৫ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

শেষের পাতা

যুক্তরাষ্ট্রে ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া বিল ১.২৫ ট্রিলিয়ন ডলার; শোধ করতে হিমশিম খাচ্ছেন আমেরিকানরা, নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন অনেকে

যুক্তরাষ্ট্রে ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া বিল ১.২৫ ট্রিলিয়ন ডলার; শোধ করতে হিমশিম খাচ্ছেন আমেরিকানরা, নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন অনেকে

নিউ ইংল্যান্ডের এক ব্যস্ত হাসপাতালে সারা দিন অপারেশনস ডিরেক্টর হিসেবে হাড়ভাঙা খাটুনির পরও রাতে বাড়ি ফিরে দুচোখের পাতা এক করতে পারেন না ক্যাথরিন ক্লার্ক। বিছানায় শুয়ে কেবলই ভাবেন, কোথায় ভুল হলো তার?

বছরে ১ লাখ ৯৪ হাজার ডলার বেতন পান ক্যাথরিন। তবু তার চেজ স্যাফায়ার ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া বিল গিয়ে ঠেকেছে ১৫ হাজার ডলারে। মাসে অন্তত ৫৭২ ডলার বিল মেটানোর সামর্থ্য তার আছে। কিন্তু ২৬ শতাংশ সুদহারে তা নেহাতই সমুদ্রে একফোঁটা শিশির!

আরও বহু আমেরিকানের মতোই মূল্যস্ফীতি ও কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ সুদহারের জোড়া ধাক্কা ৪২ বছর বয়সি ক্যাথরিনকে খাদের কিনারে এনে দাঁড় করিয়েছে। টাকা বাঁচাতে বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে বেরোনো বন্ধ করে দিয়েছেন তিনি। এমনকি নিজের জিমে রিসেপশনিস্ট হিসেবে দ্বিতীয় কাজ নেওয়ার কথাও ভেবেছেন। মাঝে মাঝেই অজানা আতঙ্ক গ্রাস করে তাকে—বাবা-মা যদি তার এই পাহাড়প্রমাণ ক্রেডিট কার্ড বিলের কথা জেনে যান!

ক্যাথরিন বলেন, ‘পুরো বিষয়টা যেন ওজনের সাথে লড়াই। রাতারাতি বাড়ে না। একটু একটু করে বাড়ে। তারপর হঠাৎই একদিন মনে হয়, প্যান্টের মাপে আর কুলাচ্ছে না।’

এ বছরের মে মাসে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য বলছে, বছরের প্রথম প্রান্তিকে অন্তত ৯০ দিন বকেয়া থাকা ক্রেডিট কার্ড বিলের হার বেড়ে হয়েছে ১৩.১২ শতাংশ। গত ১৫ বছরের মধ্যে এই পরিসংখ্যান সর্বোচ্চ। ২০০৮ সালের আর্থিক মন্দার পর এই প্রথম বকেয়া বিলের বোঝা এতটা বাড়ল।

নিউইয়র্ক ফেডের তথ্যানুসারে, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রে মোট ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া বিল দাঁড়িয়েছে ১.২৫ ট্রিলিয়ন ডলার, গত বছর একই সময়ে যা ছিল ১.১৮ ট্রিলিয়ন ডলার। ১৯৯৯ সালে নিউইয়র্ক ফেড এই হিসাব রাখা শুরু করার পর থেকে, প্রথম প্রান্তিকে এটাই সর্বোচ্চ বকেয়া বিল।

তবে মূল্যস্ফীতির কারণে তৈরি হওয়া এই আর্থিক চাপকে বিশেষ আমল দিতে নারাজ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। চলতি মাসের শুরুতে তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আমেরিকার সাধারণ মানুষের এই আর্থিক দুরাবস্থাই কি ইরান যুদ্ধ থামানোর নেপথ্য কারণ? তার সাফ জবাব ছিল, ‘একবিন্দুও নয়।’

যদিও নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে অর্থনীতি নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের কারণে বেশ চাপেই আছেন কংগ্রেসের রিপাবলিকান নেতারা।

