ক্রমেই বড় সংকটে পড়ছে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা। ইউরোপ ও উত্তর, মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের পর এবার এশিয়ার ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনও (এএফসি) প্রকাশ্যে বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক অধিকার প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে। ফলে বিশ্বকাপসহ ফিফার প্রধান প্রতিযোগিতাগুলোর অংশীদারত্ব বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির পরিকল্পনা অনুমোদন পাওয়ার সম্ভাবনা এখন অনেকটাই কমে গেছে।
শুক্রবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এএফসি জানায়, ইউরোপিয়ান ফুটবল সংস্থা উয়েফা এবং উত্তর, মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের সংস্থা কনকাকাফের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করছে তারা। ইনফান্তিনোর প্রস্তাব এমন একটি উদ্যোগ, যা বাস্তবসম্মতভাবে প্রয়োজনীয় ঐকমত্য ও ঐক্য অর্জন করতে পারবে না বলে মনে করে সংস্থাটি।
এএফসি আরও বলেছে, বিশ্বকাপ বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর। এই প্রতিযোগিতার শক্তি এসেছে সব কনফেডারেশন এবং বিশ্বের সেরা ফুটবল দেশগুলোর অংশগ্রহণ থেকে। তাই এমন কোনো প্রস্তাব, যা বিশ্বকাপের সার্বজনীনতা ও ঐক্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে, তা নতুন করে বিবেচনা করা উচিত।
এশিয়ার ৪৬টি সদস্য দেশের সমর্থন হারানো ইনফান্তিনোর জন্য বড় ধাক্কা। কারণ ফিফার মোট ২১১ সদস্য দেশের ভোটে এই প্রস্তাব পাস করাতে প্রয়োজন সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা, অর্থাৎ অন্তত ১০৬টি ভোট। কিন্তু উয়েফার ৫৫, কনকাকাফের ৩৫ এবং এএফসির ৪৬টি মিলিয়ে মোট ১৩৬টি ভোট রয়েছে। ফলে তারা একসঙ্গে বিরোধিতা করলে প্রস্তাবটি অনুমোদন পাওয়ার সম্ভাবনা কার্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
এএফসি শুধু প্রস্তাবের বিরোধিতাই করেনি, ফিফার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকেও কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছে। তাদের অভিযোগ, সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে কোনো অর্থবহ আলোচনা ছাড়াই ফিফা আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করেছে। এমনকি ফিফা কাউন্সিলসহ সংস্থাটির নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামোকেও এই প্রক্রিয়ায় কার্যত উপেক্ষা করা হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বিশ্বকাপ কিংবা ফুটবল কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পদ নয়। এটি পুরো বৈশ্বিক ফুটবল পরিবারের সম্পদ। তাই এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সব কনফেডারেশন ও সদস্য দেশের মতামত নিয়েই নেওয়া উচিত। পাশাপাশি ফিফার প্রশাসনিক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া জরুরি ভিত্তিতে পুনর্বিবেচনারও আহ্বান জানিয়েছে এশিয়ার ফুটবল সংস্থাটি।
এর আগে বৃহস্পতিবার উয়েফা ঘোষণা দেয়, ইনফান্তিনোর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতের বিশ্বকাপ বয়কট করার বিষয়টিও বিবেচনা করবে তারা। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে কনকাকাফও আলাদা বিবৃতিতে একই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।
ক্রমবর্ধমান বিরোধিতার মধ্যেও অবশ্য নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি ফিফা। শুক্রবার ভোরে দেওয়া এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার কাজ অব্যাহত থাকবে। তবে একই সঙ্গে তারা দাবি করে, ‘কেউ ফুটবল বিক্রি করছে না।’
ফিফার ভাষ্য, গণমাধ্যমে ভুল তথ্য প্রকাশের কারণে পুরো আলোচনা বিভ্রান্ত হয়েছে। নতুন প্রতিষ্ঠান গঠন করা হলেও ফুটবলের মৌলিক চেতনা কিংবা ফিফার শাসনব্যবস্থার কোনো ক্ষতি হবে না বলে দাবি সংস্থাটির।
অন্যদিকে উয়েফার অভিযোগ আরও কঠোর। ইউরোপের ফুটবল সংস্থাটি বলেছে, ফুটবলকে ব্যবহার করে নিজেদের এবং নিজেদের ঘনিষ্ঠদের আরও ধনী করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাদের ভাষায়, ‘বিশ্বকাপ কোনো বিনিয়োগ পণ্য নয়। এটি ফুটবলের সবচেয়ে মূল্যবান ঐতিহ্যের একটি। খেলোয়াড়, জাতীয় দল এবং কোটি কোটি সমর্থকের অবদানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এটি গড়ে উঠেছে। এর কোনো অংশই কখনো বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে তুলে দেওয়া উচিত নয়। বিশ্বকাপ বিক্রির জন্য নয়।’
ইনফান্তিনোর পরিকল্পনা অনুযায়ী, ‘ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি নতুন বাণিজ্যিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠন করা হবে। বিশ্বকাপসহ ফিফার প্রধান প্রতিযোগিতাগুলোর বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে এই প্রতিষ্ঠান। বাইরের বিনিয়োগকারীরা এতে সংখ্যালঘু অংশীদার হতে পারবেন।
বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগানের প্রস্তুত করা ২৫ পৃষ্ঠার একটি নথিতে বলা হয়েছে, নতুন এই কাঠামো বাস্তবায়িত হলে ২০৩৫ থেকে ২০৩৯ সালের মধ্যে ফিফার প্রতিটি সদস্য দেশ প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ ইউরো পর্যন্ত আর্থিক সুবিধা পেতে পারে। নথিতে নতুন ব্যবসায়িক উদ্যোগ এবং দক্ষ জনবল আকর্ষণে প্রণোদনাভিত্তিক পারিশ্রমিকের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সেখানে নারী ফুটবল নিয়ে কোনো পরিকল্পনার উল্লেখ নেই।
এদিকে দক্ষিণ আমেরিকার কনফেডারেশন কনমেবল এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো অবস্থান জানায়নি। আফ্রিকার সিএএফ এবং ওশেনিয়ার ওএফসিও জানিয়েছে, তারা আগস্টে বৈঠক করে বিষয়টি নিয়ে নিজেদের সিদ্ধান্ত নেবে।















