৬ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

যুক্তরাষ্ট্র

রাইফেল হাতে ‘ফাক জো বাইডেন’ টি-শার্ট পরে আলোচনায় আসা সাংবাদিক হলেন ট্রাম্পের সহকারী প্রেস সচিব

রাইফেল হাতে ‘ফাক জো বাইডেন’ টি-শার্ট পরে আলোচনায় আসা সাংবাদিক হলেন ট্রাম্পের সহকারী প্রেস সচিব

ডানপন্থি টিভি ব্যক্তিত্ব বেনি রে হারমনিকে হোয়াইট হাউসের সহকারী প্রেস সচিব হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে দায়িত্ব পাওয়ার পরই হাতে রাইফেল ও ‘ফাক জো বাইডেন’ লেখা টি-শার্ট পরা হারমনির একটি পুরোনো ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হলেও নবনিযুক্ত এই কর্মকর্তার পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে হোয়াইট হাউস।

হোয়াইট হাউসের নতুন সহকারী প্রেস সচিব বেনি রে হারমনি গত শুক্রবার (০২ অক্টোবর) জানান যে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনে যোগ দিচ্ছেন।কট্টর ডানপন্থি সংবাদমাধ্যম ‘রিয়েল আমেরিকা’স ভয়েস’-এর প্রতিনিধি হিসেবে ট্রাম্পের সংবাদ কভার করার মাত্র কয়েক দিন পরই তার এই পদপ্রাপ্তির ঘোষণা আসে। উল্লেখ্য, এই সংবাদমাধ্যমটি মূলত ট্রাম্পের সাবেক উপদেষ্টা স্টিভ ব্যাননের ভিডিও পডকাস্ট প্ল্যাটফর্ম হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল।

বড়দিনের সাজসজ্জার সামনে বাইডেনবিরোধী এই ‘ফাক জো বাইডেন’ লেখা টি-শার্ট পরে এক বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তির সঙ্গে হাতে রাইফেল নিয়ে হারমনির তোলা ছবিটি ২০২১ সালের নভেম্বরে ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করেছিলেন উগ্র ডানপন্থি রিপাবলিকান নেতা জেরোম বেল, যিনি ২০২২ সালে কংগ্রেস নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন।

সংবাদমাধ্যম ‘ডেইলি মিরর’-এ প্রকাশিত ওই পোস্টের স্ক্রিনশটে দেখা যায়, ক্যাপশনে লেখা ছিল, ‘আমার প্রচার শিবিরের পাবলিক অ্যাফেয়ার্স ডিরেক্টর বেনি রে হারমনি এক অপ্রতিরোধ্য ব্যক্তিত্ব। এভাবেই আমরা কাজ করি।’

২০২১ সালের ডিসেম্বরে ট্রাম্পবিরোধী প্ল্যাটফর্ম ‘প্যাট্রিয়টটেকস’ ছবিটি শেয়ার করার পর হারমনি নিজেই এর সত্যতা পরোক্ষভাবে নিশ্চিত করেছিলেন। পরের দিন তিনি একই পোশাকে ও একই স্থানে হাসিমুখের আরেকটি ছবি দিয়ে পোস্টটির জবাব দেন। ছবির সেই বয়স্ক ব্যক্তির সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে এক ব্যবহারকারী কটাক্ষ করে ‘মেয়ে নাকি ডেট?’ জানতে চাইলে হারমনি এক শব্দে জবাব দিয়েছিলেন: ‘আংকেল’।

তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মেয়াদে ন্যাসকার রেসে ট্রাম্প সমর্থকদের দেওয়া ‘ফাক জো বাইডেন’ স্লোগানটি ওই সময়ে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল।

ভাইরাল হওয়া ছবির বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে হারমনি সাড়া দেননি। তবে তার পক্ষে অবস্থান নিয়ে হোয়াইট হাউসের ডেপুটি প্রেস সচিব অ্যানা কেলি এক বিবৃতিতে দাবি করেন, সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (মাগা) আন্দোলনের পক্ষে হারমনির অবস্থান প্রশংসনীয়।

কেলি লিখেছেন, ‘হোয়াইট হাউস করেসপনডেন্ট হিসেবে বেনি রে হারমনি মাগা আন্দোলনের এক বিশ্বস্ত কণ্ঠস্বর ছিলেন। সহকারী প্রেস সচিব হিসেবে তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যোগাযোগ দলে এক অসাধারণ সংযোজন হবেন—আমরা তাকে আমাদের দলে স্বাগত জানাতে উন্মুখ হয়ে আছি!’

হারমনি এমন এক সময়ে হোয়াইট হাউসের প্রেস টিমে যোগ দিলেন, যখন প্রশাসন চরম একপেশে গণমাধ্যম নীতি গ্রহণ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সমালোচনামূলক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রবেশাধিকার সীমিত বা অস্বীকার করে ট্রাম্পকে সবসময় স্তাবক সাংবাদিকদের দিয়ে ঘিরে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অতিরিক্ত “নেতিবাচক” সংবাদ পরিবেশনের অভিযোগে সিএনএন, পলিটিকো এবং এমএস নাউ-কে হোয়াইট হাউস থেকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন ট্রাম্প। তার উপদেষ্টারা এখন বেছে বেছে সেইসব সংবাদমাধ্যমকে প্রশ্ন করার সুযোগ দিচ্ছেন, যারা প্রকাশ্যে ট্রাম্পকে সমর্থন করে।

রিয়েল আমেরিকা’স ভয়েসের পূর্ববর্তী হোয়াইট হাউস প্রতিনিধি ব্রায়ান গ্লেন ট্রাম্পের সুনজর হারানোর পরই হারমনি সেখানে দায়িত্ব পেয়েছিলেন। গ্লেনের সঙ্গী মার্জোরি টেলর গ্রিন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মাগা আন্দোলনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ তুলে বিরোধে জড়ালে গ্লেনও কোণঠাসা হয়ে পড়েন। অথচ গ্লেন অতীতে ট্রাম্পের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে সক্রিয় ছিলেন; উদাহরণস্বরূপ ২০২৫ সালে তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে ওভাল অফিসে স্যুট না পরার কারণ জানতে চেয়ে তীব্র তোলপাড় সৃষ্টি করেছিলেন।

গত মাসে প্রেসিডেন্সিয়াল বিমান ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’-এ সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্পের বাঁ হাতে একগুচ্ছ কাগজ দেখা যায়। সে সময় হারমনি ট্রাম্পকে একের পর এক বন্ধুভাবাপন্ন প্রশ্ন করেন, যা রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার জন্য সাজানো ছিল বলে প্রতীয়মান হয়।

টিএমজেড জানায়, বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) ছবিতে দেখা গেছে ট্রাম্পের হাতে থাকা প্রথম পৃষ্ঠার ওপরে হারমনির নাম লেখা ছিল—যা থেকে ধারণা করা হয় যে প্রশ্ন নেওয়ার সময় ট্রাম্প আসলে হারমনির জীবনবৃত্তান্ত হাতে ধরে ছিলেন।

লিংকডইন প্রোফাইলের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ বছর বয়সী হারমনি অতীতে উগ্র ডানপন্থি সংস্থা ‘টার্নিং পয়েন্ট ইউএসএ’-র উপস্থাপক জ্যাক পোসোবিয়েকের প্রযোজক হিসেবে কাজ করেছিলেন। এ ছাড়া অ্যারিজোনার রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য পল গোসার এবং ফ্লোরিডার সাবেক কংগ্রেস সদস্য ম্যাট গেটজের ‘সংকট ব্যবস্থাপনা বিষয়ক’ প্রেস সহযোগী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

২০২১ সালে ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেস সদস্য আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-করতেজকে হত্যা এবং জো বাইডেনকে আক্রমণের অ্যানিমেটেড ভিডিও পোস্ট করার দায়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে গোসার তিরস্কৃত হলে, তার পক্ষে নিজের ইউটিউব চ্যানেলে জোরালো সাফাই গেয়ে ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন হারমনি।

২০২৫ সালে ইলিনয়ের স্প্রিংফিল্ডের একটি স্থানীয় টিভি স্টেশনে কট্টর ডানপন্থি ইনফ্লুয়েন্সার চার্লি কার্ককে নিজের ‘প্রথম বস ও মেন্টর’ উল্লেখ করে অন-এয়ারে শ্রদ্ধা জানানোর পর চাকরি ছাড়লে ডানপন্থি গণমাধ্যমে পরিচিতি পান হারমনি। তবে ওই টিভি স্টেশনের বার্তা পরিচালক হারমনির বরখাস্তের দাবি অস্বীকার করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে জানান যে হারমনি কখনো তাদের নিউজরুমের কর্মী ছিলেন না; বরং তিনি চ্যানেলটির বিজ্ঞাপন বিভাগের একটি বাণিজ্যিকভাবে প্রযোজিত অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করতেন, যেখানে অর্থ দিয়ে আসা মক্কেলদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হতো।