ক্রেডিট কার্ড প্রদানকারী ব্যাংকগুলোর ওপর চালানো ফেডারেল রিজার্ভের এক জরিপ বলছে, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে কার্ডের গড় সুদের হার ছিল ১৪.৬ শতাংশ। কিন্তু চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বেড়ে ২১ শতাংশে পৌঁছেছে।

গবেষণা সংস্থা আরবান ইনস্টিটিউটের অর্থনীতিবিদ ব্রেনো ব্রাগার সংগ্রহ করা তথ্যমতে, গত বছর ৫.৬ শতাংশ ক্রেডিট কার্ড গ্রাহক অন্তত ৬০ দিন বা তার বেশি সময় ধরে তাদের বিল পরিশোধ করেননি। মহামারির আগের পরিসংখ্যানকেও ছাপিয়ে গেছে এই হার। তার বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, নিম্ন, মধ্য ও উচ্চবিত্ত—সব ধরনের মানুষের ক্ষেত্রেই গত দু-বছরে এই বকেয়া বিলের হার ২০১৮ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

ব্রাগা বলেন, ‘খাদ্য, বাসস্থান ্ব চিকিৎসার খরচ যখন এতটা বেড়ে যায়, তখন ক্রেডিট কার্ডের বিল মেটানোর জন্য হাতে খুব কম টাকাই অবশিষ্ট থাকে। ফলে অনেকেই কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়ছেন। কেউই নিজের বাড়ি বা গাড়ি হারাতে চান না। আবার দৈনন্দিন জরুরি সেবার বিল মেটানোও প্রয়োজন। তাই তারা প্রথমেই ক্রেডিট কার্ডের বিল পরিশোধ বন্ধ করে দিচ্ছেন।’

দেনার দায়ে জর্জরিত মার্কিনীরা এখন ভিড় জমাচ্ছেন ক্রেডিট-কাউন্সেলিং এজেন্সিগুলোতে। তেমনই একটি অলাভজনক সংস্থা ন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর ক্রেডিট কাউন্সেলিং। মানুষকে ক্রেডিট কার্ডের দেনা কমাতে সাহায্য করে তারা। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, গত বছরের তুলনায় এ বছরের জানুয়ারিতে তাদের কাছে আসা মানুষের সংখ্যা ২৪ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৮ সালের তুলনায় চলতি বছরে প্রতি মাসে কাউন্সেলিংয়ের জন্য আসা মানুষের গড় সংখ্যা বেড়েছে ৬০ শতাংশ।

পাহাড়প্রমাণ বকেয়া

মেইন-এর সাউথ পোর্টল্যান্ডের বাসিন্দা মেলিসা মেগিসন। পেশায় মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট। তিনিও ওই সংস্থার দ্বারস্থ হয়েছেন। একসময় ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া বিল প্রায় শূন্যের কোঠাতেই রাখতেন তিনি। বছরে ৬৫ হাজার ডলার আয় করেন মেলিসা। তার তৎকালীন স্বামী একটি শিপইয়ার্ডে কাজ করতেন; তার আয় ছিল প্রায় ৭০ হাজার ডলার।

মেলিসা জানান, তারা শুধু গাড়ির জ্বালানি, গ্রোসারি পণ্য ও তাদের চারটি পোষা কুকুরের জরুরি চিকিৎসার জন্যই ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করতেন।

ফলে অন্যান্য খরচ মেটাতে তাদের সুবিধা হতো। সেসব খরচের মধ্যে ছিল ৭ হাজার ডলার বকেয়া কর, ২০১৬ সালে মেলিসার গ্যাস্ট্রিক বাইপাস সার্জারির বাকি বিল ও বাড়ির জন্য মাসে ১ হাজার ২৫০ ডলারের মর্টগেজ (বন্ধকি ঋণ)।

