৩রা অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

যুক্তরাষ্ট্র

উইসকনসিনের এক মসজিদ নেতাকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের পক্ষে বিচারকের রায়

উইসকনসিনের এক মসজিদ নেতাকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের পক্ষে বিচারকের রায়

গত ৩০ সেপ্টেম্বর বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের একজন ইমিগ্রেশন বা অভিবাসন বিষয়ক বিচারক রায় দিয়েছেন যে, উইসকনসিনের বৃহত্তম মসজিদের নেতা—যিনি ফিলিস্তিনিদের অধিকারের একজন সোচ্চার প্রবক্তা—তাঁকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে গণ্য করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা যেতে পারে।

গত মার্চ মাসে মিলওয়াকিতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট’-এর কর্মকর্তারা সালাহ সারসুরকে আটক করেছিলেন। তবে জুন মাসে একজন ফেডারেল বিচারক তাঁকে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দেন; বিচারক তাঁর এই যুক্তিকে ‘জোরালো’ বলে উল্লেখ করেন যে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কথা বলা এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণেই ট্রাম্প প্রশাসন তাঁকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিল।

তবে সারসুর বিচারকের সর্বশেষ রায়কে ‘অত্যন্ত হতাশাজনক’ বলে অভিহিত করেছেন, তবে তিনি রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। “বাক্‌স্বাধীনতা রক্ষা এবং তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে যে দেশটিকে আমি নিজের ঘর বলে জেনেছি, সেখানে থাকার অধিকার রক্ষার লড়াই আমি চালিয়ে যাব,” এক বিবৃতিতে সারসুর এ কথা বলেন।

সরকারি আইনজীবীদের দাবি, ইসরায়েলে কয়েক দশক আগে হওয়া দোষী সাব্যস্ত হওয়ার ঘটনাগুলোর কারণে সারসুর জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছেন; পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে গ্রিন কার্ডের আবেদনে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে। শিকাগো ইমিগ্রেশন কোর্টের বিচারক জেইমি সালিনার্দি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিতে তাঁকে দেশ থেকে বহিষ্কারযোগ্য বলে রায় দিলেও, অভিবাসন কর্তৃপক্ষের কাছে সারসুর মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন—সরকারের এমন দাবি খারিজ করে দিয়েছেন।

সারসুর বলেছেন, তাকে যদি পশ্চিম তীরে ফেরত পাঠানো হয় তবে তিনি নিজের জীবন নিয়ে শঙ্কিত। ইসরায়েল-অধিকৃত পশ্চিম তীরে জন্মগ্রহণকারী সারসুর ১৯৮৮ সালে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে মলোটভ ককটেল ও পাথর নিক্ষেপের কথা স্বীকার করার পর ইসরায়েলে কারারুদ্ধ হন। ১৯৯৫ সালে তাকে অস্ত্র রাখার চেষ্টার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। সারসুর অবশ্য এসব অপরাধ করার কথা অস্বীকার করেছেন। তার আইনজীবীদের দাবি, উভয় ক্ষেত্রেই তাকে নির্যাতন করা হয়েছিল এবং জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছিল।

মিলওয়াকির ইসলামিক সোসাইটির প্রেসিডেন্ট সারসুরের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড নেই; তিনি ১৯৯৩ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। তার আইনজীবীরা জানান, সারসুর যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র সরকার ইসরায়েলে তার দোষী সাব্যস্ত হওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিল।

গত মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) সারসুর বলেন, পশ্চিম তীরে ফেরত পাঠানোর অর্থ হলো “আমার জীবনের সমাপ্তি”।তার অন্যতম আইনজীবী প্যাট্রিক টরেল এপি-কে বলেন, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের হাতে অতীতে সারসুর যে আচরণের শিকার হয়েছিলেন, তা সম্ভবত ইঙ্গিত দেয় যে ফেরত পাঠানো হলে তার ভাগ্যে কী ঘটতে পারে।

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) মামলার বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনার শুনানিতে টরেল বিচারকের কাছে জোর দাবি জানান যেন এটি সুনির্দিষ্ট করা হয় যে, সারসুরকে কেবল ইসরায়েল বা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডেই ফেরত পাঠানো যাবে। অথচ তাকে দেশত্যাগের যে আদেশ দেওয়া হয়েছে, তাতে সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে জর্ডানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে—যে দেশটির সাথে সারসুরের কোনো সম্পর্কই নেই।

