৯ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

অর্থনীতি

বাণিজ্য যুদ্ধের রাশ টানা যুক্তরাষ্ট্র-চীনের জন্য কেন জরুরি হয়ে পড়েছে

বাণিজ্য যুদ্ধের রাশ টানা যুক্তরাষ্ট্র-চীনের জন্য কেন জরুরি হয়ে পড়েছে

শ্যাং-জিন ওয়েই : চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের গত সেপ্টেম্বরের ওয়াশিংটন সফর নতুন চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়েছে। তবে সফরটি একেবারেই ব্যর্থ হয়েছে এমনটা বলা যায় না। গত বছরের অক্টোবরে শি ও ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে বাণিজ্য যুদ্ধের রাশ টানতে যে সম্মতি দিয়েছিলেন তার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। আগে এ যুদ্ধবিরতি ১০ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন তা বহাল থাকবে ২০২৭ সালের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত। অর্জনটি আপাতদৃষ্টিতে সীমিত হলেও অস্থিতিশীল বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এটি কিছুটা স্বস্তির অবকাশ এনে দিয়েছে।

মূল সমঝোতাটি বেশ সরল। গত অক্টোবরে চীন বিরল মৃত্তিকা বা রেয়ার আর্থ এবং সংশ্লিষ্ট উপকরণ রফতানিতে যে নিয়ন্ত্রণ ঘোষণা করেছিল, আপাতত তা কার্যকর করবে না। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও নতুন করে শুল্ক বাড়ানো থেকে বিরত থাকবে। ফলে চীনা পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক শুল্ক বুসানে নির্ধারিত প্রায় ৪৭ শতাংশের কাছাকাছি থাকবে, যা তার আগে ছিল ৫৭ শতাংশ। চুক্তির শর্ত মানা নিয়ে দুই পক্ষই অভিযোগ করেছে। কিন্তু প্রেসিডেন্টদের পরবর্তী বৈঠকের আগে কেউই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হতে দিতে চায় না। তাদের প্রথম বৈঠক হওয়ার কথা নভেম্বরে শেনঝেনে, এরপর পরের মাসে মায়ামিতে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে দরকষাকষিতে চীনের হাতে যে যথেষ্ট শক্তিশালী হাতিয়ার রয়েছে, তা স্পষ্ট। বৈশ্বিক বিরল মৃত্তিকা খননের প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ এবং প্রক্রিয়াজাতের ৮৫-৯০ শতাংশই চীনের নিয়ন্ত্রণে। প্রক্রিয়াজাত হলো সেই ধাপ, যেখানে বিভিন্ন আকরিক থেকে আলাদা করে এমন অক্সাইড তৈরি করা হয়, যা বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত হয়। ভারী বিরল মৃত্তিকার ক্ষেত্রে চীনের নিয়ন্ত্রণ আরো শক্ত। বৈদ্যুতিক গাড়ির চুম্বক, বায়ু টারবাইন ও ক্ষেপণাস্ত্র নির্দেশনা ব্যবস্থায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ডিসপ্রোসিয়াম ও টারবিয়ামের প্রক্রিয়াজাত প্রায় পুরোপুরিই চীনে হয়ে থাকে।

১৭টি বিরল মৃত্তিকা উপাদানকে আলাদাভাবে হিসাব করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের চীনের বাইরে উল্লেখযোগ্য খনন সক্ষমতা রয়েছে মাত্র সাত বা আটটির ক্ষেত্রে। কিন্তু প্রক্রিয়াজাত সক্ষমতা বলতে গেলে নেই। অবশ্য আগামী দুই বছরে পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে এবং তখন পাঁচটি উপাদান প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা গড়ে উঠতে পারে। অস্ট্রেলিয়ার খনি কোম্পানি লাইনাস এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এমপি ম্যাটেরিয়ালস এরই মধ্যে নিওডিমিয়াম ও প্রাসিওডিমিয়ামের মতো অপেক্ষাকৃত হালকা উপাদান বাণিজ্যিক পরিমাণে সরবরাহ করছে। আর আগামী ১০ বছরের মধ্যে চীনের বাইরে খনন সক্ষমতা প্রায় সব হালকা বিরল মৃত্তিকা এবং অধিকাংশ ভারী বিরল মৃত্তিকার চাহিদা মেটাতে সক্ষম হতে পারে।

কিন্তু তার পরও প্রক্রিয়াজাত সক্ষমতা হয়তো মাত্র নয়টি উপাদানে সীমাবদ্ধ থাকবে এবং ডিসপ্রোসিয়াম ও টারবিয়ামের ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ প্রায় অক্ষুণ্ন থাকবে। ভবিষ্যতে প্রক্রিয়াজাত প্রযুক্তিতে উদ্ভাবন কিংবা উৎপাদিত পণ্যে বিরল মৃত্তিকার প্রয়োজনই কমিয়ে ফেলার মতো নতুন নকশা পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে। তবে এমন পরিবর্তন কতটা এবং কীভাবে ঘটবে, তা অনুমান করা কঠিন।

চীন থেকে ‘ঝুঁকি কমানো’ বা ডি-রিস্কিং করলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ নিঃসন্দেহে লাভবান হবে—এ ধারণাটিও প্রশ্নের মুখে তোলা দরকার। সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ বরং ভিন্ন কিছুর ইঙ্গিত দেয়। যুক্তরাষ্ট্র এখন যেসব আন্তর্জাতিক নিয়মকে নিজের জন্য অসুবিধাজনক মনে করছে, সেগুলোর বাধ্যবাধকতায় আর থাকতে চায় না। এমন পরিস্থিতিতে বিরল মৃত্তিকার ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণই মার্কিন সুরক্ষাবাদ ও অর্থনৈতিক যুদ্ধনীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার অল্প কয়েকটি অবশিষ্ট উপায়ের একটি হয়ে উঠেছে।

ট্রাম্প প্রশাসন যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের পরিবারগুলোর ওপর শুল্কের ব্যয় নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাচ্ছে বলে মনে হয় না, তাই পরবর্তী দফার শুল্ক এমন কোনো পর্যায়ে থামবে, যা আমেরিকানরা সহজে বহন করতে পারবে—এর কোনো নিশ্চয়তা নেই, বরং বিরল মৃত্তিকার সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ না করে তা কমিয়ে দেয়ার হুমকি দিয়ে চীন অন্তত স্বল্প মেয়াদে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে তার নিজের সিদ্ধান্তের ক্ষতি থেকেই হয়তো রক্ষা করছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অবস্থাও প্রায় একই রকম। চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ানোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ইইউ বেশি সতর্ক থেকেছে। এর একটি কারণ, ইউরোপীয় শিল্প চীনা উপকরণের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ইইউর নিজস্ব ক্রিটিক্যাল র-ম্যাটেরিয়ালস অ্যাক্টে ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত অভ্যন্তরীণভাবে করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে ইইউর নিরীক্ষকরা জানিয়েছে, প্রকৃত সক্ষমতা এখনো প্রায় ২৫ শতাংশের কাছাকাছি। বিষয়টি আরো তাৎপর্যপূর্ণ এ কারণে যে ২০১০ সালে বিরল মৃত্তিকা নিয়ে চীনের সঙ্গে বিরোধের পর জাপান চীননির্ভরতা কমাতে এক দশকের বেশি সময় ধরে প্রায় ১২০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। তার পরও ২০২৬ সালের শুরুর দিকে দেশটির ভারী বিরল মৃত্তিকার আমদানি ৭০-৮০ শতাংশ কমে যায়।

রফতানি নিয়ন্ত্রণের ধারণা চীন উদ্ভাবন করেনি। গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ‘এনটিটি লিস্ট’-এ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় নয় গুণ বেড়ে প্রায় ১ হাজার ২০০-তে পৌঁছেছে। বিপরীতে চীনের পাল্টা নিয়ন্ত্রণ তালিকাগুলোতে মাঝেমধ্যে কয়েক ডজন করে প্রতিষ্ঠান যোগ হয়েছে। এ হিসাবে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউর নিয়ন্ত্রণ তালিকা চীনের তুলনায় অনেক দীর্ঘ।

রফতানি নিয়ন্ত্রণ আনুষ্ঠানিকভাবে সামরিক ব্যবহারের লক্ষ্যে আরোপ করা হলেও জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তিটি সবসময় প্রচারের মতো এতটা সরল নয়। অনেক সময় বেসামরিক খাতে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কাঙ্ক্ষিত প্রভাবের সমান কিংবা তার চেয়েও বড় হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের রফতানি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এমনই একটি অনিচ্ছাকৃত ফল হয়েছে—মার্কিন রফতানি ও চীনা আমদানি দুটোই কমেছে।

সম্ভবত এর কারণ হলো, রফতানি নিয়ন্ত্রণের ফলে চীনা ক্রেতারা মার্কিন সরবরাহকারীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এসব মার্কিন সরবরাহকারীর বেশির ভাগই বিকল্প ক্রেতা খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়। ফলে তাদের আয়, মুনাফা ও কর্মসংস্থান কমে যায়। অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের হিসাবে ২০২৪-২৬ সময়কালে রফতানি নিয়ন্ত্রণের কারণে চীনের মোট দেশজ উৎপাদনের সম্মিলিত ক্ষতি হয়েছে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ। কিন্তু ২০২৩ সালের একটি ইনপুট-আউটপুট গবেষণার সিদ্ধান্ত হলো, তুলনামূলক হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতি আরো বেশি হয়েছে। আর এ পরিস্থিতিতে জাপানি, দক্ষিণ কোরীয় ও ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সংশ্লিষ্ট বাজারের অংশ দখল করেছে।

এমন এক বিশ্বে, যেখানে নিয়মভিত্তিক বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থা কার্যকরভাবে কাজ করছে না, পারস্পরিক চাপ প্রয়োগের সক্ষমতায় স্থিতিশীল একটি ভঙ্গুর স্থিতাবস্থা সম্ভবত একতরফা আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা কিংবা বিশৃঙ্খলার চেয়ে ভালো। আর এ শূন্য-সমষ্টির টানাপড়েন যদি শেষ পর্যন্ত দেশগুলোকে আবার বহুপক্ষীয় আলোচনায় ফিরতে উদ্বুদ্ধ করে, তাহলে সেটি আরো ভালো ফল বয়ে আনবে। [স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]

শ্যাং-জিন ওয়েই: এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ। বর্তমানে তিনি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স ও ইকোনমিকসের অধ্যাপক – ইংরেজি থেকে অনূদিত