২৩শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

শেষের পাতা

শরণার্থী থেকে সিআইএ-র গোয়েন্দা হয়েও এখন আইসের কবলে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের জেলে

শরণার্থী থেকে সিআইএ-র গোয়েন্দা হয়েও এখন আইসের কবলে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের জেলে

ওসামা বিন লাদেনকে খোঁজা থেকে শুরু করে আল-কায়েদা ও আইসিসের মতো জঙ্গি সংগঠনের নাশকতামূলক পরিকল্পনা নস্যাৎ; সবখানেই জীবন বাজি রেখে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে কাজ করেছিলেন তিনি। কিন্তু দীর্ঘ এক দশক সিআইয়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যদাতা হিসেবে কাজ করার পরও শেষ রক্ষা হলো না ব্লেরিম স্কোরোর (৫৫)। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস) কর্তৃক আটক হয়ে ডিপোটেশন এর অপেক্ষায় দিন গুনছেন।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টাইমস’-এর বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ব্লেজিম স্কোরোর এই করুণ কাহিনি। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রকে বড় ধরনের সন্ত্রাসী চক্রান্ত থেকে রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন স্কোরো। ওসামা বিন লাদেনকে খোঁজার সময় জীবন ঝুঁকিতে ফেলে পাকিস্তানের আল-কায়েদা ক্যাম্পেও অনুপ্রবেশ করেছিলেন তিনি।

প্রায় এক দশক ধরে আমেরিকার তথ্যদাতা হিসেবে কাজ করে আল-কায়েদার অস্ত্র চালানের মতো বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সিআইএ-কে সরবরাহ করেন তিনি। এমনকি তার তথ্য প্রদানের ফলে আল-কায়েদাকে জিহাদিদের কাছে অস্ত্র সরবরাহ করা থেকে বিরত রেখেছিল।

স্কোরো দাবি করেন, ২০১০ সালে তথ্যদাতার কাজ শেষ করার পর যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাকে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের (গ্রিন কার্ড) প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু প্রতিশ্রুতি রক্ষা তো দূরের কথা, চলতি বছরের ৩ আগস্ট নিউ জার্সিতে কাজের অনুমতিপত্র (ওয়ার্ক পারমিট) নবায়ন করতে গিয়ে উল্টো আইসিই কর্মকর্তাদের হাতে হাতকড়া পরতে হয় তাকে।

নিউ জার্সির এলিজাবেথে আইসিই-এর আটক কেন্দ্রে বসে দ্য টাইমসকে স্কোরো বলেন, ‘আমি সিআইএ’র হয়ে কাজ করেছি, এই দেশের জন্য এত কিছু করেছি, আর এখন আমি হাতকড়া পরা অবস্থায় কারাগারে। তারা আমার কাজের পারমিট আর ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখে হঠাৎ হাতকড়া পরিয়ে দিল। এর কোনো মানে হয় না।’

নিজের ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, ‘আমি সিআইএ-এর হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করেছি, অথচ তারা আমার সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করল। এটা সিআইএ-এর হয়ে কাজ করতে চাওয়া অন্যদের কী বার্তা দেবে? এটি প্রমাণ করে যে, আমেরিকা কাউকে সুরক্ষা দেয় না। তারা আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।’

তিনি বলেন, ‘আমার মনোবল অনেক দৃঢ়, আমি যুদ্ধে অংশ নিয়েছি, আমার সামরিক প্রশিক্ষণ আছে, কিন্তু এবার মনে হচ্ছে আমাকে যেন হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করা হয়েছে।’

যেভাবে সিআইএ-তে যোগ দেন স্কোরো:

১৯৯৪ সালে যুগোস্লাভ সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় চেয়েছিলেন স্কোরো। ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগে কসোভো যুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা তার ছোট সন্তান ও শরণার্থী মা-বাবার খরচের যোগান দিতে অল্প সময়ের জন্য মাদক চোরাচালানে জড়িয়ে পড়েন তিনি। এরপর পেনসিলভানিয়ার একটি কারাগারে সাত বছরের সাজা খাটার সময়, ৯/১১ হামলার ঠিক পরদিনই তাকে নিয়োগ করে সিআইএ। কসোভোর মুসলিম হওয়ায় এবং ধর্মীয় জ্ঞান থাকায় জঙ্গি নেটওয়ার্কগুলোতে অনুপ্রবেশের জন্য তাকেই সেরা মনে করেছিলেন মার্কিন এজেন্টরা। অন্যদিকে সার্বিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কসোভোবাসীদের সমর্থনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ করতেন স্কোরো।