২০২৩ সালে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। এর পরই মেলিসার আর্থিক স্থিতিশীলতা বড় ধাক্কা খায়। ৩০ বছরের জীবনে এই প্রথম সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়েন তিনি। মানসিক চাপ কাটাতে শখ পূরণের জন্য যথেচ্ছ ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করতে শুরু করেন—কখনও বেকিংয়ের সরঞ্জাম, কখনও বা ওজন কমার পরে নতুন জিন্‌স কেনা। এমনকি কুকুরের খাবার কেনা বা পশুচিকিৎসকের ফি মেটানোর জন্যও ভরসা হয়ে দাঁড়ায় ওই কার্ড।

এর মধ্যে একটি কার্ডে সুদের হার পৌঁছায় ২৯ শতাংশে। যতবার বিল পরিশোধে দেরি হয়েছে, ততবারই জরিমানার (লেট ফি) অঙ্ক এত বেড়ে গেছে যে ন্যূনতম বিল মেটানোও তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

নয় মাসের মধ্যেই মেলিসার ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া বিল ফুলেফেঁপে ২০ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যায়। বকেয়া বিল ও জরিমানার ফলে তার ক্যাপিটাল ওয়ান কার্ডের ন্যূনতম বিল বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৬০০ ডলার।

কালেকশন এজেন্সি থেকে ক্রমাগত ফোন আসতে থাকে তার কাছে। তিনি বলেন, ‘ওরা ফোন করেই যায়, বন্ধ করে না। আমার তো মনে হয় ওরা প্রতি ঘণ্টায় ফোন করত—কখনও অফিসে, কখনও বাড়িতে। কিন্তু আমার কাছে টাকা ছিল না।’

ক্রেডিট রিপোর্টিং এজেন্সিগুলোর তথ্যানুসারে, যুক্তরাষ্ট্রে মাথাপিছু ক্রেডিট কার্ডের গড় দেনা ৬ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার ৭০০ ডলার। আরবান ইনস্টিটিউটের তথ্য বলছে, ২০১৮ সালের পর থেকে বিভিন্ন আয়ের স্তরের মানুষের মধ্যে ১০ হাজার ডলারের বেশি বকেয়া থাকা কার্ডধারীর অনুপাত বেড়েছে। গত বছর নিম্নবিত্তদের মধ্যে ১৭ শতাংশ কার্ডধারীর বকেয়া বিল ছিল ১০ হাজার ডলারের বেশি। মধ্যবিত্তদের ক্ষেত্রে এই হার ২০ শতাংশ ও উচ্চবিত্তদের ক্ষেত্রে ছিল ২৫ শতাংশ।

ক্রেডিট কাউন্সেলিং সংস্থাগুলোর গ্রাহকদের পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে ত্রৈমাসিক আর্থিক চাপের পূর্বাভাস প্রকাশ করে ন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর ক্রেডিট কাউন্সেলিং। এর মাধ্যমে ক্রেডিট কার্ডের বিল খেলাপি হওয়ার ঝুঁকির মূল্যায়ন করা হয়। ২০২২ সালে এই পূর্বাভাস দেওয়া শুরু হওয়ার পর থেকে গত ১২ মাসে বিল খেলাপির ঝুঁকি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

ফাউন্ডেশনের মুখপাত্র ব্রুস ম্যাকক্ল্যারি বলেন, বকেয়া পরিশোধ করতে সবচেয়ে বেশি হিমশিম খাচ্ছে মধ্যবিত্তরা। ক্রমেই আরও বেশিসংখ্যক পরিবার ‘টিকে থাকার তাগিদে ঋণের ফাঁদে’ জড়িয়ে পড়ছে।

মেলিসার বেলায় বিবাহবিচ্ছেদের মানসিক যন্ত্রণার সঙ্গে গোদের ওপর বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়ায় পাহাড়প্রমাণ বিল ও টাকা আদায়ের ক্রমাগত ফোন। ২০২৪ সালের অগস্টের এক রাতে আত্মহত্যার চেষ্টাও করেন তিনি। তবে ভয় পেয়ে এক বন্ধুকে খবর দেন। ওই বন্ধু ৯১১-এ ফোন করেন। সে যাত্রায় প্রাণে বাঁচলেও এক সপ্তাহ তাকে হাসপাতালে কাটাতে হয়।

হাসপাতাল থেকে ফিরে মেলিসা নিজের বাড়িটি বিক্রি করে দেন। তা থেকে পাওয়া ১ লাখ ডলার দিয়ে ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া বাদে অন্য প্রায় সব ধারই শোধ করে দেন তিনি। এরপর তিনি আমেরিকান কনজিউমার ক্রেডিট কাউন্সেলিংয়ের দ্বারস্থ হন। এই অলাভজনক সংস্থা ঋণগ্রস্ত মানুষদের সুদের হার ও মাসিক কিস্তি কমানোর জন্য ক্রেডিট কার্ড কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কাজ করে। তারাই মেলিসাকে টাকা পরিশোধের একটি পরিকল্পনা প্রস্তুত করে দেয়। এরপর থেকে মাসে ৫৮৬ ডলার কিস্তি দিয়ে ক্রেডিট কার্ডের দেনার প্রায় অর্ধেক শোধ করেছেন তিনি।

সম্প্রতি আবার বিয়ে করেছেন মেলিসা। ক্রেডিট কার্ড আর ছোঁবেন না বলে প্রতিজ্ঞা করেছেন তিনি। যদিও জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য তার স্বামীর কাছে একটি কার্ড আছে। আপাতত সাউথ পোর্টল্যান্ডে একটি টাউনহাউসে ভাড়ায় থাকছেন তারা। কিন্তু মাসে ২ হাজার ৫০০ ডলার ভাড়া জোগাড় করতে স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই নাভিশ্বাস উঠছে। তাই খরচ কমাতে একটি ছোট বাড়ি কেনার কথা ভাবছেন এই দম্পতি।

মেলিসা বলেন, ‘আগের চেয়ে কিছুটা ভালো আছি ঠিকই, কিন্তু এখনও মাসের রোজগার দিয়ে কোনোমতে মাস চলছে। এই বোঝা লাঘব করতে নতুন ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার তীব্র প্রলোভন কাজ করে ঠিকই। কিন্তু অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে আমি বুঝেছি, শেষপর্যন্ত এতে পরিস্থিতি আরও খারাপই হয়।’

এভাবে সুদহার বৃদ্ধির কারণে নিম্নবিত্তদের পক্ষে দেনার জাল থেকে বেরিয়ে আসা বিশেষভাবে কঠিন হয়ে গেছে। ব্রাগার বিশ্লেষণ অনুসারে, নিম্ন-আয়ের এলাকার—যেসব এলাকায় পরিবারের গড় আয় ৮৯ হাজার ৫০০ ডলারের কম—কার্ডধারীদের মধ্যে অন্তত ৬০ দিনের বকেয়া বিলের হার ৮ শতাংশে পৌঁছেছে। আয়ের যেকোনো স্তরের নিরিখেই এই হার সর্বোচ্চ।

খরচ সামাল দেওয়ার কসরত

৪৬ বছর বয়সি জোসেফ ড্যানিয়েল-হোস্টের ক্রেডিট কার্ডের ভোগান্তি শুরু হয় বেশ কয়েক বছর আগে। মিশিগানের গ্রোস পয়েন্ট ফার্মসের একটি এপিস্কোপাল গির্জায় এক্সিকিউটিভ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করার সময় তার আয় ছিল বছরে ৪০ হাজার ডলার।

গির্জা থেকে প্রতি দুই সপ্তাহ পরপর বেতন পেতেন জোসেফ। মাসের শেষে বেতনের টাকা ফুরিয়ে হাতটান পড়লেই ঘাটতি মেটাতে তিনটি ক্রেডিট কার্ডের ওপর ভরসা করতে হতো তাকে। গাড়ির জ্বালানি বা গ্রোসারি পণ্য থেকে শুরু করে বিছানার নতুন চাদর কেনা—সবকিছুতেই ব্যবহার করতেন কার্ড। মাঝে মাঝে বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে নৈশভোজ সারতেও ওই কার্ডই ছিল সম্বল।

