২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ঘড়ির কাঁটা বদলের শত বছরের গল্প

নজরুল মিন্টো : ২০২৬ সালের ১ নভেম্বর। উত্তর আমেরিকার অধিকাংশ অঞ্চলে গভীর রাতে ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা পেছানো হবে। টরন্টো, মন্ট্রিয়ল, নিউইয়র্ক ও শিকাগোর মানুষ তখন ফিরে যাবেন স্ট্যান্ডার্ড টাইমে। কিন্তু কানাডার বিস্তৃত প্রেইরি প্রদেশ ম্যানিটোবায় ঘড়ি আর পেছাবে না। দীর্ঘ শীতের এই প্রদেশটি সেদিন থেকে সারা বছর একই সময় অনুসরণ করবে।

সময় বদলের এই গল্পে কানাডার নাম অবশ্য নতুন নয়। ম্যানিটোবা যখন শত বছরের পুরোনো প্রথা থেকে বেরিয়ে আসছে, তখন ইতিহাস মনে করিয়ে দিচ্ছে, পৃথিবীতে প্রথম ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে দেওয়ার ঘটনাটিও ঘটেছিল কানাডায়। ১৯০৮ সালে লেক সুপিরিয়রের তীরে অন্টারিওর পোর্ট আর্থার শহরের বাসিন্দারা গ্রীষ্মের বিকেলের আলো আরেকটু বেশি উপভোগ করার জন্য ঘড়ি এক ঘণ্টা এগিয়ে দিয়েছিলেন। বর্তমান থান্ডার বে শহরের অংশ সেই পোর্ট আর্থার থেকেই শুরু হয়েছিল ডেলাইট সেভিং টাইমের বাস্তব যাত্রা।

পোর্ট আর্থার থেকে ম্যানিটোবা, ১৯০৮ থেকে ২০২৬। মাঝখানে কেটে গেছে ১১৮ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে ঘড়ির কাঁটা কখনও এগিয়েছে যুদ্ধের কয়লা বাঁচাতে, কখনও ব্যবসার দিন দীর্ঘ করতে, কখনও পোকামাকড় সংগ্রহ কিংবা গলফ খেলার জন্য আরেকটু আলো পেতে। বছরে দুবার সময় বদলের এই প্রথা মানুষের সন্ধ্যা দীর্ঘ করেছে, আবার ঘুম ও স্বাভাবিক জীবনেও গোলমাল বাধিয়েছে।

ঘড়ির কাঁটা নিয়ে প্রথম রসিকতাটি করেছিলেন বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন। ১৭৮৪ সালে প্যারিসে থাকার সময় তিনি দেখলেন, সূর্য অনেক আগেই উঠেছে, অথচ শহরের মানুষ তখনও ঘুমিয়ে। ব্যঙ্গ করে বললেন, মানুষ সকালে উঠলে মোমবাতির খরচ কমবে। জানালার শাটারে কর বসানো, সূর্যোদয়ের সময় গির্জার ঘণ্টা বাজানো এবং তাতেও কাজ না হলে রাস্তায় কামান দাগিয়ে ঘুম ভাঙানোর পরামর্শও দিয়েছিলেন তিনি। ফ্রাঙ্কলিন ঘড়ির কাঁটা বদলানোর কথা বলেননি, কিন্তু তাঁর রসিকতা পরে এই ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়।

প্রথম পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাবটি আসে নিউজিল্যান্ডের কীটতত্ত্ববিদ জর্জ ভার্নন হাডসনের কাছ থেকে। দিনের কাজ শেষে পোকামাকড় সংগ্রহের জন্য আরও আলো চেয়েছিলেন তিনি। তাই ১৮৯৫ সালে গ্রীষ্মে ঘড়ি দুই ঘণ্টা এগিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। এরপর ব্রিটিশ নির্মাণ ব্যবসায়ী ও গলফপ্রেমী উইলিয়াম উইলেট উদ্যোগটি নিয়ে প্রচার শুরু করেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিল এপ্রিলের চার রবিবারে ২০ মিনিট করে ঘড়ি এগোনো এবং সেপ্টেম্বরে একইভাবে পেছানো। সেই পরিকল্পনা কার্যকর হলে বছরে আটবার ঘড়ির কাঁটা ঠিক করতে হতো!