২০২৪ সালের নভেম্বরে দ্য টাইমস-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি দ্বিতীয়বার কিছু ভাবিনি। আমি নিজেকে আগে আমেরিকার একজন দেশপ্রেমিক এবং দ্বিতীয়ত একজন মুসলিম মনে করতাম। আমি এই দেশকে প্রতিদান দিতে চেয়েছিলাম।’

গোয়েন্দা কাহিনীর সত্যতা যাচাই করা কঠিন হলেও স্কোরোর আন্ডারকভার থাকার সময় ধারণ করা ভিডিও ফুটেজ, হ্যান্ডলারদের চিঠিপত্র এবং কানাডা ও মার্কিন ইমিগ্রেশন আদালতের নথি ঘেঁটে তার দাবির সত্যতা পেয়েছে দ্য টাইমস। এমনকি তার সেই ফুটেজ ২০২৪ সালের প্রামাণ্যচিত্র ‘দ্য অ্যাক্সিডেন্টাল স্পাই’-এ ব্যবহার করা হয়।

কারাদণ্ড ভোগ করার সময়ই, তিনি লস অ্যাঞ্জেলেস বিমানবন্দরে বোমা হামলার কথিত ‘মিলেনিয়াম প্লট’-এর পেছনে থাকা আলজেরিয়ান মোখতার হাউয়ারিসহ তার সহবন্দীদের সম্পর্কে এফবিআই এবং সিআইএ-এর সঙ্গে তথ্য শেয়ার করা শুরু করেন।

স্কোরো মনে করেছিলেন, কাজের বিনিময়ে তিনি কম সাজা পাবেন। কিন্তু তার বদলে ২০০৭ সালে তাকে কসোভোতে ফেরত পাঠানো হয়। তথ্যদাতা হিসেবে কাজ করা সময় তিনি আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন এবং বলকান অঞ্চলজুড়ে নানা মিশনে অংশ নেন।

বিন লাদেনের সন্ধানের সময় তিনি পাকিস্তানের আল-কায়েদা ক্যাম্পে অনুপ্রবেশ করেন এবং সিরিয়ায় আইসিসের সন্ত্রাসী চক্রান্ত নস্যাৎ করেন। আর এসবকিছুর মাধ্যমে স্ত্রী সুজান এবং তাদের কন্যাসন্তান ও ছেলেকে আমেরিকায় আইন অনুযায়ী বসবাস করার অনুমতি দেওয়া হবে বলে ভেবছিলেন তিনি।

তিনি জানান, বিন লাদেন, সন্ত্রাসী চক্রান্ত, অস্ত্র ও অর্থায়ন নেটওয়ার্ক সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করেছিলেন তিনি। কিন্তু বৈঠকের নানাবিধ প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও স্কোরো কখনো আল-কায়েদা প্রধানের কাছাকাছি যেতে পারেননি।

তবে, তিনি আল-কায়েদার শীর্ষ নেতাদের আস্থা অর্জন করেছিলেন, যারা স্কোরোকে বলকান অঞ্চলে বেড়ে ওঠা জিহাদিদের কাছে বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, স্টিংগার এবং রকেট লঞ্চার সরবরাহ ও পাচারের দায়িত্ব দিয়েছিল। স্কোরো সিআইএ-কে বিষয়টি নিয়ে সতর্ক করলে সেই চালানটি আটকানো সম্ভব হয়।

স্কোরো দাবি করেন, তিনি কসোভোতে ইউরেনিয়ামের চালান আটকাতেও সাহায্য করেছিলেন। স্কোরো জানান, ২০১০ সালে মেসিডোনিয়ার একটি সিআইএ সেফ হাউসে যাওয়ার সময় তিনি অতর্কিত হামলার শিকার হন। সেসময় তিনি গুলিবিদ্ধ হন। নিরাপত্তার জন্য বিমানে করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে, তাকে একটি খামে নগদ টাকা দেওয়া হয় এবং কসোভোতে ফেরত যেতে বলা হয়।

স্কোরো সিদ্ধান্ত নেন, গ্রিন কার্ড পেতে সিআইএ-এর সাহায্যের জন্য আর অপেক্ষা না করে নিজেই কানাডায় চলে যাবেন। কানাডা থেকে, তিনি পরিবারের কাছে যেতে ২০১৫ সালে নিজের প্রচেষ্টায় সীমান্ত পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অনুপ্রবেশ করেন। সাবওয়েতে তার মেয়ের মেট্রো কার্ড ব্যবহার করার পর ইমিগ্রেশন এজেন্টরা তাকে গ্রেপ্তার করে। ২০১৬ সালে মুক্তি পাওয়ার আগে তিনি ফেডারেল হেফাজতে ছয় মাস কাটান।

