৫ই ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ

যুক্তরাষ্ট্র

ওয়াশিংটন ডিসিতে পুলিশের নিয়ন্ত্রণ নিলেন ট্রাম্প, ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন

ওয়াশিংটন ডিসিতে পুলিশের নিয়ন্ত্রণ নিলেন ট্রাম্প, ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন

যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির পুলিশ বিভাগের নিয়ন্ত্রণ অস্থায়ীভাবে নিজের অধীনে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সে সঙ্গে, ওয়াশিংটন ডিসিতে ৮০০ ন্যাশনাল গার্ড সদস্য মোতায়েন করছেন তিনি। রাজধানীতে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার এক নজিরবিহীন প্রয়োগ হিসেবেই ট্রাম্পের এসব পদক্ষেপকে দেখা হচ্ছে। ট্রাম্প মূলত এই পদক্ষেপ নিয়েছেন শহরের নির্বাচিত নেতৃত্বকে পাশ কাটিয়ে। বিশ্লেষকদের মতে, তার দ্বিতীয় মেয়াদে এটি আরেকটি উদাহরণ যেখানে তিনি আধুনিক মার্কিন ইতিহাসে রাজনৈতিক রীতিনীতিকে অগ্রাহ্য করে নজিরবিহীনভাবে নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করছেন।

হোয়াইট হাউসে সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের রাজধানী সহিংস গ্যাং ও রক্তপিপাসু অপরাধীদের দখলে চলে গেছে।‘ শহরকে বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা হিসেবে তিনি এই পদক্ষেপকে তুলে ধরেন। যদিও সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২৩ সালে সহিংস অপরাধ বেড়ে গেলেও এরপর দ্রুত তা হ্রাস পাচ্ছে। চলতি গ্রীষ্মে এটি দ্বিতীয় ঘটনা যখন ট্রাম্প কোনো ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত শহরে সেনা মোতায়েন করলেন। এর আগে ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসমের অনুমতি ছাড়াই জুন মাসে লস অ্যাঞ্জেলেসে ন্যাশনাল গার্ড পাঠান ট্রাম্প। এ ঘটনায় ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ফেডারেল আদালতে মামলা চলছে। ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, শিকাগোসহ অন্যান্য বড় ডেমোক্র্যাট-শাসিত শহরও পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।

ট্রাম্পের নির্দেশে কয়েক ডজন ফেডারেল সংস্থার শতাধিক কর্মকর্তা ওয়াশিংটনে কার্যক্রম চালাচ্ছেন। অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি শহরের পুলিশ তদারকি করবেন বলে জানানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ন্যাশনাল গার্ড সদস্যরা প্রশাসনিক ও লজিস্টিক সহায়তা এবং আইন প্রয়োগে শারীরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করবে। ট্রাম্পের দাবির বিপরীতে ওয়াশিংটনের মেয়র মুরিয়েল বাউসার বলেন, ২০২৪ সালে শহরে সহিংস অপরাধ ৩৫% এবং ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসে আরো ২৬% কমেছে—যা তিন দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। তবে তিনি স্বীকার করেন, আইন অনুযায়ী জরুরি অবস্থায় অস্থায়ীভাবে পুলিশ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের আছে। শহরের অ্যাটর্নি জেনারেল ব্রায়ান শ্যাল্ব ট্রাম্পের পদক্ষেপকে ‘অবৈধ’ আখ্যা দিয়ে আইনি পদক্ষেপের কথা বিবেচনা করছেন।

ট্রাম্প হোম রুল অ্যাক্টের একটি ধারা ব্যবহার করে শহরে ‘জননিরাপত্তা জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি ৩০ দিনের জন্য পুলিশ বিভাগের নিয়ন্ত্রণ নিলেন। একইসঙ্গে তিনি গৃহহীনদের অস্থায়ী বসতি উচ্ছেদের ঘোষণা দেন। তবে স্থানান্তরের পরিকল্পনা প্রকাশ করেননি। উল্লেখ্য, রাজধানীর ন্যাশনাল গার্ড সদস্যদের উপর প্রেসিডেন্টের সরাসরি কর্তৃত্ব রয়েছে—যা রাজ্যভিত্তিক বাহিনীর ক্ষেত্রে সাধারণত গভর্নরের হাতে থাকে। অতীতে ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটলে হামলা ও ২০২০ সালের পুলিশি নির্যাতনবিরোধী বিক্ষোভ দমনেও ওয়াশিংটনে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করা হয়েছিল।

ওয়াশিংটন ডিসির গৃহহীনদের নিয়ে কাজ করছে কমিউনিটি পার্টনারশিপ নামের একটি সংগঠন। এ সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, ৭ লাখ বাসিন্দার নগরীটিতে আশ্রয়হীন অবস্থায় রাত পার করেন প্রায় ৮০০ জনের মতো মানুষ। এছাড়া ওয়াশিংটনের জরুরি আশ্রয়কেন্দ্রগুলোয় অবস্থান করেন আরো ৩ হাজার ২৭৫ জন। আর ট্রানজিশনাল হাউজিং ফ্যাসিলিটিতে থাকে আরো ১ হাজার ৬৫ জন। ট্রাম্প বরাবরই দাবি করে এসেছেন, ওয়াশিংটন ডিসিকে নিরাপদ করতে ফেডারেল আইন প্রয়োগের প্রয়োজন হতে পারে। যদিও নগরীর পুলিশ বিভাগের তথ্য পুরোপুরি ভিন্ন। এমনকি ফেডারেল সরকারের তথ্যও বলছে, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানীতে সহিংস অপরাধ ২০২৩ সালের তুলনায় ৩৫ শতাংশ হ্রাস পেয়ে প্রায় তিন দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।

ডিসির মেয়র মুরিয়েল বাউসার এ বিষয়ে রোববার মার্কিন টেলিভিশন চ্যানেল এমএসএনবিসিকে বলেন, ‘আমাদের এখানে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে না। গত দুই বছরে আমরা সহিংস অপরাধ কমিয়ে ৩০ বছরে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে এনেছি। চলতি বছরেও এখন পর্যন্ত সহিংস অপরাধ কমেছে আরো ২৬ শতাংশ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত ফেডারেল সংস্থাগুলোর সদস্যরা সবসময়ই ডিসির রাস্তায় থাকে। আমরা তাদের সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করে থাকি।

ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিয়ন্ত্রণাধীন ডিসি ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনের হুমকি দিয়ে চলেছেন। গত সপ্তাহেই বিভিন্ন ফেডারেল সংস্থার কর্মকর্তাদের ডিসিতে টহল বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা স্থানীয় ন্যাশনাল পাবলিক রেডিওকে জানিয়েছেন, শনিবার রাতে বেশকিছু ফেডারেল কর্মকর্তাকে নগরীতে মোতায়েন করা হয়, যাদের সংখ্যা ৪৫০ জন পর্যন্ত হতে পারে। ওয়াশিংটন ডিসিতে ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণ আছে কেবল ফেডারেল ভূসম্পত্তি ও ভবনের ওপর। এ অবস্থায় তিনি কোন আইনি ক্ষমতা ব্যবহার করে রাজধানী থেকে মানুষজনকে উচ্ছেদ করবেন, বার্তা সংস্থা রয়টার্সের পক্ষ থেকে সে বিষয়ে জানতে হোয়াইট হাউজের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। যদিও হোয়াইট হাউজ এ বিষয়ে কোনো উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।