২রা নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

শেষের পাতা

দীর্ঘদিন সুস্থ থাকতে ২০–৩০ বছর বয়সেই কোন ৫ অভ্যাস জরুরি, যা বলছে গবেষণা

দীর্ঘদিন সুস্থ থাকতে ২০–৩০ বছর বয়সেই কোন ৫ অভ্যাস জরুরি, যা বলছে গবেষণা

ক্যারিয়ার গড়া, পরিবার শুরু করা, সামাজিক যোগাযোগ বাড়ানো কিংবা নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন—২০ ও ৩০ এর কোঠায় সাধারণত এসব নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকেন তরুণরা। এ বয়সে শরীর তুলনামূলক ভালো থাকায় ভবিষ্যতে সুস্থ থাকা বা দীর্ঘায়ুর প্রস্তুতি নেওয়ার কথা অনেকেরই মনে আসে না। অনেকেই ধরে নেন, স্বাস্থ্য নিয়ে বাড়তি চিন্তার প্রয়োজন নেই।

তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জীবনের এই দুই দশকই ভবিষ্যতের সুস্বাস্থ্যের ভিত্তি তৈরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ বয়সে শরীরের পেশি ও হাড়ের শক্তি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম, ঘুম ও মানসিক চাপ সামলানোর যেসব অভ্যাস এ সময় গড়ে ওঠে, সেগুলো মধ্য ও পরবর্তী বয়সের স্বাস্থ্যে বড় প্রভাব ফেলে।

স্ট্যানফোর্ড লাইফস্টাইল মেডিসিনের পরিচালক এবং ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশনের অধ্যাপক ড. মাইকেল ফ্রেডরিকসন বলেন, ‘আপনি যত দ্রুত স্বাস্থ্যকর অভ্যাস শুরু করবেন, দীর্ঘমেয়াদে আপনার স্বাস্থ্য তত ভালো থাকবে। পরে শরীরের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বাড়তি পরিশ্রমও করতে হবে না।’

তার মতে, সুস্থ থাকার জন্য একসঙ্গে জীবনযাত্রার সবকিছু বদলে ফেলার প্রয়োজন নেই। বরং প্রতিদিনের অভ্যাসে ছোট ছোট পরিবর্তন আনা এবং সেগুলো ধরে রাখাই মূল বিষয়। স্ট্যানফোর্ড মেডিসিনের এক প্রতিবেদনে চিকিৎসক ও গবেষকেরা ২০ ও ৩০ বছর বয়সীদের জন্য পাঁচটি অভ্যাসের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

নিয়মিত ব্যায়াম

২০ ও ৩০-এর কোঠায় মানুষের হাড়ের ঘনত্ব ও পেশির শক্তি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। পরবর্তী জীবনে শারীরিক সক্ষমতা ধরে রাখতে এই সময়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাই অল্প বয়স থেকেই পেশি ও হাড়ের শক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম করার পরামর্শ দিয়েছেন স্ট্যানফোর্ডের চিকিৎসকেরা।

এ ক্ষেত্রে কার্যকর পদ্ধতি হলো রেজিস্ট্যান্স বা স্ট্রেন্থ ট্রেইনিং। শরীরের পেশিকে কোনো বাহ্যিক প্রতিরোধের বিরুদ্ধে কাজ করতে হয়, এমন ব্যায়ামই এর অন্তর্ভুক্ত। ডাম্বেল তোলা, রেজিস্ট্যান্স ব্যান্ড ও ওয়েট মেশিন ব্যবহার কিংবা নিজের শরীরের ওজন দিয়েও এই ব্যায়াম করা যায়। স্কোয়াট, পুশআপ, ডাম্বেল কার্ল, লাঞ্জ ও প্ল্যাঙ্ক এর পরিচিত উদাহরণ।