প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পাইপ অর্গানিস্ট ড্যানিয়েল-হোস্ট স্থানীয় অর্কেস্ট্রায় বাজানোর পাশাপাশি অবসরে পিয়ানোও শেখাতেন। তার কাছে নিজের খরচ খুব একটা আকাশছোঁয়া বলে মনে হয়নি। তাছাড়া গির্জার আবাসনে বিনা ভাড়াতেই থাকতেন।

কিস্তির টাকা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে মেটাতেন ড্যানিয়েল। কোনো মাসে একটি কার্ডের ন্যূনতম বিলের চেয়ে সামান্য বেশি টাকা মেটাতেন, তো পরের মাসে অন্য একটি কার্ডের ক্ষেত্রেও একই কাজ করতেন। কিন্তু কার্ডের সুদের হার এক ধাক্কায় ২৪ থেকে ২৬ শতাংশে পৌঁছানোয় বকেয়ার অঙ্ক বেড়েই চলেছিল।

তিনি বলেন, ‘পুরো বিষয়টাই ছিল দড়াবাজির বিপজ্জনক খেলা। আমি দেখতে পাচ্ছিলাম, কিস্তি শোধের পরও আমার দেনার অঙ্ক বেড়েই চলেছে।’

ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া ইউনিভার্সিটির অর্থনীতিবিদ স্কট শু ক্রেডিট কার্ডের খরচ নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি জানান, বিপুলসংখ্যক মানুষের ঘাড়ে বকেয়া বিলের দীর্ঘস্থায়ী বোঝা থাকে। সুদহার আচমকা বেড়ে গেলে তারা কঠিন সমস্যায় পড়েন। বিশেষ করে বকেয়া বিলের অঙ্ক বেশি হলে সমস্যা আরও গুরুতর রূপ নেয়।

এর আগে ফেডারেল রিজার্ভ বোর্ড অভ গভর্নরসে কাজ করেছেন শু। তিনি বলেন, ‘আপনি যদি কেবল ন্যূনতম বকেয়া শোধ করেন, তাহলে সম্ভবত আপনার ক্রেডিট কার্ডের দেনা কোনোদিনই শোধ হবে না।’

ড্যানিয়েল-হোস্ট ও তার স্বামী দুজনেই বাড়তি আয়ের পথ খুঁজতে হিমশিম খেয়েছিলেন। তাদের ক্রেডিট কার্ডের দেনা তত দিনে বেড়ে ২০ হাজার ডলারে পৌঁছেছিল। এই আর্থিক চাপ প্রভাব ফেলেছিল তাদের দাম্পত্য সম্পর্কেও। ‘যেকোনো আলাপই শেষপর্যন্ত অতীতের খরচের হিসাব-নিকাশে গিয়ে ঠেকত।’

বন্ধুদের থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন ড্যানিয়েল। কেউ নিজে থেকে বিল মেটানোর প্রস্তাব না দিলে বাইরে খেতে যাওয়া এড়াতে অজুহাত খুঁজতেন তিনি। কার্ডের বিল নিয়ে তৈরি হওয়া এই টানাপোড়েনের জেরে শেষপর্যন্ত তার স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদও হয়। পরিস্থিতি এমন হয় যে, বাড়তি আয়ের জন্য একের পর এক গানের অনুষ্ঠান করেও বকেয়া মেটাতে ব্যর্থ হন তিনি। চিকিৎসকেরা ড্যানিয়েলকে অবসাদ ও উদ্বেগ কাটানোর ওষুধও দিয়েছিলেন। আত্মহত্যার কথাও ভেবেছিলেন তিনি।

