২০২৬ বিশ্বকাপের উত্তেজনা এখনো শেষ হয়নি। কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ২৩তম ফুটবল বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব চললেও এরই মধ্যে দৃষ্টি ঘুরতে শুরু করেছে পরবর্তী আসরের দিকে। কারণ, ২০৩০ সালে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বিশ্বকাপ শুধু আরেকটি টুর্নামেন্ট নয়, এটি হবে ফুটবল বিশ্বকাপের শতবর্ষের আয়োজন। আর সেই ঐতিহাসিক আসরে স্বাগতিক হওয়ার সুবাদে ইতোমধ্যে সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে ছয়টি দেশ স্পেন, পর্তুগাল, মরক্কো, উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়ে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এবারই প্রথম তিনটি মহাদেশজুড়ে অনুষ্ঠিত হবে আসরটি। মূল আয়োজক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে ইউরোপের স্পেন ও পর্তুগাল এবং আফ্রিকার মরক্কো। তবে ১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপের আয়োজক উরুগুয়েকে সম্মান জানিয়ে শতবর্ষ উদ্যাপনের অংশ হিসেবে উদ্বোধনী পর্বের তিনটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে দক্ষিণ আমেরিকার উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়েতে। এই বিশেষ ব্যবস্থার ফলে ছয়টি দেশই স্বাগতিকের মর্যাদা পেয়েছে এবং নিয়ম অনুযায়ী তারা সবাই সরাসরি বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পাচ্ছে।
২০২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর ফিফা কংগ্রেসে স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কোকে যৌথভাবে ২০৩০ বিশ্বকাপের মূল আয়োজক হিসেবে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয়া হয়। যদিও এই আয়োজনের পথচলা শুরু হয়েছিল আরও আগে। ২০২০ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া বিডিং প্রক্রিয়া শেষ হয় ২০২৩ সালের অক্টোবরে। প্রথমদিকে মরক্কো এককভাবে বিশ্বকাপ আয়োজনের পরিকল্পনা করেছিল। পরে স্পেন ও পর্তুগালের সঙ্গে যৌথভাবে প্রস্তাব জমা দেয় দেশটি। শেষ পর্যন্ত সেটিই একমাত্র বৈধ প্রস্তাব হিসেবে অনুমোদন পায়।
এরপর ফিফা বিশ্বকাপের শতবর্ষ উদ্যাপনকে বিশেষভাবে স্মরণীয় করে তুলতে নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপ হয়েছিল উরুগুয়েতে। সেই ইতিহাসকে সামনে রেখেই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, শতবর্ষের বিশ্বকাপের উদ্বোধনী পর্বের তিনটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে প্রথম বিশ্বকাপের আয়োজক উরুগুয়ে এবং প্রতিবেশী আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়েতে। উদ্বোধনী ম্যাচগুলোর পর অংশগ্রহণকারী দলগুলো ইউরোপ ও আফ্রিকায় গিয়ে টুর্নামেন্টের বাকি সূচিতে অংশ নেবে।
বিশ্বকাপের অন্যতম আকর্ষণ হবে মন্টেভিডিওর ঐতিহাসিক এস্তাদিও সেন্টেনারিও। ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়েছিল এই স্টেডিয়ামেই। শতবর্ষের বিশেষ আয়োজনের একটি ম্যাচও হবে এখানেই। অন্য দুটি উদ্বোধনী ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনেস এইরেসের এস্তাদিও মনুমেন্টাল এবং প্যারাগুয়ের রাজধানী আসুনসিওনের এস্তাদিও ওসভালদো ডোমিঙ্গেজ দিব স্টেডিয়ামে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল সংস্থা কনমেবলের সদর দপ্তরও আসুনসিওনেই অবস্থিত।
ফিফার ঘোষিত সূচি অনুযায়ী, ২০৩০ বিশ্বকাপ শুরু হবে ৮ জুন এবং শেষ হবে ২১ জুলাই। মোট ৪৪ দিনব্যাপী চলবে প্রতিযোগিতা, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ আসর হিসেবে বিবেচিত হবে। তিন মহাদেশে ম্যাচ আয়োজন, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের বিশেষ পরিকল্পনা এবং অংশগ্রহণকারী দলগুলোর দীর্ঘ ভ্রমণ বিবেচনায় রেখে সূচি আগের যেকোনো বিশ্বকাপের তুলনায় দীর্ঘ করা হয়েছে।
প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ছয়টি দেশের ১৮টি শহরের ২১টি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো। যদিও সব ভেন্যুর চূড়ান্ত অনুমোদন এখনো বাকি, ফিফা সম্ভাব্য স্টেডিয়ামগুলোর তালিকা ইতোমধ্যে প্রকাশ করেছে।
স্পেনেই সবচেয়ে বেশি ম্যাচ আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। সম্ভাব্য ভেন্যুর তালিকায় রয়েছে মাদ্রিদের সান্তিয়াগো বার্নাব্যু ও সিভিতাস মেত্রোপোলিতানো, বার্সেলোনার স্পটিফাই ক্যাম্প ন্যু, সেভিয়ার এস্তাদিও দে লা কার্তুহা, বিলবাওয়ের সান মামেস, সান সেবাস্তিয়ানের রিয়াল অ্যারিনা, সারাগোসার লা রোমারেদা, ভ্যালেন্সিয়ার নু মেস্তায়া, লাস পালমাসের এস্তাদিও গ্রান ক্যানারিয়া এবং ভিগোর আবাঙ্কা-বালাইদোস স্টেডিয়াম।
পর্তুগালে ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে রাজধানী লিসবনের এস্তাদিও দা লুজ, এস্তাদিও জোসে আলভালাদে এবং পোর্তোর এস্তাদিও দো দ্রাগাওয়ে। অন্যদিকে মরক্কোতে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে কাসাব্লাঙ্কার নির্মাণাধীন হাসান-২ স্টেডিয়াম, রাবাতের প্রিন্স মুলাই আবদেল্লাহ স্টেডিয়াম, মারাকেশ, আগাদির, ফেজ ও তাঞ্জিয়ারের স্টেডিয়ামগুলো।
ফাইনাল ম্যাচ কোথায় অনুষ্ঠিত হবে, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি ফিফা। তবে আলোচনায় এগিয়ে রয়েছে স্পেনের মাদ্রিদের সান্তিয়াগো বার্নাব্যু এবং বার্সেলোনার স্পটিফাই ক্যাম্প ন্যু। একই সঙ্গে মরক্কোও নির্মাণাধীন হাসান-২ স্টেডিয়ামকে বড় ম্যাচ আয়োজনের উপযোগী করে গড়ে তুলছে। ফিফা জানিয়েছে, ২০২৬ সালের পর চূড়ান্ত ভেন্যু তালিকার সঙ্গে ফাইনালের স্টেডিয়ামও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এর আগে কখনো তিনটি মহাদেশে ছড়িয়ে কোনো আসর অনুষ্ঠিত হয়নি। ২০২৬ সালে প্রথমবারের মতো তিন দেশের যৌথ আয়োজনে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হলেও ২০৩০ সালের আসর সেই ধারণাকে আরও বিস্তৃত করছে। শতবর্ষের ইতিহাস, ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান এবং আধুনিক আয়োজন সব মিলিয়ে ২০৩০ বিশ্বকাপকে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী ও স্মরণীয় আসরগুলোর একটি হিসেবে দেখছে ফিফা ও বিশ্ব ফুটবল সংশ্লিষ্টরা।