ছোটখাটো শখের এই ধারণা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে পরিণত হয়। ১৯১৬ সালে জার্মানি ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি কয়লা সাশ্রয়ের জন্য ঘড়ি এগিয়ে দেয়। পরে ব্রিটেন, ফ্রান্সসহ আরও অনেক দেশ একই পথে হাঁটে। কানাডা জাতীয়ভাবে ডেলাইট সেভিং টাইম চালু করে ১৯১৮ সালে। যুদ্ধ শেষ হলে কোনো দেশ সময় পেছায়, আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এলে এগিয়ে দেয়।

ডেলাইট সেভিং টাইম সূর্যের আলো এক মিনিটও বাড়ায় না। ঘড়ির হিসাবে খুব ভোরের একটি ঘণ্টাকে সন্ধ্যার দিকে সরিয়ে আনে। এতে অফিস শেষে হাঁটা, খেলাধুলা, বাগানের কাজ, কেনাকাটা ও বাইরে সময় কাটানোর সুযোগ বাড়ে। রেস্তোরাঁ, পর্যটন ও বিনোদন ব্যবসাও দীর্ঘ সন্ধ্যা থেকে লাভবান হয়।

কিন্তু দেয়ালঘড়ির কাঁটা মুহূর্তে এগিয়ে দেওয়া গেলেও শরীরের ঘড়ি এত সহজে বদলায় না। বসন্তে এক ঘণ্টা ঘুম হারানোর পর অনেকের কয়েক দিন ঝিমুনি, ক্লান্তি ও মনোযোগের সমস্যা দেখা দেয়। গবেষণায় দুর্ঘটনা ও কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকি সাময়িকভাবে বেড়ে যাওয়ার কথাও এসেছে। এ কারণে ঘুমবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের বড় অংশ বছরে দুবার সময় বদলানোর বিপক্ষে। তবে তাঁরা সন্ধ্যার আলোর পরিবর্তে সকালের আলোকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে স্থায়ী স্ট্যান্ডার্ড টাইমের পক্ষে।

ঘড়ি পেছানোর কাণ্ড কখনও হাস্যকর পরিস্থিতিও তৈরি করেছে। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের এক হাসপাতালে যমজ দুই ভাইয়ের মধ্যে স্যামুয়েল জন্ম নেয় রাত ১টা ৩৯ মিনিটে। তার ৩১ মিনিট পর রোনানের জন্ম হলেও ততক্ষণে ঘড়ি এক ঘণ্টা পেছানো হয়েছে। ফলে রোনানের জন্মসময় লেখা হয় রাত ১টা ১০ মিনিট। বাস্তবে ছোট হলেও কাগজে-কলমে সে বড় ভাই!

কানাডায় সময়ের হিসাব এমনিতেই বিচিত্র। সাসকাচুয়ানের অধিকাংশ এলাকায় সারা বছর সেন্ট্রাল স্ট্যান্ডার্ড টাইম অনুসরণ করা হয়। ইউকন ২০২০ সালে ঘড়ির কাঁটা বদলানো বন্ধ করেছে। ২০২৬ সালে ব্রিটিশ কলাম্বিয়া স্থায়ী প্যাসিফিক ডেলাইট টাইম এবং আলবার্টা স্থায়ী আলবার্টা টাইম গ্রহণ করেছে। আলবার্টা টাইম মূলত মাউন্টেন ডেলাইট টাইমের সমান। এবার ম্যানিটোবাও সারা বছর সেন্ট্রাল ডেলাইট টাইম অনুসরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে এসব প্রদেশ ও অঞ্চলের বাসিন্দাদের আর বসন্ত ও শরতে ঘড়ি বদলাতে হবে না। তবে অন্টারিও, কুইবেক ও আটলান্টিক অঞ্চলের অধিকাংশ এলাকায় আগের নিয়ম বহাল রয়েছে। সেখানে বসন্তে ঘড়ি এক ঘণ্টা এগিয়ে ডেলাইট টাইম চালু করা হয় এবং শরতে এক ঘণ্টা পেছিয়ে আবার স্ট্যান্ডার্ড টাইমে ফেরা হয়।

এক শতাব্দীরও বেশি আগে কয়লা ও মোমবাতি বাঁচানোর জন্য যে ব্যবস্থা চালু হয়েছিল, আধুনিক যুগে এসে সেটিই মানুষের ঘুম, স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। প্রশ্নটি তাই নতুন করে ফিরে এসেছে: ঘড়িকে সূর্যের সঙ্গে চলতে হবে, নাকি মানুষের তৈরি কর্মজীবনের সঙ্গে? ম্যানিটোবা তার উত্তর বেছে নিয়েছে। তথ্যসূত্র: Global News, The Guardian , Associated Press, নজরুল মিন্টো, টরন্টো থেকে প্রকাশিত দেশেবিদেশে পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক।