যুক্তরাষ্ট্রে শরণার্থী পুনর্বাসন নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে নতুন সরকারি পরিসংখ্যানে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে টেক্সাসে পুনর্বাসনের জন্য অনুমোদিত ৮১৭ জন শরণার্থীর সবাই দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আসা। জাতীয় পর্যায়ে এ বছর যেসব শরণার্থীকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে ১২ শতাংশেরও বেশি টেক্সাসে পুনর্বাসিত হওয়ার কথা রয়েছে।
টেক্সাস এর সংবাদমাধ্যম দ্য টেক্সাস ট্রিবিউন প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের অভিবাসন ও শরণার্থী নীতির ফলে যুক্তরাষ্ট্রে শরণার্থী গ্রহণের ধরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে গেছে। বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকা কার্যত একমাত্র দেশ, যেখান থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় শরণার্থী গ্রহণ করছে যুক্তরাষ্ট্র
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, টেক্সাসের পর সবচেয়ে বেশি শরণার্থী পুনর্বাসন পেয়েছে ফ্লোরিডা ও ক্যালিফোর্নিয়া। তবে চলতি অর্থবছরে দক্ষিণ আফ্রিকার বাইরে থেকে মাত্র তিনজন শরণার্থীকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যাদের আফগানিস্তান থেকে কলোরাডোতে পাঠানো হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের শরণার্থী কর্মসূচির ইতিহাসে এটি একটি ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি। কারণ অতীতে বিভিন্ন অঞ্চল ও সংঘাতপ্রবণ দেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ পুনর্বাসনের সুযোগ পেলেও বর্তমানে সেই বৈচিত্র্য প্রায় অনুপস্থিত।
দক্ষিণ আফ্রিকাকে ঘিরে ট্রাম্প প্রশাসনের বিশেষ মনোযোগ নতুন নয়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে নির্দেশ দেন, দক্ষিণ আফ্রিকার আফ্রিকানার সম্প্রদায়ের সদস্যদের শরণার্থী আবেদন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করতে। আফ্রিকানাররা মূলত ডাচ, ফরাসি ও জার্মান বংশোদ্ভূত ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপনকারীদের উত্তরসূরি।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, দক্ষিণ আফ্রিকায় এই জনগোষ্ঠী বর্ণগত বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। তবে দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার এ অভিযোগ বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সহযোগিতা বিভাগ একাধিক বিবৃতিতে বলেছে, দক্ষিণ আফ্রিকায় কথিত “শ্বেতাঙ্গ গণহত্যা” বা ব্যাপক নিপীড়নের দাবি নির্ভরযোগ্য কোনো প্রমাণ দ্বারা সমর্থিত নয়। বরং আফ্রিকানার সম্প্রদায়ের অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিও প্রকাশ্যে এই ধরনের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
গত মে মাসে ট্রাম্প প্রশাসন ২০২৬ অর্থবছরের শরণার্থী গ্রহণের সর্বোচ্চ সীমা ৭ হাজার ৫০০ থেকে বাড়িয়ে ১৭ হাজার ৫০০ জনে উন্নীত করে। এ সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যায় প্রশাসন দাবি করে, দক্ষিণ আফ্রিকায় একটি “অপ্রত্যাশিত শরণার্থী সংকট” তৈরি হয়েছে। অভিবাসন ও শরণার্থী আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের হাতে নির্দিষ্ট দেশ বা জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ক্ষমতা থাকলেও বর্তমান প্রশাসনের পরিবর্তনগুলো আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় দ্রুত ও ব্যাপক।
সাউদার্ন মেথডিস্ট ইউনিভার্সিটির আইন অধ্যাপক নাটালি নানাসি, যিনি শরণার্থী ও আশ্রয় আইন নিয়ে গবেষণা করেন, বলেন, শরণার্থী পুনর্বাসন অনেক সময় রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হয়ে ওঠে। কারা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুযোগ পাবেন, সেই সিদ্ধান্তেও রাজনৈতিক প্রভাব দেখা যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, শরণার্থীরা সাধারণত নিজেরা ঠিক করতে পারেন না কোথায় তাদের পাঠানো হবে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমোদন পাওয়ার পর সরকারি ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের নির্দিষ্ট অঙ্গরাজ্যে পুনর্বাসন করা হয়।
টেক্সাস দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রে শরণার্থী পুনর্বাসনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। তবে আগে সেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মানুষকে পুনর্বাসন দেওয়া হতো। ২০২৪ অর্থবছরে সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের সময় টেক্সাস প্রায় ৯ হাজার ৮০০ শরণার্থী গ্রহণ করেছিল। তারা এসেছিলেন ৪৪টি ভিন্ন দেশ থেকে। ওই সময় ভেনেজুয়েলা, আফগানিস্তান এবং কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র ছিল শরণার্থীদের প্রধান উৎসদেশ।
তখন দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে কোনো শরণার্থী টেক্সাসে পুনর্বাসিত হয়নি। ২০২৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকেও একই চিত্র দেখা যায়। ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার আগে টেক্সাসে ৪১টি দেশ থেকে ৩ হাজার ৮০০-এর বেশি শরণার্থী এসেছিলেন। কিন্তু প্রশাসন পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টেক্সাসে মোট ৭২ জন শরণার্থী পুনর্বাসিত হয়েছেন। এর মধ্যে ৬৪ জন দক্ষিণ আফ্রিকার, সাতজন এল সালভাদরের এবং একজন নরওয়ের নাগরিক। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০২৬ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে মোট শরণার্থী গ্রহণের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজারে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তা হলে এটি গত অর্ধশতাব্দীর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে কম শরণার্থী গ্রহণের রেকর্ডগুলোর একটি হবে।
অভিবাসন নীতি ও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা গবেষকরা বলছেন, শরণার্থী কর্মসূচিতে এই পরিবর্তন শুধু সংখ্যার দিক থেকেই নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মানবিক ও বহুজাতিক পুনর্বাসন নীতির দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ এক মোড় নির্দেশ করছে।