নিয়মিত এসব ব্যায়াম পেশির শক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি হাড়ের ঘনত্ব ধরে রাখতে সাহায্য করে। বয়স বাড়ার সঙ্গে পেশি ক্ষয়ের যে প্রবণতা তৈরি হয়, তা মোকাবিলাতেও ভূমিকা রাখে। এছাড়া শরীরের বিপাকীয় কার্যক্রম সচল রাখতেও পেশির ভূমিকা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় শারীরিক কর্মকাণ্ড নির্দেশিকায় সপ্তাহে অন্তত দুই দিন শক্তিবর্ধক ব্যায়াম করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে শুধু ব্যায়াম করলেই হবে না, কতটা পরিশ্রম হচ্ছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

ফ্রেডরিকসন বলেন, পেশির শক্তি বাড়াতে ব্যায়ামের সময় পেশিকে ক্লান্তির কাছাকাছি পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। অর্থাৎ এমন পর্যায়ে ব্যায়াম করতে হবে, যখন মনে হবে আর মাত্র এক বা দুটি পুনরাবৃত্তি করা সম্ভব। এ পর্যায়ে না পৌঁছালে নতুন শক্তি বাড়ানোর বদলে বিদ্যমান শক্তি ধরে রাখার মধ্যেই ব্যায়ামের উপকার সীমিত থাকতে পারে।

তবে এর জন্য ভারী ওজন তুলতে হবে, এমন নয়। তুলনামূলক কম ওজন নিয়ে বেশি বার ব্যায়াম করেও উপকার পাওয়া সম্ভব। মূল বিষয় হলো, ব্যায়ামের সময় পেশির ওপর যথেষ্ট চাপ তৈরি করা।

নারীদের জন্যও এ ধরনের ব্যায়াম বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অনেকের ধারণা, বেশি ওজনের ডাম্বেল নিয়ে ব্যায়াম করলে শরীর অতিরিক্ত ভারী বা পেশিবহুল হয়ে যাবে। স্ট্যানফোর্ডের চিকিৎসকদের মতে, ধারণাটি ঠিক নয়। বরং নিয়মিত শক্তিবর্ধক ব্যায়াম হাড়ের ঘনত্ব বাড়ায় এবং পরবর্তী বয়সে অস্টিওপোরোসিস ও হাড় ভাঙার ঝুঁকি কমায়।

কার্ডিও ও নিয়মিত হাঁটা

শারীরিক সক্ষমতা ধরে রাখা এবং বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি কমাতে নিয়মিত অ্যারোবিক বা কার্ডিও ব্যায়ামের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন স্ট্যানফোর্ডের চিকিৎসকেরা। হাঁটা, দৌড়ানো, সাইকেল চালানো ও সাঁতার হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।

স্ট্যানফোর্ড প্রিভেনশন রিসার্চ সেন্টারের শিক্ষক এবং এপিডেমিওলজি ও পপুলেশন হেলথের অধ্যাপক ড. অ্যাবি কিং বলেন, ‘বেশি চলাফেরা করুন, কম বসুন এবং ভালো খাবার খান।’

তিনি বলেন, এসব মৌলিক অভ্যাস মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা, হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য ও বিপাকীয় প্রক্রিয়া ভালো রাখে। ক্যানসার প্রতিরোধ ও মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতেও এগুলোর ভূমিকা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের নির্দেশিকা অনুযায়ী, সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার অ্যারোবিক ব্যায়াম অথবা ৭৫ মিনিট তীব্র মাত্রার ব্যায়াম করা উচিত। দুই ধরনের ব্যায়াম মিলিয়েও এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা যায়।

তবে সুস্থ থাকতে প্রতিদিন দৌড়ানো কিংবা ম্যারাথনের প্রস্তুতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই। নিয়মিত হাঁটাও হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য কার্যকর। কিংয়ের মতে, প্রতিদিন অন্তত ৭ হাজার পা হাঁটার লক্ষ্য রাখা যেতে পারে। প্রচলিত ১০ হাজার পা হাঁটার লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে না পারলেও ৭ হাজার পা হাঁটলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের জন্য উল্লেখযোগ্য উপকার পাওয়া যায়।

