৈঠকে নিউ ইয়র্কের সাশ্রয়ী আবাসন ও ‘সানিসাইড ইয়ার্ড’ প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করলেন ট্রাম্প ও মামদানি

গুরুত্বপূর্ণ এক বৈঠকে নিউ ইয়র্কের সাশ্রয়ী আবাসন ও ‘সানিসাইড ইয়ার্ড’ প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করলেন ট্রাম্প ও মামদানি

নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়ার আগে সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রেসি ম্যানশনে নিউ ইয়র্ক সিটি মেয়র এর সরকারি বাসভবনে মেয়র জোহরান মামদানির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

বিকাল ৪টার ঠিক আগে প্রেসিডেন্ট গ্রেসি ম্যানশনে পৌঁছান এবং বৈঠকের পরপরই মেয়র মেয়র মামদানির সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সিটি মেয়রদের এই সরকারি বাসভবনে তাঁর আগের সফরের স্মৃতিচারণ করেন এবং অতীতে সিটির পরিচালনাকারী মেয়রদের মধ্যে “যারা দারুণ কাজ করেছেন এবং যারা ততটা ভালো করতে পারেননি”—তাঁদের কথা উল্লেখ করেন।

মেয়র মামদানির পিঠ চাপড়ে তিনি বলেন, “আশা করি আপনিও একজন দারুণ মেয়র হবেন। আর আপনার সেই যাত্রা শুরুও হয়ে গেছে।”

সংবাদ সম্মেলনে মেয়র মামদানি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের বিষয়ে কথা বলেন। তিনি জানান, কীভাবে এই সম্পর্কের সুবাদে নিউ ইয়র্ক সিটিতে সাশ্রয়ী আবাসন ব্যবস্থা এবং ‘সানি-সাইড ইয়ার্ড’ প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলেছে।

কুইন্সে অবস্থিত ১৮০ একরের এই ট্রেন ইয়ার্ডটিতে ১২ হাজার অ্যাপার্টমেন্ট তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে এবং এর জন্য অন্তত ২১ বিলিয়ন ডলারের ফেডারেল অনুদান প্রয়োজন হবে।

মামদানি বলেন, “আমরা ১২,০০০ বাড়ি এবং ৩০,০০০ কর্মসংস্থানের কথা বলছি। এমন একটি সিটিতে সম্পূর্ণ নতুন একটি এলাকা গড়ে তোলার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যেখানে আবাসনই হলো মানুষের প্রধান খরচের খাত।”

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, “এটি বাস্তবায়নের জন্য প্রচুর ফেডারেল অনুমোদন এবং সম্ভবত কিছু ফেডারেল অর্থায়নের ‍্যও প্রয়োজন হবে। তবে জায়গাটি সবসময়ই চমৎকার। সানি-সাইডে আমার একটি ভবন ছিল। সেটি ছিল দারুণ একটি ভবন; জায়গাটি আমার খুব ভালোভাবেই জানা।”

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বেশ কয়েকবার নিউ ইয়র্কের সাথে তাঁর পুরোনো সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন এবং মেয়রের ঐতিহাসিক বাসভবনে এই সফরকে “ঘরে ফেরার মতো” অনুভূতি বলে অভিহিত করেন।

তিনি আরো বলেন, “ভেতরের পরিবেশটা খুব সুন্দর ছিল, চমৎকারভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে। আর এটি নিউ ইয়র্কের অত্যন্ত প্রতিনিধিত্বমূলক ও গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান।”

হোয়াইট হাউসে নির্দিষ্ট কিছু সংবাদমাধ্যমের প্রবেশে প্রেসিডেন্টের সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞার বিষয়েও তাঁদের প্রশ্ন করা হয়েছিল; জবাবে ট্রাম্প বলেন যে তিনি এমনটা করছেন কারণ তিনি মনে করেন “নিরপেক্ষতা বজায় রাখা সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব। কিন্তু তারা তা করছেনা”।

ইমিগ্রেশন বা অভিবাসন বিষয়ে আলোচনার সময় তাঁরা হাইতির নাগরিকদের জন্য “টিপিএস” বা ‘“অস্থায়ী সুরক্ষা মর্যাদা’ (Temporary Protected Status) সংক্রান্ত বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন; উল্লেখ্য, ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি এই মর্যাদা বাতিল করেছে।

মেয়র জানান, তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে নিউ ইয়র্কে বসবাসকারী হাইতির নাগরিকরা নিউ ইয়র্ক সিটির সামাজিক কাঠামো ও অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাঁদের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়টি প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চলে যাওয়ার পর মামদানি লনে ফিরে এসে আরও কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন যে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তাঁর তীব্র মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তাঁদের মধ্যকার সম্পর্ক অটুট রয়েছে।

“আমি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে—এবং সত্যি বলতে, এই সিটির মানুষের জন্য যারা স্বস্তি বা সহায়তা বয়ে আনতে পারেন, তাদের সবার সঙ্গেই—আলোচনা চালিয়ে যাব,” বলেন মেয়র মামদানি।

পরবর্তীতে মেয়র মামদানি ২১ সেপ্টেম্বর সোমবারের বৈঠকের একটি ছবি শেয়ার করেন এবং এটিকে “আজ গ্রেসি ম্যানশনে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে একটি ফলপ্রসূ বৈঠক” হিসেবে অভিহিত করেন।

গতবছর নিউ ইয়র্ক সিটি মেয়র পদে ঐতিহাসিক নির্বাচনী জয়ের পর ফেব্রুয়ারি মাসে ওভাল অফিসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে মেয়র মামদানির সাক্ষাতের পর, এই বৈঠকটি ছিল ট্রাম্প ও মামদানির মধ্যে তৃতীয় সরাসরি সাক্ষাৎ।

এর আগে, ২০২৫ সালের নভেম্বরে দুই নেতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত একটি বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এর আগেও অন্তত দুবার গ্রেসি ম্যানশনে গিয়েছেন। ২০০৩ সালে তিনি সেখানে সাবেক মেয়র রুডি জুলিয়ানির বিয়েতে এবং ২০০৭ সালে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য চার্লস র‍্যাঙ্গেলের একটি বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। উভয় অনুষ্ঠানেরই আয়োজক ছিলেন তৎকালীন মেয়র ব্লুমবার্গ।

গ্রেসি ম্যানশনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সফর সচরাচর দেখা যায় না। অতীতে যেসব প্রেসিডেন্ট সেখানে গিয়েছেন তাঁদের মধ্যে রয়েছেন হ্যারি ট্রুম্যান, জন এফ. কেনেডি এবং রোনাল্ড রিগ্যান।

এদিকে, গভর্নর ক্যাথি হোকুল জানিয়েছেন যে প্রেসিডেন্টের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ থাকা সত্ত্বেও এই সপ্তাহে ট্রাম্পের সাথে দেখা করার কোনো পরিকল্পনা তাঁর নেই।

গভর্নর হোকুল বলেন, “আমি তাঁর সাথে নানা বিষয়ে কথা বলি। আমাদের মধ্যে যোগাযোগের কোনো ঘাটতি নিয়ে আমি চিন্তিত নই। বিষয়টি কোনো নির্দিষ্ট দিনে একটি বৈঠকের ওপর নির্ভর করে না।”

জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনকে কেন্দ্র করে নিউ ইয়র্ক সিটিতে যখন আন্তর্জাতিক নানা আয়োজনে সপ্তাহটি অত্যন্ত কর্মমুখর হয়ে উঠেছে, ঠিক তখনই এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা শহরে সমবেত হওয়ায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং বিষয়টি বিশ্বজুড়ে মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।

সপ্তাহান্তের ছুটির দিনগুলোতে ‘আরবান ২০ সামিট’ (Urban 20 Summit)-এ যোগ দিতে আসা বিশ্বের বিভিন্ন শহরের মেয়রদের স্বাগত জানান নিউ ইয়র্ক সিটি মেয়র মামদানি। মেয়র মামদানী অংশগ্রহণকারীদের জন্য দোতলা বাসে করে শহর পরিদর্শনেরও আয়োজন করেন। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র ক্যারেন বাস এবং ইউরোপ, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন শহরের মেয়ররা।

নিউ ইয়র্কে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কর্মসূচির মধ্যে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক এবং রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটির তহবিল সংগ্রহের এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত আছে। এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য প্রতি দম্পতিকে ১ লাখ ৫০ হাজার ডলার ফি দিতে হয়েছে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে বিশ্বনেতাদের সমাগমের ফলে এই সপ্তাহে নিউ ইয়র্ক সিটিতে যেসব গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত অনুষ্ঠান আয়োজিত হচ্ছে, গ্র্যাসি ম্যানশনের এই বৈঠকটি সেগুলোরই একটি।