ইমিগ্রেশন আদালতে ছয় বছরের আইনি লড়াইয়ের পর, আন্ডারকভার সময়ের কারণে নিজ দেশে ফেরত পাঠালে তাকে হত্যা করা হতে পারে জানানোর পর ২০২২ সালে জাতিসংঘের কনভেনশনের অধীনে স্কোরোকে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়। এর মানে হলো তাকে কসোভোতে ফেরত পাঠানো যাবে না, তবে আলবেনিয়া বা অন্য কোনো ইউরোপীয় দেশ যা তাকে গ্রহণ করতে ইচ্ছুক, তেমন কোনো নিরাপদ তৃতীয় দেশে পাঠানো যেতে পারে।

‘আইস’ কর্মকর্তাদের ওপর প্রতিদিনের গ্রেপ্তারের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করার চাপ থাকে। এটি প্রতিদিন ২ থেকে ৩ হাজার পর্যন্ত হতে পারে বলে জানা গেছে। এর ফলে মূল লক্ষ্যভুক্ত ব্যক্তি নন এমন ব্যক্তিদেরও আটক করার উদ্বেগ বেড়েছে।

স্কোরো দ্য টাইমসকে বলেন, ‘তাদের দিনে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক লোককে গ্রেপ্তার করতে হয় এবং আমি তাদের মধ্যেই একজন। আমি পুরোপুরি নির্দোষ, ২০২২ সালের পর থেকে আমি কোনো অপরাধ করিনি এবং আমি প্রতি বছর ট্যাক্স রিটার্ন দাখিল করেছি।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইস তত্ত্বাবধানকারী ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি কোনো মন্তব্য করেনি। স্কোরোকে আটকের সময় ৫০ জনেরও বেশি লোকের সঙ্গে তাকে একটি কক্ষে রাখা হয়েছিল। তিনি জানান, গ্রেপ্তারকারী এজেন্টদের কাছে তার পরিচয় এবং সিআইএ-এর সঙ্গে তার নিজের বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন।

স্কোরো বলেন, ‘আমি অফিসারকে বলছি, গুগলে আমার নাম সার্চ দিন এবং দেখুন আমি কে, আমি একজন পরিচিত ব্যক্তি।’ তবে অফিসার তাকে চিনতে পারলেও নিজের দায়িত্ব পালনেই সচেষ্ট ছিলেন।

স্কোরো একজন সুপারভাইজারকে অন্য এজেন্টদের বলতে শুনেছেন, ‘আমি বুঝতে পারছি না যে, প্রেসিডেন্ট কেন এমন একজনকে কারাগারে পাঠাতে চাইবেন, যিনি এক দশক ধরে আমাদের জাতির সেবা করেছেন।’

স্কোরোর আইনজীবীরা তার পক্ষে ফেডারেল আদালতে একটি হেবিয়াস কর্পাস পিটিশন দাখিল করেছেন, যেখানে তাকে অবিলম্বে মুক্তি এবং যেকোনো হস্তান্তরের ওপর স্থগিতাদেশের অনুরোধ করা হয়েছে। আবেদনে দাবি করা হয়, ‘সিআইএ এজেন্ট’ হিসেবে বছরের পর বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ কাজের পর তাকে রেসিডেন্সি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।’

১৭ আগস্ট নিউ জার্সির ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে পেশ করা একটি নথিতে স্কোরো লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র সরকার তার বাধ্যবাধকতা পালন করতে এবং আমাকে দেওয়া ইমিগ্রেশনের প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। আমার স্ত্রী এবং যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া তিন সন্তানের বৈধতা রয়েছে।’

স্কোরো বিচারককে লিখেছেন, ‘আমি যুক্তরাষ্ট্রে আরামে বসবাস করেছি। আমি একজন ড্রাইভার এবং আমার পরিবারকে ব্যয় মেটানোর জন্য সপ্তাহে ৭০ ঘণ্টা পর্যন্ত খুব কঠোর পরিশ্রম করি। আমি বিশ্বাস করি যে বৈশ্বিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কগুলোতে অনুপ্রবেশের কাজের ওপর ভিত্তি করে আমাকে যদি কোনো তৃতীয় দেশে ফেরত পাঠানো হয় তবে আমাকে হত্যা করা হবে। এ অবস্থায়, আমি আইস হেফাজত থেকে আমার অবিলম্বে মুক্তি কামনা করছি।’- লন্ডন থেকে প্রকাশিত দ্য টাইমস থেকে।