১৩ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

নিউইয়র্ক

নিউইয়র্ক সিটিতে “আইস” এর বড় অভিযান চালানোর হুমকি, ‘আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি এজেন্ট পাঠানোর ঘোষণা

নিউইয়র্ক সিটিতে “আইস” এর বড় অভিযান চালানোর হুমকি, ‘আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি এজেন্ট পাঠানোর ঘোষণা

যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন সংক্রান্ত আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আইস (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট)-এর ব্যাপক অভিযান চালানোর হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প প্রশাসনের সীমান্তবিষয়ক প্রধান কর্মকর্তা টম হোম্যান। তিনি বলেছেন, নিউইয়র্ক সিটিতে এমন সংখ্যক আইসিই এজেন্ট মোতায়েন করা হবে যা এর আগে কখনও দেখা যায়নি। গত সোমবার ৮ জুন সোমবার ফক্স নিউজের ‘ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে টম হোম্যান এ মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, নিউইয়র্ক স্টেট গভর্নর ক্যাথি হখুল সম্প্রতি নিউ ইয়র্ক স্টেটে যে ইমিগ্রেশন -সংক্রান্ত আইন পরিবর্তন অনুমোদন করেছেন, তার প্রতিক্রিয়াতেই এই পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

টম হোম্যানের ভাষায়, “আমি গভর্নরক হোকুলকে আগেই বলেছিলাম, “নিউইয়র্ক সিটিতে আপনি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি আইস দেখতে পাবেন। পরিকল্পনা প্রস্তুত হচ্ছে। ঠিক কবে তা হবে, এখনই বলছি না, তবে এটি আসছে।”

তার এই বক্তব্য এমন সময়ে এসেছে যখন নিউইয়র্ক সিটি এনবিএ ফাইনালস ও বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে বিপুল সংখ্যক দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

গত মাসে গভর্নর ক্যাথি হোকুল নিউ ইয়র্ক স্টেটের জন‍্য কার্যকর ইমিগ্রেশন -সংক্রান্ত একগুচ্ছ নতুন বিধান অনুমোদন করেন। এসব বিধানের মাধ্যমে স্থানীয় পুলিশ ও সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে ফেডারেল ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের সহযোগিতার সুযোগ আরও সীমিত করা হয়েছে।

নতুন বিধি অনুযায়ী কোনো ফেডারেল কর্মকর্তা নাগরিক বা অভিবাসীদের সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন করলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি তার বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবেন।

একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার বা পুলিশ বিভাগকে এমন কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি করতে নিষেধ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে স্থানীয় কর্মকর্তারা ফেডারেল ইমিগ্রেশন সংস্থার পক্ষে ইমিগ্রেশন আইন প্রয়োগে অংশ নেন।

এছাড়া আদালতের অনুমোদিত পরোয়ানা ছাড়া কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্পত্তিতে ফেডারেল ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের প্রবেশের সুযোগ সীমিত করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জনসাধারণের সঙ্গে যোগাযোগের সময় মাস্ক ব্যবহার বা মুখ ঢেকে রাখার বিষয়েও নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

তবে স্টেট প্রশাসনের কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন, কোনো অভিবাসী ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে সাজা ভোগ শেষ করলে তাকে আটক করার ক্ষেত্রে ফেডারেল সংস্থাগুলো এখনও আইনগত সুযোগ পাবে।

নিউইয়র্ক সিটির ডেমোক্র্যাট মেয়র জোহরান মামদানি টম হোম্যানের বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “আমরা আইসিই বা অন্য কাউকে আমাদের কমিউনিটিতে ভয় ছড়াতে দেব না। বিশেষ করে এমন একটি সময়ে, যখন পুরো বিশ্বের মানুষ আমাদের শহরে আসছে।”

উগান্ডায় জন্ম নেওয়া এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হিসেবে আসা তেহরান মামদানি বলেন, অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রের ক্রীড়া ও সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশ্বকাপের মতো বড় আয়োজনও তাদের অবদানের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।

অন্যদিকে নিউ ইয়র্ক স্টেট গভর্নর হোকুলও ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থানের সমালোচনা করেছেন। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগে বলেছিলেন, কোনো স্টেট বা স্থানীয় প্রশাসন সাহায্য না চাইলে সেখানে জোরপূর্বক অভিবাসন অভিযান বাড়ানো হবে না। কিন্তু টম রোমানের বর্তমান হুমকি সেই অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

গভর্নর হোকুল আরো বলেন, “আমাদের স্থানীয় পুলিশকে স্থানীয় অপরাধ দমনে মনোযোগী থাকতে হবে। স্কুল, বাড়ি বা কর্মস্থল থেকে মানুষ ধরে এনে কারাগার ভরাট করার কাজে আমরা সহযোগিতা করব না। তবে অপরাধীদের ব্যাপারে আমরা সব সময় সহযোগিতা করেছি এবং ভবিষ্যতেও করব।”

তিনি আরও সতর্ক করেন, বড় ধরনের আইসিই অভিযান নিউইয়র্কের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং রাজনৈতিকভাবেও এর প্রতিক্রিয়া পড়তে পারে।

নিউইয়র্ক সিটির মতো কিছু এলাকায় আগেই ফেডারেল ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সহযোগিতার ওপর সীমাবদ্ধতা ছিল। তবে গভর্নর হোকুল এর স্বাক্ষর করা নতুন আইন কার্যকর হলে লং আইল্যান্ডের নাসাউ কাউন্টির মতো এলাকাগুলোও প্রভাবিত হবে। নাসাউ কাউন্টি গত বছর আইসিইর সঙ্গে একটি সহযোগিতা চুক্তি করেছিল।

গত কয়েক বছর ধরেই নিউইয়র্কে আইসিইর কার্যক্রম বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ইমিগ্রেশন আদালতের ভেতরে অভিযান চালানো, আটক ব্যক্তিদের অস্থায়ী আটককেন্দ্রে রাখার পরিবেশ এবং বিভিন্ন অভিযানের ধরন নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো একাধিকবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন মূলত ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন শহরে ব্যাপক ইমিগ্রেশন এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালনা করে। এসব অভিযানে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, বর্ণগত পরিচয়ের ভিত্তিতে সন্দেহভাজনদের আটক এবং পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তারের অভিযোগ ওঠে। যদিও সংশ্লিষ্ট ফেডারেল সংস্থাগুলো এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

এখন নিউইয়র্কে নতুন করে বড় ধরনের ইমিগ্রেশন এনফোর্সমেন্ট বা আইসিই অভিযান চালানোর সম্ভাবনা ঘিরে ফেডারেল সরকার ও স্টেট প্রশাসনের মধ্যে উত্তেজনা আবারও প্রকাশ্যে এসেছে। ইমিগ্রেশন নীতি নিয়ে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যে এই ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শহরে নতুন উদ্বেগ ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।