এক প্রকার ঝোঁকের বশেই একটি স্থানীয় অলাভজনক সংস্থায় কাজ নেন ড্যানিয়েল। নিম্নবিত্তদের সরকারি খাদ্য ও বাসস্থানের আবেদন করার জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র জোগাড় করতে সাহায্য করত ওই সংস্থা। সেখানে যোগ দেওয়ার পর তার বেতন ২০ হাজার ডলার বাড়ে। পরে ওই সংস্থার এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর হওয়ার পর তার বেতন আরও ৩০ হাজার ডলার বাড়ে। নতুন সঙ্গীও আসে জীবনে।

তারপরও ঋণের বোঝা গোপনে বয়ে বেড়াচ্ছিলেন তিনি। এক রাতে নতুন সঙ্গীর বাড়ির সোফায় বসে নিজের মনের সেই ভার লাঘব করেন ড্যানিয়েল। তার সঙ্গীও জানান, ক্রেডিট কার্ডের কারণে তার ঘাড়েও প্রায় ১২ হাজার ডলারের দেনা চেপেছে। এই বকেয়া মেটাতে সম্প্রতি কনসোলিডেটেড ক্রেডিট নামে একটি অলাভজনক সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন তিনি। সংস্থাটি মূলত ঋণ পরিচালনার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে বকেয়া পরিশোধে সাহায্য করে। সঙ্গীর কথা শুনে ড্যানিয়েলও ওই সংস্থার দ্বারস্থ হতে রাজি হন।

ড্যানিয়েলের হয়ে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কথা বলে তার ক্রেডিট কার্ডের সুদের হার ৬ শতাংশে নামিয়ে আনে ওই সংস্থা। গত দুই বছরে নিজের সমস্ত দেনা শোধ করে দিয়েছেন ড্যানিয়েল। সম্প্রতি একটি বাড়িও কিনেছেন তারা।

বর্তমানে তাদের ঘাড়ে মাসে ১ হাজার ৯০০ ডলারের বন্ধকি ঋণ রয়েছে। এখনও দুটি ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেন তারা— একটি জরুরি প্রয়োজনে, অপরটি অন্যান্য খরচের জন্য। তবে দ্বিতীয় কার্ডটির ব্যবহার যথাসম্ভব সীমিত রাখার চেষ্টা করেন।

বকেয়ার বিশাল বোঝা থেকে মুক্তি পেয়ে অনেকটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেও, আর্থিক বিষয় নিয়ে এখনও চিন্তামুক্ত হতে পারেননি ড্যানিয়েল। তার সঙ্গী এখনও নিজের পুরনো ক্রেডিট কার্ডের দেনা শোধ করছেন।

ড্যানিয়েল বলেন, ‘কোনো কারণে যদি এক মাস বেতন না পাই, তবে কী হবে? এখন আমরা বাড়ির মালিক, তাই এই বিষয়টা নিয়ে নিজেদের মধ্যে অনেক আলোচনা করি। কারণ এখন খরচের বহর অনেকটা বেড়েছে। আচমকা বড় কোনো বিপদ এসে পড়লে কী করব আমরা?’

ক্যাথরিন ক্লার্কও তার দেনা সম্পূর্ণ পরিশোধ করেছেন। গত বছর এক ঋণ পরামর্শদাতা কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। প্রথমে তাদের সাহায্যে এবং পরে ডিসেম্বরে অফিসের বোনাসের টাকায় বকেয়া বিল মেটান তিনি। তবে ওই অভিজ্ঞতা তাকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছে। জিমের খরচ কমিয়েছেন তিনি। রোজকার স্টারবাকসের খরচ বাঁচাতে একটি কফি মেশিন কিনেছেন। শুধু তা-ই নয়, মাসের শুরুতে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বেতন ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে যাতে ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া মিটিয়ে ফেলা যায়, তার জন্য সব রকম চেষ্টাই করেন তিনি।

ক্যাথরিন বলেন, ‘অন্যান্য অনেক আমেরিকানের মতোই, বড়সড় এক-আধটা বিপদ এলেই হয়তো আবার আমাকে বলতে হবে—হে ঈশ্বর, আমি তো আবার দেনার দায়ে জড়িয়ে পড়লাম!’-সংবাদসুত্র দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল