কানাডায় বাংলাদেশি নাগরিকদের রিফিউজি বা রাজনৈতিক আশ্রয় আবেদনের সংখ্যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে। কানাডার ইমিগ্রেশন অ্যান্ড রিফিউজি বোর্ডের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশ বর্তমানে কানাডার রিফিউজি ক্লেইমের অন্যতম বড় উৎস দেশগুলোর একটি।
২০২৪ সালে বাংলাদেশ থেকে ১৮ হাজারের বেশি রিফিউজি ক্লেইম কানাডার রিফিউজি প্রোটেকশন ডিভিশনে পাঠানো হয়। ২০২৫ সালেও বাংলাদেশি আবেদনকারীদের সংখ্যা ছিল ২০ হাজারের ঘরে। ফলে দুই বছরে বাংলাদেশ থেকে আসা রিফিউজি ক্লেইমের সংখ্যা কানাডার শরণার্থী নির্ধারণ ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি করেছে।
কানাডার আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি দেশে প্রবেশের পর নিজেকে নির্যাতন, নিপীড়ন বা গুরুতর ক্ষতির ঝুঁকিতে থাকার দাবি করলে তার আবেদন নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যাচাই করা হয়। আবেদনকারী সত্যিই রিফিউজি সুরক্ষার যোগ্য কি না, সেই সিদ্ধান্ত রিফিউজি প্রোটেকশন ডিভিশন আলাদাভাবে যাচাই করে নেয়।
বাংলাদেশ-সম্পর্কিত এসব আবেদনের একটি অংশ গ্রহণ করা হয়েছে, আবার কিছু আবেদন প্রত্যাখ্যান, প্রত্যাহার বা পরিত্যক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মামলা সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে বাংলাদেশ থেকে আসা আবেদনের সংখ্যা যেমন আলোচনায় এসেছে, তেমনি এসব মামলা নিষ্পত্তিতে কানাডার রিফিউজি ব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে কানাডায় বিশ্বকাপের খেলা দেখতে যাওয়া কিছু বাংলাদেশি নাগরিক রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছেন বলে বিভিন্ন মাধ্যমে আলোচনা হয়েছে। তবে এ ধরনের নির্দিষ্ট ঘটনার সংখ্যা বা পরিমাণ সরকারি সূত্রে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সেটিকে সামগ্রিক প্রবণতার প্রমাণ হিসেবে দেখানো ঠিক হবে না।
কানাডায় ভিজিটর, স্টুডেন্ট বা অন্য কোনো অস্থায়ী ভিসায় যাওয়ার পর কেউ রিফিউজি ক্লেইম করলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না। আবেদনকারীকে তার দাবির পক্ষে প্রয়োজনীয় তথ্য ও প্রমাণ দিতে হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তার দাবি যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেয়।
একইভাবে কানাডার ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ ভিসা আবেদনের সময় আবেদনকারীর ভ্রমণের উদ্দেশ্য, আর্থিক সক্ষমতা, নিজ দেশের পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক এবং নির্ধারিত সময় শেষে কানাডা ছাড়ার সম্ভাবনাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে।
তাই বাংলাদেশি আবেদনকারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আবেদনে সঠিক তথ্য দেওয়া এবং যে উদ্দেশ্যে ভিসা নেওয়া হচ্ছে, সেটি সম্পর্কে সত্যনিষ্ঠ থাকা। ভুয়া তথ্য, জাল কাগজপত্র বা ইমিগ্রেশন ব্যবস্থার অপব্যবহার ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজের আবেদন এবং ভবিষ্যৎ ইমিগ্রেশন সুযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বাংলাদেশ থেকে কানাডায় রিফিউজি ক্লেইমের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে, এটি সরকারি পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট। তবে এই প্রবণতার কারণে পুরো বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীকে ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করা বা বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেখলেই কানাডার ইমিগ্রেশন অফিসার স্বয়ংক্রিয়ভাবে আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন, এমন কোনো সরকারি নীতির প্রমাণ নেই।
মূল বিষয় হলো, কানাডার ইমিগ্রেশন ব্যবস্থায় আবেদনকারীর জাতীয়তার পাশাপাশি তার ব্যক্তিগত পরিস্থিতি, নথিপত্র, ভ্রমণের উদ্দেশ্য এবং আইনি যোগ্যতা বিবেচনা করা হয়। তাই কানাডায় যেতে আগ্রহী বাংলাদেশি নাগরিকদের বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা এবং ইমিগ্রেশন আইনের শর্ত মেনে চলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কানাডায় ২০২৬ ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপের খেলা দেখার উদ্দেশ্যে যাওয়া পঁয়তাল্লিশ জন বাংলাদেশির মধ্যে দশ জনই হঠাৎ রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করে বসেছেন । অর্থাৎ খেলার আনন্দ উদযাপনের নামে ভিসা নিয়ে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় নেওয়ার এই হিড়াহার প্রায় বাইশ শতাংশ ।
বিদেশে যাওয়ার যে কোনো বৈধ সুযোগকে স্থায়ী হওয়ার চাবি হিসেবে ব্যবহার করার এই প্রবণতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় । কাজের ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা কিংবা ভিজিটার ভিসা, উদ্দেশ্য যাই হোক না কেন এয়ারপোর্টে নেমেই ভিত্তিহীন দোহাই দিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় নেওয়া এখন এক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।- সংবাদসুত্র ওয়েব পোর্টাল আমেরিকা বাংলা














