নিউইয়র্ক সিটির প্রায় ২৪ লাখ ভাড়া-নিয়ন্ত্রিত (রেন্ট-স্ট্যাবিলাইজড) ভাড়াটের জন্য বড় স্বস্তির খবর এসেছে। নিউইয়র্ক সিটি রেন্ট গাইডলাইন্স বোর্ড (আরজিবি) ৭-১ ভোটে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আগামী দুই বছরের জন্য ভাড়া-নিয়ন্ত্রিত অ্যাপার্টমেন্টের ভাড়া বাড়ানো হবে না। ফলে ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নবায়ন হওয়া এক বছর ও দুই বছর উভয় মেয়াদের লিজেই ভাড়া বৃদ্ধির হার থাকবে শূন্য শতাংশ। নিউইয়র্কের ১৫৭ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম দুই বছরের লিজের ক্ষেত্রেও ভাড়া বৃদ্ধি পুরোপুরি স্থগিত রাখা হলো।
গত ২২ জুন সোমবার সন্ধ্যায় ম্যানহাটনের ইস্ট হার্লেমের এল মিউজিও দেল বারিও থিয়েটারে অনুষ্ঠিত ভোটাভুটির ফল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই উপস্থিত শত শত ভাড়াটে উল্লাসে ফেটে পড়েন। কেউ আনন্দে কেঁদেছেন, কেউ স্লোগান দিয়েছেন, আবার অনেকে রাস্তায় নেমে বিজয় উদযাপন করেছেন। ভোটের আগে ভাড়াটেরা ‘ভাড়া স্থির রাখুন’ ও ‘রোলব্যাক চাই’ লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে সমাবেশ করেন।
নিউইয়র্ক সিটিতে প্রায় ১০ লাখ রেন্ট-স্ট্যাবিলাইজড অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে, যেখানে বসবাস করেন প্রায় ২৪ লাখ মানুষ। এসব ভবনের বেশিরভাগই ১৯৭৪ সালের আগে নির্মিত ছয় বা তার বেশি ইউনিটের আবাসন অথবা সরকারি কর-ছাড় ও ভর্তুকিপ্রাপ্ত ভবন। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে এসব বাড়ির ভাড়াটেরা অন্তত দুই বছর অতিরিক্ত ভাড়ার চাপ থেকে মুক্ত থাকবেন।
ভাড়াটে সংগঠনগুলোর দাবি, দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফলেই এই সিদ্ধান্ত এসেছে। মেয়র নির্বাচনের আগে হাজারো ভাড়াটে ভাড়া স্থির রাখার দাবিতে প্রচারণা চালান এবং বিষয়টি নির্বাচনী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসেন। নির্বাচিত হওয়ার পর নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি এই সিদ্ধান্তকে ভাড়াটেদের জন্য ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ বলে অভিহিত করেন। চায়নাটাউনভিত্তিক সংগঠন সিএএএভির (CAAAV) ভাড়াটে নেতা লিন্ডা লিন বলেন, শ্রমজীবী ও অভিবাসী ভাড়াটেরা সংগঠিত হয়ে এই অর্জন সম্ভব করেছেন। তাঁর ভাষায়, এটি কেবল শুরু, ভবিষ্যতেও ভাড়াটেদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন চলবে।
তবে ভোটের আগে বোর্ডে নাটকীয় পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হয়। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি ক্রিস্টিনা স্মিথ ভোটের কয়েক ঘণ্টা আগে পদত্যাগ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, বোর্ড নিজেদের উপাত্ত উপেক্ষা করে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এরপরও কোরাম বজায় থাকায় ভোট অনুষ্ঠিত হয়। মালিকপক্ষের আরেক প্রতিনিধি মাকসিম ওয়িন দীর্ঘ বক্তব্যের পর শেষ পর্যন্ত ভাড়া বৃদ্ধি শূন্য রাখার পক্ষেই ভোট দেন। ফলে সিদ্ধান্তটি ৭-১ ভোটে অনুমোদিত হয়।
ভাড়াটে সংগঠনগুলোর দাবি, গত কয়েক বছরে বাড়ির মালিকদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, অথচ অনেক ভবনে তাপ, গরম পানি ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে অভিযোগও বেড়েছে। তাদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ফেডারেল সামাজিক সহায়তা কর্মসূচিতে কাটছাঁট এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির এই সময়ে ভাড়া না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত লাখো পরিবারের জন্য বড় স্বস্তি নিয়ে এসেছে। কমিউনিটি সার্ভিস সোসাইটির হিসাব অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্তের ফলে আগামী চার বছরে নিউইয়র্কের ভাড়াটেরা সম্মিলিতভাবে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করতে পারবেন।
অন্যদিকে বাড়ির মালিকদের সংগঠনগুলো এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে। রিয়েল এস্টেট বোর্ড অব নিউইয়র্কের প্রেসিডেন্ট জেমস হোয়েলান বলেন, পরিচালন ব্যয় ক্রমাগত বাড়লেও বোর্ড তা বিবেচনায় নেয়নি। তাঁর মতে, রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় হলেও এই সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে আবাসন সংকট আরও জটিল করবে। নিউইয়র্ক অ্যাপার্টমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান নির্বাহী কেনি বার্গোসও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এতে পুরোনো ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যাহত হতে পারে।
তবে নিউইয়র্ক সিটির স্বাধীন বাজেট দপ্তরের তথ্য বলছে, ভাড়া-নিয়ন্ত্রিত ভবনের আর্থিক সংকট মূলত সীমিতসংখ্যক মালিকের মধ্যে কেন্দ্রীভূত এবং অধিকাংশ মালিক এখনও আর্থিকভাবে স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছেন। সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর শত শত ভাড়াটে রাস্তায় নেমে উদযাপন করেন। ভাড়াটে সংগঠনের নেতারা বলেন, এই রায় শুধু ভাড়া স্থির রাখার সিদ্ধান্ত নয়, বরং সংগঠিত আন্দোলনের শক্তিরও প্রমাণ। তাঁদের মতে, নিউইয়র্কে দীর্ঘদিন ধরে আবাসন নীতিতে প্রভাবশালী রিয়েল এস্টেট লবির বিপরীতে এবার ভাড়াটেদের কণ্ঠই গুরুত্ব পেয়েছে।