হাঁটার উপকার আরও বাড়াতে স্বাভাবিক গতির সঙ্গে দ্রুত হাঁটার অভ্যাস যোগ করা যেতে পারে। এটাকে বলা হয় ‘ইন্টারভ্যাল ওয়াকিং’। এ পদ্ধতিতে কিছুক্ষণ স্বাভাবিক গতিতে হাঁটার পর কয়েক মিনিট দ্রুত হাঁটতে হয়। এরপর আবার স্বাভাবিক গতিতে ফিরতে হয়। তবে শুধু নির্দিষ্ট সময়ে ব্যায়াম করাই যথেষ্ট নয়, দিনের বাকি সময় কতক্ষণ বসে থাকা হচ্ছে সেটিও দেখতে হবে।

চিকিৎসকদের মতে, নিয়মিত ব্যায়াম করলেও দিনে আট ঘণ্টার বেশি বসে থাকলে এর অনেক উপকার কমে যেতে পারে। দীর্ঘ সময় বসে থাকলে পেশির সক্রিয়তা কমে, রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং শরীরের শক্তি ব্যয়ের পরিমাণ কমে যায়।

এ সমস্যা এড়াতে প্রতি ৩০ মিনিট পরপর বসা থেকে উঠে তিন থেকে পাঁচ মিনিট হাঁটাহাঁটি করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এ সময় কয়েকটি স্কোয়াট করা, জায়গায় দাঁড়িয়ে হালকা দৌড়ানো কিংবা সিঁড়ি দিয়ে ওঠা-নামা করা যেতে পারে।

কার্ডিও ব্যায়ামের উপকারিতা নিয়ে ২০২৪ সালের একটি বড় গবেষণার তথ্যও তুলে ধরেছে স্ট্যানফোর্ড।

২ কোটির বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে ওই গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যারোবিক ফিটনেস সামান্য বাড়লেও যেকোনো কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি ১১ থেকে ১৭ শতাংশ কমতে পারে। একইসঙ্গে হৃদযন্ত্র বিকল হওয়ার ঝুঁকি কমতে পারে সর্বোচ্চ ১৮ শতাংশ।

এছাড়া ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী মার্কিন তরুণদের নিয়ে করা আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা শারীরিকভাবে কম সক্রিয়, তাদের অল্প বয়সে হৃদযন্ত্র বিকল হওয়া বা স্ট্রোকের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।

সুষম খাবার

২০ ও ৩০ বছর বয়সে কাজ ও সামাজিক ব্যস্ততার কারণে অনেকেই খাবারের বিষয়ে মনোযোগ দিতে পারেন না। অফিসের ফাঁকে ফাস্টফুড খাওয়া, রাতে বাইরে থেকে খাবার আনা কিংবা প্রক্রিয়াজাত খাবারের ওপর নির্ভর করা অনেকের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়। এ বয়সে শারীরিকভাবে বড় কোনো সমস্যা দেখা না দিলেও দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস ভবিষ্যতে বিপাকীয় ও হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘কার্ডিয়া’ (করোনারি আর্টারি রিস্ক ডেভেলপমেন্ট ইন ইয়াং অ্যাডাল্টস) গবেষণায় ৫ হাজারের বেশি তরুণকে দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। ৩৫ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সে যারা ফাস্টফুড কম খেয়েছেন এবং উদ্ভিদভিত্তিক খাবার বেশি খেয়েছেন, মধ্য বয়সে তাদের হৃদরোগ ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকি কম ছিল।

ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এমন একটি অবস্থা, যেখানে শরীরের কোষ ইনসুলিনের প্রতি যথাযথ সাড়া দেয় না। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং পরবর্তী সময়ে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে।

