নিউইয়র্কে ১শ ২৬ একর জমিতে এক লক্ষ কবরস্থানের প্রথম পর্যায়ের উদ্বোধন, কমিউনিটির কল্যাণে গ্রেটার নোয়াখালী সোসাইটির বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন । গত ২০ জুন (শনিবার) দুপুরে যুক্তরাষ্ট্র সর্ব বৃহৎ মুসলিম কবরস্থান স্কচটাউন বাংলাদেশ সিমেট্রিতে আনুষ্ঠানিকভাবে কবর দেয়ার ঘোষণা উপলক্ষে সুধী সমাবেশ দোয়া ও মোনাজাত এর আয়োজন করা হয় । ঐদিন সকাল সাড়ে ১১টায় গ্রেটার নোয়াখালী সোসাইটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও বর্তমান উপদেষ্টা কমিটির সদস্য মরহুম এসএম আমানতের জানাজা শেষে তাঁকে সর্বপ্রথম এ কবরস্থানে দাফন করা হয়। আগামী ১ জুলাই থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দাফন কার্যক্রম শুরু হবার কথা থাকলেও মূলত ২০ জুন থেকে কবর দেয়া আরম্ভ হলো ।

বিশাল এ কবরস্থানে লক্ষাধিক মানুষকে দাফন করা যাবে । এটির ব্যবস্হাপনায় রয়েছে গ্রেটার নোয়াখালী সোসাইটি । উদ্বোধনী দিনে কবরস্থানে দাঁড়িয়ে উপস্থিত সবাই মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় জ্ঞাপন সহ দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হওয়ায় আনন্দে অশ্রু সিক্ত হতে দেখা গেছে অনেক কে।

কবরস্থানে আয়োজিত সুধী সমাবেশে গ্রেটার নোয়াখালী সোসাইটির সম্প্রতি বিদায়ী সভাপতি নাজমুল হাসান মানিকের সভাপতিত্বে এবং বর্তমান সেক্রেটারি এ এস এম মাঈন উদ্দিন পিন্টুর সন্চালনায় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত ও মোনাজাত করেন মাওলানা মন্জুরুল করিম । বক্তব্য রাখেন প্রকল্পের স্বপ্নদ্রষ্টা ও গ্রেটার নোয়াখালী সোসাইটির বর্তমান সভাপতি জাহিদ মিন্টু । অশ্রুসিক্ত নয়নে তিনি বলেন, “আমরা আজ আমাদের একজন প্রিয় মানুষকে দাফন করেছি এটি সত্যিই বেদনাদায়ক ও শোকাহত ঘটনা।

তিনি বলেন দীর্ঘ দিন যাবত একটি মহল নানা ষড়যন্ত্র মিথ্যা ও বানোয়াট গুজব ছড়িয়ে কমিউনিটিতে বিভ্রান্তি করার চেষ্টা করেছেন তাদের সকল ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে । তাদেরকে ক্ষমা করে দিলাম । তারপরও কেউ ষড়যন্ত্রে জড়িত হলে আর ছাড় দেয়া হবেনা।” এ প্রকল্পের যাবতীয় কাগজপত্রাদি দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের তিনি বুঝিয়ে দেন । সমাবেশে আরো বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সাবেক সভাপতি এম এ রব মিয়া, সংগঠনের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মফিজুর রহমান, খোকন মোশারফ, তাজু মিয়া, সংগঠনের সাবেক সভাপতি সালামত উল্লাহ ,আনোয়ারুল আজিম সহ বিভিন্ন সংগঠনের সভাপতি/ সম্পাদক বৃন্দ।

সুধী সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন মুলধারার সংগঠন ASAAL এর প্রেসিডেন্ট এমিরেটাস মাফ মেসবাহ উদ্দিন, বাংলাদেশ সোসাইটি নিউ ইয়র্ক এর প্রেসিডেন্ট আতাউর রহমান সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মাদ আলী , সাবেক সভাপতি এম আজিজ ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন সিদ্দিকী, বাংলাদেশ সোসাইটি নিউ ইয়র্ক এর কার্যকরী সদস্য আলহারুন চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ সোসাইটি নিউ ইয়র্ক এর বোর্ড অব ট্রাস্টিজের এর সদস্য নাঈম টুটুল ও কাজী আজমসহ বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিকস মিডিয়ার সাংবাদিক, জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারের ইমাম মির্জা আবু জাফর বেগমসহ বিভিন্ন মসজিদের ইমাম, মসজিদ কমিটির সদস্য , সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ সহ প্রায় ৫ শতাধিক কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ।

নিউইয়র্ক এ বাংলাদেশীদের বৃহত্তম সামাজিক ও মানবিক সংগঠন গ্রেটার নোয়াখালী সোসাইটি (বাংলাদেশের ফেনী , নোয়াখালী লক্ষ্মীপুর জেলা থেকে আগত ) ব্যবস্হাপনায় ১শ ২৬ একর জমির উপর অবস্থিত কবরস্থানের জন্য ইতিপূর্বে জমি রেজিস্ট্রি ,সরকারি বিভিন্ন প্রশাসনিক দপ্তর থেকে ছাড়পত্র গ্রহণ ,ইন্জিনিয়ারিং প্ল্যান প্রণয়ন, সয়েল টেস্ট এবং পানির স্তর যাচাই- বাছাইয়ের পর ২০২৩ সালে জমির মালিক পক্ষের সাথে চুক্তি সম্পাদিত হয়।

