যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনবিষয়ক কঠোর নীতির বিরুদ্ধে বড় ধরনের আইনি ধাক্কা খেল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। দেশটির একটি ফেডারেল আপিল আদালত রায় দিয়েছে, কোনো অভিবাসীকে ৯০ দিনের বেশি আটক রাখতে চাইলে সরকারকে অবশ্যই আদালতে তার যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে হবে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ের পর কোনো ব্যক্তিকে অনির্দিষ্টকাল জামিনের সুযোগ ছাড়া আটকে রাখা যাবে না। এই রায়ে টেক্সাস, লুইজিয়ানা ও মিসিসিপিসহ পঞ্চম সার্কিট আপিল আদালতের আওতাভুক্ত অঙ্গরাজ্যগুলোতে আটক থাকা হাজারো অভিবাসীর ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
গত বৃহস্পতিবার ২ জুলাই লুইজিয়ানা স্টেটের নিউ অরলিন্সভিত্তিক পঞ্চম সার্কিট আপিল আদালত ২-১ ভোটে এই সিদ্ধান্ত দেন। আদালতের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামত লিখেছেন বিচারক লেসলি এইচ. সাউথউইক। তিনি বলেন, কাউকে আটক করার ৯০ দিনের মধ্যে অবশ্যই একটি জামিন শুনানি অনুষ্ঠিত হতে হবে। সেই শুনানিতে সরকারকে আদালতের সামনে পৃথকভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে কেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আরও আটক রাখা প্রয়োজন। শুধু সাধারণ যুক্তি দেখিয়ে কাউকে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য আটক রাখা যাবে না।
রায়ে আদালত বলেছে, সরকার যদি কাউকে জামিন ছাড়া আরও আটক রাখতে চায়, তাহলে প্রমাণ করতে হবে যে তিনি সমাজের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে অথবা আইনের দৃষ্টিতে তাকে আটক রাখার অন্য কোনো গ্রহণযোগ্য কারণ আছে।
তবে আদালত একই সঙ্গে স্পষ্ট করেছেন, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্ত অতিক্রম করে প্রবেশ করা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ফেডারেল আইন অনুযায়ী বহিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত আটক রাখার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করে আসা এবং পরে গ্রেপ্তার হওয়া অনথিভুক্ত অভিবাসীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। আদালতের মতে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে নিশ্চিত করা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী। তাই তাদের কোনো শুনানির সুযোগ না দিয়ে দীর্ঘদিন আটক রাখা সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিচারক সাউথউইক ২০০১ সালের যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের উল্লেখ করে বলেন, সাংবিধানিক সুরক্ষা শুধু নাগরিকদের জন্য নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সীমানার ভেতরে থাকা প্রত্যেক মানুষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তিনি রায়ে লেখেন, সংবিধানের অন্যতম শক্তি হলো, এটি দেশের ভেতরে থাকা মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কোনো ব্যতিক্রম করে না। ব্যক্তিগত স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হলে সেই ব্যক্তির কথা শোনার অধিকারও সংবিধান নিশ্চিত করেছে।
একই মামলায় বিচারক জেমস ই. গ্রেভস জুনিয়র সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের সঙ্গে একমত হলেও মন্তব্য করেন, ৯০ দিন অপেক্ষাও অনেক দীর্ঘ সময়। তার ভাষায়, বর্তমানে আটক অভিবাসীদের অনেকেই এমন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছেন, যা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
অন্যদিকে ট্রাম্প মনোনীত বিচারক কোরি উইলসন এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। তার মতে, বর্তমান অভিবাসন আইন অনুযায়ী অনথিভুক্ত অভিবাসীদের আটকাদেশ চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।
এই মামলার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তিন ব্যক্তি, ইগনাসিও সোসনাভা রদ্রিগেজ, মিগুয়েল অ্যাঞ্জেল গোমেজ আলভারাদো এবং আলেহান্দ্রো ভিয়েগাস অ্যাঞ্জেল। ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে টেক্সাসে নিয়মিত ট্রাফিক তল্লাশির সময় অঙ্গরাজ্যের পুলিশ তাদের আটক করে। তিনজনই অন্তত ১৪ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছিলেন। তাদের নিয়মিত চাকরি ছিল এবং তারা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক সন্তানদের লালন-পালন করছিলেন।
পরে তাদের যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা আইসের (ICE) কাছে হস্তান্তর করা হয়। সংস্থাটি তাদের কোনো বিচারকের সামনে হাজির না করেই আটক রাখে। পরে ফেডারেল আদালতের বিচারকরা রায় দেন, জামিন শুনানির সুযোগ না দিয়ে তাদের আটক রাখা সংবিধানে নিশ্চিত করা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার অধিকার লঙ্ঘন করেছে। এরপর ট্রাম্প প্রশাসন সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি ছিল, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে চালু করা তাদের নতুন নীতির আওতায় অনথিভুক্ত অভিবাসীদের বহিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত আটক রাখার বিধান রয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে জামিন শুনানির প্রয়োজন নেই। এই নীতির বিরুদ্ধে দেশজুড়ে ব্যাপক আইনি লড়াই শুরু হয়। অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম প্রোপাবলিকার তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম ১৩ মাসে আটকাদেশ চ্যালেঞ্জ করে প্রায় ৪৭ হাজার হেবিয়াস করপাস আবেদন দায়ের করা হয়েছে। এই সংখ্যা আগের তিনটি প্রশাসনের মোট আবেদনের চেয়েও বেশি। এসব মামলার প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগই টেক্সাসের ফেডারেল আদালতে দায়ের হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একই ধরনের মামলায় যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ফেডারেল আপিল আদালতে ভিন্ন ভিন্ন রায় হওয়ায় বিষয়টি এখন আরও জটিল হয়ে উঠেছে। সর্বশেষ এই রায়ের আগে তিনটি আপিল আদালত ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল, দুটি আদালত প্রশাসনের পক্ষে রায় দিয়েছিল এবং আরেকটি আদালতে বিষয়টি এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিভিন্ন আদালতের পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্তের কারণে শেষ পর্যন্ত এই গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্নের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টেই হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। সুত্র রয়টার্স