স্ট্যানফোর্ডের চিকিৎসকেরা স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে ভূমধ্যসাগরীয় খাদ্যাভ্যাস বা মেডিটেরানিয়ান ডায়েট অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন। এতে শাকসবজি, ফলমূল, গোটা শস্য, স্বাস্থ্যকর চর্বি ও কম চর্বিযুক্ত প্রোটিনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনও এ ধরনের খাদ্যাভ্যাস সমর্থন করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের খাবার শরীরের দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। দীর্ঘদিন শরীরে প্রদাহ থাকলে হৃদরোগ এবং আলঝেইমার্সের মতো স্নায়বিক রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনতে জটিল কোনো নিয়ম মানার প্রয়োজন নেই। প্রতিদিনের খাবারে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রথমত, পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ করতে হবে। স্ট্যানফোর্ডের পরামর্শ অনুযায়ী, শরীরের প্রতি কেজি ওজনের জন্য দৈনিক প্রায় শূন্য দশমিক ৮ থেকে ১ গ্রাম প্রোটিন প্রয়োজন। যেমন, ৬৮ কেজি ওজনের একজন ব্যক্তির জন্য দৈনিক ৫৫ থেকে ৭০ গ্রাম প্রোটিনের লক্ষ্য রাখা যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, খাবারের প্লেটের অন্তত অর্ধেক অংশে রঙিন শাকসবজি ও ফলমূল রাখতে হবে। পরিশোধিত শর্করা বা রিফাইনড কার্বোহাইড্রেটের পরিবর্তে গোটা শস্য বেছে নিতে হবে। একইসঙ্গে অতিরিক্ত চিনি ও সোডিয়ামযুক্ত অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খেতে হবে।

তৃতীয়ত, পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। বিশেষ করে যারা নিয়মিত ব্যায়াম করেন বা শারীরিকভাবে বেশি সক্রিয়, তাদের পানির চাহিদার দিকে বাড়তি নজর দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি অ্যালকোহল গ্রহণের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।

পর্যাপ্ত ঘুম

কাজের চাপ, পড়াশোনা কিংবা সামাজিক ব্যস্ততায় ২০ ও ৩০ বছর বয়সীদের অনেকেই ঘুমের সময় কমিয়ে দেন। সপ্তাহের কর্মদিবসে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা ঘুমিয়ে ছুটির দিনে বেশি ঘুমিয়ে ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করেন অনেকে।

কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, ছুটির দিনের বাড়তি ঘুম দিয়ে নিয়মিত ঘুমের ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব নয়। স্ট্যানফোর্ডের ডিভিশন অব স্লিপ মেডিসিনের পরিচালক ও মনোরোগবিদ্যার অধ্যাপক ড. ক্লিট কুশিদা বলেন, রাতে ঘুমের আদর্শ সময় সাধারণত সাত ঘণ্টার বেশি।

২০১৫ সালে আমেরিকান একাডেমি অব স্লিপ মেডিসিন এবং স্লিপ রিসার্চ সোসাইটির যৌথ সম্মতিপত্রেও প্রাপ্তবয়স্কদের নিয়মিত অন্তত সাত ঘণ্টা ঘুমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। শত শত গবেষণা পর্যালোচনার ভিত্তিতে এই নির্দেশনা তৈরি করা হয়েছিল, যার সঙ্গে কুশিদাও যুক্ত ছিলেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত রাতে সাত ঘণ্টার কম ঘুমান, মধ্য বয়সে তাদের স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি বেশি থাকে। ঘুমের ঘাটতি মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতার ওপরও প্রভাব ফেলে। দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মনোযোগ, স্মৃতি ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তাই শুধু কত ঘণ্টা ঘুমানো হচ্ছে সেটি নয়, ঘুমের নিয়ম ও মানের দিকেও নজর দিতে হবে। কুশিদার পরামর্শ হলো, প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস গড়ে তোলা। ছুটির দিনেও ঘুম থেকে ওঠার সময় খুব বেশি পরিবর্তন না করাই ভালো। সকালে সূর্যের আলোয় কিছুক্ষণ থাকা এবং রাতে ঘুমানোর আগে শরীর ও মনকে বিশ্রামের জন্য প্রস্তুত করাও জরুরি।

ঘুমানোর আগে মোবাইল বা কম্পিউটারের পর্দা ব্যবহার, অ্যালকোহল গ্রহণ এবং ভারী শারীরিক ব্যায়াম এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। এসব অভ্যাস ঘুমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটায়।

আবার কেউ যদি নিয়মিত সাত থেকে আট ঘণ্টা বিছানায় থাকার পরও দিনের বেলায় ক্লান্ত বোধ করেন বা ঘুম ঘুম ভাব থাকে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। কুশিদার মতে, পর্যাপ্ত সময় ঘুমানোর পরও দিনে ঘুম পেলে বুঝতে হবে ঘুম বারবার ভেঙে যাচ্ছে অথবা গভীর ঘুম ও র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট (আরইএম) ঘুম পর্যাপ্ত হচ্ছে না।

অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া, রেস্টলেস লেগ সিনড্রোম ও ইনসমনিয়ার মতো সমস্যাও ঘুমের মান নষ্ট করতে পারে। তাই দীর্ঘদিন ঘুমের সমস্যা চলতে থাকলে তা অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের অভ্যাস

ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা, কর্মক্ষেত্রের চাপ, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং আর্থিক দায়িত্ব—২০ ও ৩০ বছর বয়সে এসব কারণে মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। অনেকেই মনে করেন, জীবনের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে চাপও কমে যাবে। কিন্তু দীর্ঘদিন মানসিক চাপের মধ্যে থাকলে তা শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলে।

মানসিক চাপ তৈরি হলে শরীর একধরনের সতর্ক অবস্থায় চলে যায়। এ সময় হৃৎস্পন্দন ও রক্তচাপ বেড়ে যায় এবং কর্টিসলের মতো স্ট্রেস হরমোন নিঃসৃত হয়। স্বল্প সময়ের জন্য এ প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক হলেও দীর্ঘদিন একই অবস্থা চলতে থাকলে তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

স্ট্যানফোর্ড সেন্টার অন স্ট্রেস অ্যান্ড হেলথের পরিচালক ও মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ড. ডেভিড স্পিগেল বলেন, ‘আপনাকে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, তা না হলে মানসিক চাপই আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করবে।’

তার মতে, মানসিক চাপ কমানোর ক্ষেত্রে শুধু যে সমস্যাটি থেকে চাপ তৈরি হচ্ছে, সেটি সমাধানের চেষ্টা করলেই হবে না। শুরুতে শরীরকে শান্ত করার কৌশলও শিখতে হবে। শরীর শান্ত থাকলে কোন বিষয়টি মানসিক চাপ তৈরি করছে এবং কীভাবে তা মোকাবিলা করা যায়, সে বিষয়ে ভালোভাবে চিন্তা করা সম্ভব।

স্পিগেলের গবেষণায় মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের এমন কিছু পদ্ধতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যেগুলো শরীরকে শিথিল করতে সাহায্য করে। এর মধ্যে রয়েছে—মেডিটেশন, গভীর শ্বাস নেওয়ার ব্যায়াম এবং সেলফ-হিপনোসিস বা স্ব-সম্মোহন। তার গবেষণায় দেখা গেছে, সেলফ-হিপনোসিস কৌশল শেখার পর অংশগ্রহণকারীদের শারীরিক ব্যথা ও মানসিক চাপ দীর্ঘ মেয়াদে কমেছে।

মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে শারীরিক স্বাস্থ্যেরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাবার এবং পর্যাপ্ত ঘুম মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করে। একইভাবে মাদক ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলাও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপের পাশাপাশি অসহায়ত্ব, হতাশা কিংবা নিজের প্রতি মূল্যহীনতার অনুভূতি তৈরি হলে শুধু জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। এ ধরনের সমস্যা দেখা দিলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন স্পিগেল।

স্ট্যানফোর্ডের চিকিৎসকদের মূল বার্তা হলো, দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকার প্রস্তুতি শুরু করতে নির্দিষ্ট কোনো বয়স পর্যন্ত অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। ২০ ও ৩০ বছর বয়সে গড়ে তোলা প্রতিদিনের এই ছোট অভ্যাসগুলোই পরবর্তী বয়সে শারীরিক সক্ষমতা ধরে রাখা এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি কমানোর ভিত্তি তৈরি করে।