২০২৪ সালের ২৪ এপ্রিল কুইন্সের গুলশান টেরেসে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় সভা করে এ প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর পুরো পাওনা পরিশোধ পূর্বক জমির রেজিস্ট্রি কার্য সম্পাদন করা হয় । তারই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ২৫ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পের কার্যক্রম মিলাদ ও মুনাজাতের মাধ্যমে উদ্বোধন করা হয়েছিল। শুরু হয় এ বিশাল প্রকল্পের রূপরেখা তৈরির কাজ ।

ইতোমধ্যে কবরস্থানে থাকা পূর্বেকার সকল গাছপালা উপড়ে ফেলা হয় ।কবরস্থানে রুপান্তরের পর মুসল্লি ও জেয়ারতকারী দের যানবাহন চলাচলের জন্য নতুন রাস্তা নির্মাণের কাজ শেষ করা হয়েছে । প্রস্তুত করা হয়েছে ২০ হাজার কবরের ।পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে ধাপে- ধাপে লাখে উন্নীত করা হবে ।

গ্রেটার নোয়াখালী সোসাইটির সভাপতি জাহিদ মিন্টর নেতৃত্বে প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল সাব কমিটির সদস্যরা দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন । তাদের জন্য নামাজ শেষে দোয়া করার অনুরোধ জানিয়েছেন । বাংলাদেশী কেউ ইন্তেকাল করলে তাকে এ কবরস্থানে কবর দেয়া যাবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির চেয়ারম্যান জাহিদ মিন্টু ।

তবে কবরস্থানের অবকাঠামোগত অনেক কাজ এখনো বাকি । পুরো প্রকল্প এরিয়ায় সীমানা দেওয়াল নির্মাণ, বৈদ্যুতিক খুঁটি স্থাপন,ফিউনারেল হোম , অফিস, মসজিদ, গোসল ও অজু খানা নির্মাণ সহ সকল কাজ সম্পন্ন করতে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন জাহিদ মিন্টু । তিনি প্রবাসী বিত্তবানদের এ প্রকল্পে সহায়তা করার আহবান জানিয়েছেন । ইতোমধ্যে বিভিন্ন সোসাইটি ও মসজিদের পক্ষ থেকে অনেকে কবরস্থানের জায়গা ক্রয় করেছেন তাদের তিনি ধন্যবাদ জানান । মহান আল্লাহর দরবারে অশেষ শুকরিয়া আদায় করেন।

ইতিপূর্বে নোয়াখালী সোসাইটি কর্তৃক ওয়াশিংটন মেমোরিয়াল সেমিট্রিতে ৪ শ টি কবরের জায়গা ক্রয় করা হয়েছিল সেটি প্রয়োজনের তুলনায় ছিল অপ্রতুল। কোভিড ১৯ মহামারীর সময়ে বহু মানুষকে সমাহিত করায় সেখানে আর কবর দেয়ার জায়গা নেই। শুরু হয় নতুনভাবে কবরস্থান নির্মাণের উদ্যোগ ।নিউইয়র্কের সুন্দর ও নিরিবিলি পরিবেশে কবরস্থান প্রতিষ্ঠার জন্য সাইট সিলেকশন করতে কবরস্থান প্রকল্প কমিটির অক্লান্ত পরিশ্রমে এ জায়গাটি পছন্দ করেন ।

মনোরম,কোলাহল মুক্ত স্থানে বাংলাদেশী যে সকল প্রবাসীরা আমেরিকায় বসবাস করছেন তাদের কেউ ইহকালীন সফর শেষ করে আলমে বরযখ তথা মৃত্যু বরন করলে তাদেরকে এ কবরস্থানে দাফন বা সমাহিত করা হবে । প্রথম ফেইজে ২০ হাজার কবর বিক্রির টার্গেট পূরণ হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে ৪২হাজার কবর বিক্রি করা হবে ।সোমবার থেকে শনিবার প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫ টার মধ্যে লাশ দাফন করা হবে ।প্রতিটি লাশের বিপরীতে জমা দিতে হবে ২৫ শ ডলার । শিশু হলে ১২ শ ডলার । হেড ষ্টোন(নাম পলক) বাবদ দিতে হবে ১২ শ ৫০ ডলার ।যাদের কবরের জায়গা ক্রয় করা নেই তারা ২৫ শ ডলার জমা দিয়ে লাশ দাফন করতে পারবেন।

ইতিমধ্যে দাফন কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য স্কেলেভেটর (বেকু)মেশিন ও অন্যান্য সরঞ্জামাদী ক্রয় ও প্রয়োজনীয় কর্মী নিয়োগ দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কবরস্থান ব্যবস্থাপনা কমিটি । তবে তারা আরো জানিয়েছে এটি কোন বিশেষ জেলার বা আন্চলিক কবরস্থান নয়, সকল বাংলাদেশীদের কবরস্থান হিসেবে বিবেচিত হবে । সেজন্যই এটির নাম দেয়া হয়েছে “বাংলাদেশ সিমেট্রি। ”














