২রা নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

অর্থনীতি

ইরান যুদ্ধের ছয় মাসে আমেরিকার তেল কোম্পানিগুলোর মুনাফা ১৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি

ইরান যুদ্ধের ছয় মাসে আমেরিকার তেল কোম্পানিগুলোর মুনাফা ১৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় আমেরিকার তেল কোম্পানিগুলো বিপুল মুনাফা অর্জন করেছে। গত এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে দেশটির ৫০টিরও বেশি বড় তেল ও গ্যাস কোম্পানি ১৩০ বিলিয়ন ডলার বা ১৩ হাজার কোটি ডলারের বেশি মুনাফা করেছে। এদিকে, পেট্রল ও ডিজেলের বাড়তি দামের কারণে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ১৪ হাজার ৭০০ কোটি ডলার।

যুক্তরাষ্ট্রের এসব কোম্পানির ব্যবসায়িক ফলাফলের ভিত্তিতে এ হিসাব করা হয়েছে। কোম্পানিগুলোর অধিকাংশই তেল ও গ্যাস উত্তোলন অথবা পরিশোধনের সঙ্গে যুক্ত। এটি একটি রক্ষণশীল হিসাব; এতে যুদ্ধের প্রথম মাস মার্চ এবং অক্টোবরের মুনাফা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

২০২৫ সালের একই সময়ে এসব কোম্পানি সম্মিলিতভাবে ৪৭০০ কোটি ডলারেরও কম মুনাফা করেছিল। ওই সময় তেলের দাম কম ছিল এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের প্রাথমিক প্রভাব সামাল দিতে কোম্পানিগুলোকে বেগ পেতে হচ্ছিল।

এ বছর তেল কোম্পানিগুলোর বিপুল মুনাফা আবারও দীর্ঘদিনের একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে কারা লাভবান হয়, আর এর মূল্যই বা কাদের দিতে হয়।

ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ক্লাইমেট সলিউশনস ল্যাবের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকে চলতি সপ্তাহ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা পেট্রল ও ডিজেলের পেছনে অতিরিক্ত ১৪ হাজার ৭০০ কোটি ডলার ব্যয় করেছেন। অর্থাৎ, প্রতিটি পরিবারকে গড়ে ১ হাজার ১০০ ডলারের বেশি অতিরিক্ত খরচ করতে হয়েছে।

তবে সব কোম্পানি সমানভাবে লাভবান হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের তেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষভাবে লাভ করেছে। কারণ, মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়ায় সংঘাতের কারণে জ্বালানি উৎপাদনকারী কারখানাগুলো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে বিশ্ববাজারের চাহিদা মেটানোর জন্য পরিশোধনাগারের সংখ্যা কমে যাওয়ায় সচল প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফার হার বেড়েছে।

যুদ্ধকালীন এই ব্যবসায়িক উত্থানের সুফল পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের তেল উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও। সংঘাতপূর্ণ এলাকায় কাজ করার ঝুঁকি বা ব্যয় ছাড়াই তেলের বাড়তি দামের কারণে তাদের অধিকাংশের আয় বেড়েছে।

তবে তাদের মুনাফা সাধারণত ২০২২ সালের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ওই বছর ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বেড়ে গিয়েছিল। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ব্যারেল তেলের গড় দাম ছিল প্রায় ৯০ ডলার। ২০২২ সালের একই সময়ে তা ছিল প্রায় ১০০ ডলার।

যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দুই তেল কোম্পানি এক্সনমোবিল ও শেভরন জানিয়েছে, এ বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই – সেপ্টেম্বর) কয়েক বছরের মধ্যে তাদের সর্বোচ্চ আয় হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তাদের পরিশোধন ব্যবসা এ আয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।

তৃতীয় প্রান্তিকে এক্সনের মুনাফা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। শেভরনের মুনাফা বেড়েছে প্রায় তিন গুণ। এক সাক্ষাৎকারে এক্সনের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা নেইল হ্যানসেন বলেন, ‘জ্বালানির বেশি দাম সাধারণ মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে, তা আমরা অবশ্যই স্বীকার করি। তবে এ ধরনের পরিস্থিতি রাতারাতি বিনিয়োগ বাড়িয়ে সামাল দেওয়া যায় না।’

শেভরনের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা এইমার বনার বলেন, ‘বাড়তি আয়ের অর্থ কোম্পানির ব্যালান্স শিটে জমা হচ্ছে। কঠিন সময়ে এই সম্পদের ওপর আমরা নির্ভর করি। আবার দাম বাড়লে এই সম্পদের পরিমাণ আরও বাড়াই।’

যুক্তরাষ্ট্রের আরও কয়েক ডজন তেল কোম্পানি আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফল প্রকাশ করবে। নিউইয়র্ক টাইমসের এই বিশ্লেষণে কোম্পানিগুলোর প্রকাশিত আর্থিক ফলাফল ব্যবহার করা হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠানের ফলাফল এখনও প্রকাশিত হয়নি, সেগুলোর ক্ষেত্রে আর্থিক তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ফ্যাক্টসেটের সংকলিত বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস নেওয়া হয়েছে।

এই পর্যালোচনায় পাইপলাইন পরিচালনাকারী কোম্পানি ও তেলশিল্পের সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। কারণ, বিশ্ববাজারে তেলের দামের আকস্মিক উত্থান-পতনে এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা সরাসরি তুলনামূলকভাবে কম প্রভাবিত হয়েছে।

আপাতত অনেক কোম্পানি একই ধরনের কৌশল অনুসরণ করছে। তারা নতুন করে তেল উৎপাদন বা পরিশোধনাগারের সক্ষমতা বাড়ানোর পেছনে অর্থ ব্যয় না করে ঋণ পরিশোধ করছে এবং বাড়তি অর্থ জমা রাখছে। অর্থাৎ, আগে যতটুকু তেল উৎপাদনের পরিকল্পনা ছিল, তার চেয়ে বেশি উৎপাদন করা কিংবা পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ানোর পথে যাচ্ছে না তারা।

গত সপ্তাহে ওয়াল স্ট্রিটের বিশ্লেষকদের সঙ্গে আলাপকালে পরিশোধন খাতের বড় প্রতিষ্ঠান ভ্যালেরো এনার্জির প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা হোমার ভুলার বলেন, ‘কোম্পানির হাতে অনেক নগদ অর্থ আছে বলেই আমরা বিনিয়োগের কৌশল বদলে ফেলব না।’

তৃতীয় প্রান্তিকে ভ্যালেরোর মুনাফা আগের তুলনায় ছয় গুণেরও বেশি বেড়েছে। হোমার ভুলার বলেন, ‘সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জমা করা বাড়তি অর্থের পুরোটাই শেষ পর্যন্ত কোম্পানির মালিকদের কাছে যাবে।’

এ বিষয়ে বিস্তারিত না জানালেও সাধারণত লভ্যাংশ বাড়ানো বা কোম্পানির নিজস্ব শেয়ার কিনে নেওয়ার মাধ্যমে এ অর্থ মালিকদের কাছে পৌঁছানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের তেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষত ভালো ব্যবসা করেছে। কারণ, তাদের পরিশোধন করা তেলের বড় অংশ পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। ফলে আকাশচুম্বী জাহাজভাড়া বা পরিবহন ব্যয়ের চাপ থেকে তারা অনেকটাই রেহাই পায়।

তেল উৎপাদনকারী ও ভোক্তাদের মধ্যে এসব কোম্পানি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ হিসেবে কাজ করে। মাটির নিচ থেকে উত্তোলন করা অপরিশোধিত তেলকে তারা পেট্রল ও ডিজেলের মতো ব্যবহারযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর করে। এক্সন ও শেভরনের মতো কিছু কোম্পানি তেল উত্তোলন ও পরিশোধন—দুই কাজই করে। তবে অনেক কোম্পানি এ দুটির মধ্যে যেকোনো একটি কাজ করে।

ইউরোপের বড় তেল কোম্পানিগুলোও বিপুল মুনাফা করেছে। তেল পরিশোধন ব্যবসা অত্যন্ত লাভজনক হওয়ায় শেল তৃতীয় প্রান্তিকে ১ হাজার ২০৬ কোটি ডলার মুনাফা করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। ফ্রান্সের বড় তেল কোম্পানি টোটালএনার্জিসের তৃতীয় প্রান্তিকের মুনাফাও দ্বিগুণের বেশি বেড়ে ৮২৬ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।

পেনসিলভানিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত ব্যক্তিমালিকানাধীন জ্বালানি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড রিফাইনিং এ বছরের অতিরিক্ত আয় দিয়ে ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনা করছে বলে জানিয়েছেন কোম্পানিটির প্রধান নির্বাহী ও দীর্ঘদিন ধরে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত জন ক্যাটসিমাটিডিস। – দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস