নজরুল ইসলাম মিন্টো: কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কে টানাপোড়েন চললেও সীমান্তের এক ঐতিহাসিক জনপদে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন দৃশ্য। আমেরিকানরা দল বেঁধে কানাডায় আসছেন, রেস্তোরাঁয় খাচ্ছেন, কেনাকাটা করছেন, স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে গল্প করছেন। কেউ কেউ আবার নিজেদের দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য কানাডীয়দের কাছে ক্ষমাও চাইছেন। তাঁদের এই আগমনে দীর্ঘদিন অবহেলায় পিছিয়ে পড়া স্যান্ডউইচ টাউনে ফিরেছে ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন প্রাণচাঞ্চল্য।
ঘটনাস্থল অন্টারিওর উইন্ডসর শহরের স্যান্ডউইচ টাউন। ডেট্রয়েট নদীর ওপারে যুক্তরাষ্ট্রের ডেট্রয়েট। দুই দেশের মাঝখানে গর্ডি হাও আন্তর্জাতিক সেতু চালু হওয়ার পর থেকেই বদলে যেতে শুরু করেছে এ এলাকার চিত্র। ২০২৬ সালের ২৭ জুলাই যানবাহনের জন্য এবং ৫ আগস্ট পথচারী ও সাইকেল আরোহীদের জন্য সেতুটি খুলে দেওয়ার পর সপ্তাহান্তে আমেরিকান দর্শনার্থীদের ভিড় এত বেড়েছে যে, স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অতিরিক্ত কর্মী নিতে হচ্ছে।
কয়েক বছর আগেও স্যান্ডউইচ টাউনের চিত্র ছিল একেবারেই ভিন্ন। রাস্তার দুই পাশে পরিত্যক্ত বাড়ি, বন্ধ দোকান আর ভাঙাচোরা ভবন দেখে এলাকার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন স্থানীয়রা। নতুন আন্তর্জাতিক সেতু সেই হতাশ জনপদে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ এনে দিয়েছে। আর এই পরিবর্তনের পেছনে আছে ইতিহাস, অর্থনীতি ও সীমান্তপারের মানবিক সম্পর্কের এক ব্যতিক্রমী গল্প।
উইন্ডসরের পশ্চিম প্রান্তের স্যান্ডউইচ টাউনের ইতিহাস দুই শতাব্দীরও বেশি পুরোনো। ১৭৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই জনপদ উত্তর আমেরিকার ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। যুক্তরাষ্ট্রে দাসত্বের শিকার বহু মানুষ একসময় নিরাপদ জীবনের আশায় সীমান্ত পেরিয়ে কানাডায় আসতেন। আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোডের একটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য ছিল এই এলাকা। তাই স্বাধীনতার সন্ধানে আসা মানুষদের আশ্রয় দেওয়ার ঐতিহ্যও স্যান্ডউইচ টাউনের ইতিহাসের অংশ।
একসময় যে জনপদ স্বাধীনতার আশায় সীমান্ত পেরিয়ে আসা মানুষের সাক্ষী ছিল, আজ সেখানে নতুন দৃশ্য। এখন আমেরিকানরা আসছেন বেড়াতে, সময় কাটাতে এবং কানাডীয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করতে।
নতুন সেতুর উদ্বোধনের দিনের অভিজ্ঞতা এখনও ভুলতে পারেননি ৭৪ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত অন্টারিও হাইড্রো কর্মী জিম ম্যাককেলার। কানাডার ম্যাপল পাতার প্রতীক আঁকা পোশাক পরে তিনি সাইকেল চালিয়ে সেতু পার হয়েছিলেন। বিপরীত দিক থেকে আসা আমেরিকান সাইকেল আরোহীদের কেউ ছবি তুলছিলেন, কেউ হাত মেলাচ্ছিলেন, কেউ আবার কানাডাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছিলেন। তাঁর বর্ণনায়, সেদিন দুই দেশের মানুষের মধ্যে যেন এক উৎসবের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। সীমান্তের রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও সাধারণ মানুষের এমন আন্তরিকতা ছিল বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
সেতুটি চালুর পরের পরিসংখ্যানও উল্লেখযোগ্য। উইন্ডসর-ডেট্রয়েট ব্রিজ অথরিটির হিসাবে, আগস্ট থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ সেতুর বিনা টোলের হাঁটা ও সাইকেল চলাচলের পথ ব্যবহার করেছেন। একই সময়ে প্রায় ছয় লাখ যানবাহন সেতু অতিক্রম করেছে। এতে বোঝা যায়, নতুন এই যোগাযোগব্যবস্থা শুধু যাতায়াত সহজ করেনি, স্থানীয় অর্থনীতিতেও সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।
স্যান্ডউইচ টাউনের বর্তমান পরিবর্তন বুঝতে হলে এর দীর্ঘ অবহেলার কথাও মনে রাখতে হয়। একসময় এলাকার বহু বাড়ি ও দোকান জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে ছিল। তবে গর্ডি হাও সেতু প্রকল্পের সঙ্গে সড়ক, ফুটপাত, সাইকেলপথ ও আশপাশের উন্নয়নকাজ শুরু হওয়ার পর এলাকায় নতুন বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক আগ্রহ বাড়তে থাকে।
নতুন সড়ক ও আন্তর্জাতিক সেতুর সুবিধা কাজে লাগিয়ে এখন স্যান্ডউইচ টাউনে ব্যবসা প্রতিষ্ঠার আগ্রহ বাড়ছে। স্থানীয় ব্যবসায়িক উন্নয়ন সংস্থার প্রধান স্টিফেন হারগ্রিভসের কাছে অন্তত ৩৫টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আগ্রহের তথ্য রয়েছে। কিন্তু নতুন ব্যবসা চালুর মতো খালি দোকানঘর নেই বললেই চলে। সপ্তাহান্তে সাইকেল আরোহীদের ভিড় দেখে তাঁর কখনো কখনো এলাকাটিকে আমস্টারডামের ব্যস্ত সাইকেলপথের কথা মনে হয়।
সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছেন স্থানীয় রেস্তোরাঁ, পানশালা ও ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিকেরা। স্যান্ডউইচ ব্রুইং কোম্পানির মালিক নিকোল সেকেলা এবং তাঁর পাশের রক বটম বার ও রেস্তোরাঁর ব্যবসায়ও সেই পরিবর্তন স্পষ্ট। বাড়তি ক্রেতার চাপ সামলাতে তাঁকে ছয়জন নতুন কর্মী নিতে হয়েছে। আগস্টের কোনো কোনো দিনে তাঁর বিক্রি প্রায় তিন গুণ পর্যন্ত বেড়েছে।
আমেরিকান দর্শনার্থীরা সেতু পার হয়ে এসে কানাডীয় খাবারের স্বাদ নিচ্ছেন, স্থানীয় পানীয় কিনছেন, রেস্তোরাঁয় সময় কাটাচ্ছেন। কেউ শুধু সাইকেল ভ্রমণের আনন্দ নিতে আসছেন, কেউ ঐতিহাসিক এলাকা ঘুরে দেখছেন। আবার অনেকের কাছে এই যাত্রার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। তাঁরা দুই দেশের মানুষের বন্ধুত্বকে রাজনৈতিক বিরোধের ঊর্ধ্বে রাখতে চান।
মিশিগানের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ভিন্স লাক্রোয়া তাঁর পুরোনো এমজি কনভার্টিবল গাড়ি নিয়ে নতুন সেতু পার হয়ে স্যান্ডউইচ টাউনে এসেছিলেন। গাড়িতে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা লাগানো ছিল। তাঁর কাছে প্রায় এক শতাব্দী পর এ অঞ্চলে নতুন আন্তর্জাতিক সেতু চালু হওয়া দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের জন্য আশাব্যঞ্জক ঘটনা।
তবে আমেরিকানদের আগমনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কিছু অপ্রত্যাশিত অভিজ্ঞতাও। স্যান্ডউইচ টাউনের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, অনেক মার্কিন দর্শনার্থী কেনাকাটা কিংবা খাবারের অর্ডার দেওয়ার পাশাপাশি কানাডীয়দের কাছে ক্ষমা চাইছেন। তাঁদের এই ক্ষমা প্রার্থনা কোনো ব্যক্তিগত ঘটনার জন্য নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও কানাডার সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির কারণে।
ডেট্রয়েটের উত্তরের একটি শহর থেকে আসা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা জুলি ব্রেনান এবং তাঁর বোন সারাহ নিয়মিত সাইকেল চালিয়ে নতুন সেতু পার হচ্ছেন। সারাহ ইতিমধ্যে চারবার এবং জুলি পাঁচবার এই পথ ব্যবহার করেছেন। স্যান্ডউইচ টাউনের পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং স্থানীয় রেস্তোরাঁ তাঁদের আকৃষ্ট করেছে।
জুলি জানিয়েছেন, প্রায় ৩০ বছর তিনি কানাডায় আসেননি। নতুন সেতু তাঁকে আবার প্রতিবেশী দেশে আসার সুযোগ করে দিয়েছে। কানাডার প্রতি তাঁর ভালোবাসার কথা জানিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বের সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, বর্তমান মার্কিন নেতৃত্ব বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা তৈরি করছে। এই পরিস্থিতির জন্যই তিনি কানাডীয়দের কাছে ক্ষমা জানাতে চান।
নিকোল সেকেলার অভিজ্ঞতাও একই ধরনের। গত তিন মাসে তাঁর রেস্তোরাঁয় আসা অনেক মার্কিন নাগরিক বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তবে তিনি তাঁদের জানিয়েছেন, ক্ষমা চাওয়ার প্রয়োজন নেই। কানাডায় এসে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সমর্থন করাটাই তাঁর কাছে যথেষ্ট আন্তরিকতার পরিচয়।
এই কথোপকথনগুলো কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। দুই দেশের সরকারের মধ্যে শুল্ক, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক নীতির বিরোধ থাকলেও সাধারণ মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ পুরোপুরি সেই বিরোধের ওপর নির্ভরশীল নয়। সীমান্তের দুই পাশের মানুষের মধ্যে আত্মীয়তা, বন্ধুত্ব, ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও সামাজিক যোগাযোগ দীর্ঘদিনের।
গর্ডি হাও আন্তর্জাতিক সেতুর উদ্বোধন ঘিরেও দুই দেশের রাজনৈতিক টানাপোড়েন দেখা গেলেও এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেক বড়। প্রায় ৪৭০ কোটি ডলার ব্যয়ে নির্মিত ছয় লেনের এই সেতু অন্টারিওর হাইওয়ে ৪০১-এর সঙ্গে মিশিগানের ইন্টারস্টেট ৭৫-কে সরাসরি যুক্ত করেছে। ফলে এটি শুধু স্থানীয় পর্যটন নয়, উত্তর আমেরিকার পণ্য পরিবহন ও সীমান্তবর্তী বাণিজ্যেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তথ্যসূত্র: Toronto Star; Reuters, CBC News
ছবি: AI দিয়ে তৈরি প্রতীকী চিত্র। বাস্তব কোনো ব্যক্তি বা ঘটনার আলোকচিত্র নয়। নজরুল ইসলাম মিন্টো টরন্টো থেকে প্রকাশিত দেশেবিদেশে পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক।








