নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশি গণমাধ্যমের দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার ১০ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এবং সিবিএন টিভি ইউএসএ-এর তৃতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গত শুক্রবার (১৯ জুন) নিউইয়র্কের ফরেস্ট হিলসের আগ্রা প্যালেস রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড পার্টি হলে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
সাংবাদিক, লেখক, কবি, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, কমিউনিটি নেতা, ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি পরিণত হয় নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশি গণমাধ্যম পরিবারের এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায়।

বিকেল সাড়ে পাঁচটায় অতিথিদের ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এরপর প্রদর্শিত হয় প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার এক দশকের পথচলা এবং সিবিএন টিভির তিন বছরের কার্যক্রম নিয়ে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র। ভিডিওচিত্রে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশিদের জীবনসংগ্রাম, সাফল্য, সংস্কৃতি এবং কমিউনিটির বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি দুটি প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিকতার অগ্রযাত্রাও তুলে ধরা হয়।

প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার নির্বাহী সম্পাদক মনজুরুল হক স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন। তাঁর বক্তব্যের পর কবিতা আবৃত্তির মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানে এক ভিন্ন আবহের সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ আনুষ্ঠানিক বক্তৃতার পরিবর্তে অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ, সংক্ষিপ্ত উপস্থাপনা এবং আন্তরিক আয়োজন পুরো অনুষ্ঠানকে প্রাণবন্ত করে তোলে।

বক্তারা বলেন, উত্তর আমেরিকায় বাংলাদেশি কমিউনিটির বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্বশীল, নির্ভরযোগ্য ও পেশাদার গণমাধ্যমের গুরুত্বওবহুগুণে বেড়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা গত এক দশক ধরে সংবাদ, বিশ্লেষণ, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং কমিউনিটির ইতিবাচক কর্মকাণ্ড তুলে ধরে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূতদের আস্থার একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। একইভাবে সিবিএন টিভি সংবাদ, টক শো, সাক্ষাৎকার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং কমিউনিটির বিভিন্ন কার্যক্রম সম্প্রচারের মাধ্যমে স্বল্প সময়েই নিজস্ব পরিচিতি তৈরি করেছে।

অনুষ্ঠানে প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার সম্পাদক ইব্রাহীম চৌধুরী এবং তাঁর সহকর্মীদের অভিনন্দন জানিয়ে অতিথিরা বলেন, উত্তর আমেরিকায় বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও সাংবাদিকতার ধারাবাহিক চর্চায় এই দুটি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলাদেশি পরিচয়, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠান দুটির অবদান প্রশংসনীয়।
সম্পাদক ইব্রাহীম চৌধুরী তাঁর বক্তব্যে বলেন, একটি স্বপ্ন, একটি দায়বদ্ধতা এবং একটি কমিউনিটির গল্প নিয়ে প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার যাত্রা শুরু হয়েছিল। গত দশ বছরে পাঠক, লেখক, শুভানুধ্যায়ী, বিজ্ঞাপনদাতা এবং কমিউনিটির মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থনই এই পথচলার সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি বলেন, গণমাধ্যমের কাজ শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়; সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করা, মানুষের মধ্যে সংযোগ গড়ে তোলা এবং কমিউনিটির আস্থা অর্জন করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, সিবিএন টিভির যাত্রাওএকই দর্শনকে সামনে রেখে।উত্তর আমেরিকায় বাংলাদেশিদের জীবন, সাফল্য, সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জকে আরও বিস্তৃত পরিসরে তুলে ধরার লক্ষ্যেই প্রতিষ্ঠানটি কাজ করে যাচ্ছে। ভবিষ্যতেও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা, প্রযুক্তিনির্ভর সংবাদ পরিবেশন এবং কমিউনিটির সেবায় আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

বাংলাদেশ সোসাইটি, নিউ ইয়র্ক এর সাবেক সভাপতি ও নিউইয়র্ক কমিউনিটির প্রবীণ ব্যক্তিত্ব নার্গিস আহমেদ প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার সঙ্গে যুক্ত নারী সাংবাদিক, লেখক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মে একত্রিত করার উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, প্রবাসে নারীদের সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চায় সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা একটি ব্যতিক্রমী ভূমিকা পালন করছে।
প্রবীণ সাংবাদিক ও সাপ্তাহিক পরিচয় সম্পাদক নাজমুল আহসান প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার পেশাদারিত্ব এবং সাংগঠনিক দৃঢ়তার প্রশংসা করে বলেন, প্রবাসের অনেক সংবাদমাধ্যম যা করতে পারেনি, প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা তা করে দেখিয়েছে। তিনি প্রতিষ্ঠানটির প্রতি নিজের ভালোবাসা ও আন্তরিকতার কথাও তুলে ধরেন।

বাংলা পত্রিকা ও টাইম টিভির প্রধান নির্বাহী আবু তাহের বলেন, উত্তর আমেরিকায় কমিউনিটি সাংবাদিকতার বিকাশে প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এবং ভবিষ্যতেও সেই ভুমিকা ধরে রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন।
প্রবীণ সংগঠক নাসির আলী খান পল সম্পাদক ও সহকর্মীদের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের আত্মিক সম্পর্কের কথা স্মরণ করে প্রতিষ্ঠানের উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করেন।
শিল্পপতি গোলাম ফারুক ভূঁইয়া বলেন, মাত্র এক দশকে প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা যে বিশ্বাসযোগ্যতা, গ্রহণযোগ্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি অর্জন করেছে, তা একদিন উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশি কমিউনিটির ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। তিনি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত সাংবাদিক ও কর্মীদের পেশাদারিত্ব ও নিষ্ঠার ভূয়সী প্রশংসা করেন।

অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করেন ডা. ফারুক আজম, সুমন শামসুদ্দিন, কুলসুম আক্তার সুমাইয়া, শামছুন ফৌজিয়া, ফরিদা ইয়াসমীন, জেবুন্নেসা জ্যোৎস্না, মিয়া আসকির, সীমু আফরোজা, সোহানা নাজনীনসহ আরও অনেককবি ও সাহিত্যিক। তাঁদের পরিবেশনায় অনুষ্ঠানে এক সাহিত্যঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন নিউইয়র্ক বাংলাদেশ সোসাইটির সভাপতি আতাউর রহমান সেলিম ও সহসভাপতি মহীউদ্দিন দেওয়ান, কমিউনিটি নেতা তোফায়েল চৌধুরী, নিউইয়র্ক বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের সভাপতি মনোয়ারুল ইসলাম, সাংবাদিক শামীম শাহেদ, রহমান মাহবুব, আদনান সৈয়দ, শেলী জামান খান, রওশন হক, রুদ্র মাসুদ, রোকেয়া দীপা, ভায়লা সালিনা, শরিফুজ্জামান পল,ডাঃ শোয়েব আহমেদ, জয়নাল আবেদীন, রাশিদা কামাল, ওয়াহিদা শামসুন বাঁধন, রুপা খানম, সাঈদা ইয়াসমিন, সেমু আফরোজা, রাশিদা আখতার, ফারমিস আক্তার, গীতিকার মাহফুজুর রহমান, বৃহত্তর নোয়াখালী সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক এএসএম মাঈনউদ্দিন পিন্টু, সংগঠক মোতাহার হোসেন, অ্যাটর্নি মো. ফারহান, আবুল কাশেম, ঢাকা জেলা অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি দুলাল বেহেদু, আছিয়া আক্তার, সালমা ফেরদৌস, মিরসরাই সমিতির সাধারণ সম্পাদক আরিফুল হাসান, লেখক নুরুল খান, সুখেন গোমেজ, বিপুল গনজালেস প্রমুখ।

শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদানকালে বক্তারা স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও জনমুখী প্রবাসী গণমাধ্যম গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং আগামী দিনের পথচলার জন্য শুভকামনা জানান। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা ও সিবিএন টিভিকে শুভেচ্ছা স্মারক প্রদান করা হয়।
শেষ পর্বে জাকির হোসেন, শান্তনু এবং তাঁদেরদলের সুরেলা পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দর্শকদের মুগ্ধ করে। এরপর নৈশভোজ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ আড্ডায় অংশ নেন অতিথিরা। সাংবাদিক, লেখক, শিল্পী, উদ্যোক্তা ও কমিউনিটি নেতাদের উপস্থিতিতে সন্ধ্যাটি হয়ে ওঠে প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজের এক স্মরণীয় মিলনমেলা।

অংশগ্রহণকারীদের মতে, এটি শুধু দুটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন নয়; বরং উত্তর আমেরিকায় বাংলাদেশি সাংবাদিকতা, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং কমিউনিটির সম্মিলিত অগ্রযাত্রার এক দশকের অর্জনকে উদযাপনের একটি তাৎপর্যপূর্ণ উপলক্ষ। অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উচ্চারিত হয়েছে একটি নতুন প্রত্যয়—বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা, প্রযুক্তিনির্ভর গণমাধ্যম, সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বার্থে আরও দায়িত্বশীল ও কার্যকর ভূমিকা রাখার অঙ্গীকার।
নৈশভোজ শেষে স্যানম্যান গ্লোবালের সৌজন্যে একজন ভাগ্যবানের হাতে লটারিতে বিজয়ীকে টিভি উপহার দেয়া হয়। লটারিতে উপহারটি পেয়েছেন চিত্রগ্রাহক নুরুল খান।