অভিবাসন কর্মকর্তারা সারসুরকে অভিবাসন সংক্রান্ত ফর্মে তার নিজ দেশ হিসেবে জর্ডানের নাম উল্লেখ করতে বলেছিলেন, কারণ তার পছন্দের নাম—”ফিলিস্তিন”—একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন ও ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃত নয়। কিন্তু টরেল বলেন, “জর্ডানে বসবাসের কোনো অধিকার তার নেই।” বিচারক সালিনার্দি এই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন এবং বলেন যে বিষয়টি আপিলের সময় বিবেচনা করা যেতে পারে।

আইনজীবী জানিয়েছেন, সারসুর তাকে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে যাবেন। আইনজীবী প্যাট্রিক টরেল বুধবার (২৯ সেপ্টেম্বর) বলেছেন যে সারসুরকে অন্যায়ভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “ফিলিস্তিনিদের অধিকারের সমর্থনে বক্তব্য রাখার কারণে যদি সালাহকে নির্বাসিত করা যায়, তবে যে কারোরই একই পরিণতি হতে পারে।”

আদালতের নথিপত্র অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অফ স্টেট মার্কো রুবিও ২০২৫ সালের জুন মাসে অভিবাসন সংক্রান্ত একটি বিরল-ব্যবহৃত বিধানের উল্লেখ করে একটি স্মারকলিপি জারি করেন। এতে বলা হয়, মাহমুদ খলিল ও মহসেন মাহদাওয়ির মতো একই কারণে সারসুরকেও নির্বাসিত করা যেতে পারে; উল্লেখ্য, ট্রাম্প প্রশাসন ফিলিস্তিনি অধিকারের এই দুই প্রবক্তাকেও বহিষ্কারের চেষ্টা করেছিল।

বিচারকের রায়ের আগে টরেল বলেছিলেন যে, আপিলের সময় সারসুরকে প্রমাণ করতে হবে যে নির্বাসিত হলে তিনি আবারও নির্যাতনের শিকার হতে পারেন। টরেল বলেন, “এটি একটি অত্যন্ত কঠিন শর্ত বা উচ্চ মানদণ্ড; তবে আমার মনে হয় এই মামলায় আমরা তা পূরণ করতে পারব—বিশেষ করে সালাহ অতীতে যা সহ্য করেছেন এবং ইসরায়েলি সরকার তাঁর মতো অন্যদের সাথে যে আচরণ করেছে, তা বিবেচনায় নিলে।”

৩০ দিনের মধ্যে আপিলের নোটিশ জমা দিতে হবে। স্যালিনার্ডি নতুন কোনো শুনানির দিন ধার্য করেননি; তিনি অবসরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন এবং জানিয়েছেন যে এখন থেকে বিচারক ক্রেইগ ডেফো এই মামলাটি পরিচালনা করবেন। সারসুর দাবি করেছেন যে তাঁকে নির্যাতন করা হয়েছিল এবং জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছিল।

ইসরায়েলে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার সময় সারসুরের পক্ষে আইনি লড়াই করা আইনজীবী জাওয়াদ বুলোস আগস্ট মাসে সাক্ষ্য দেন যে, সারসুরকে জোর করে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করা হয়েছিল এবং কোনো সন্ত্রাসী সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ততার অভিযোগে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি। তিনি জানান, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা ‘শিন বেট’ সারসুরকে নির্যাতন করেছিল।

ডিপার্টমেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে বুলোসকে চ্যালেঞ্জ জানায় এবং প্রশ্ন তোলে যে, তিনি কীভাবে নিশ্চিত হলেন যে ওই অভিযোগ সত্য। আইনজীবী টরেল সারসুরের বর্তমান আইনি দল প্রশ্ন তুলেছে, কেন আমেরিকান কর্তৃপক্ষ তাঁকে আটকের জন্য এ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করল।

আইনজীবী টরেল বলেন, ইসরায়েলে সারসুরের কারাবাসের বিষয়টি সরকার কয়েক দশক ধরেই জানে এবং অভিবাসন কর্তৃপক্ষের কাছে তিনি কখনোই বিষয়টি গোপন করেননি।ইসরায়েলি কারাগারে ফিলিস্তিনি বন্দিদের প্রতি আচরণ এবং জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়ের বিষয়ে বিশেষজ্ঞরাও সারসুরের পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার অভাব এবং ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রে উচ্চ সাজা প্রদানের হারের অভিযোগ নিয়ে ইসরায়েলি সামরিক আদালতগুলো বারবার সমালোচনার মুখে পড়েছে। তবে ইসরায়েল এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

গত জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ডিস্ট্রিক্ট জাজ জেমস প্যাট্রিক হ্যানলন সারসুরকে আইসিই (ICE)-এর হেফাজত থেকে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দেন। বিচারক বলেন, সারসুর এমন যুক্তি দিয়ে মামলা লড়তে পারেন যে, মতপ্রকাশের অধিকার চর্চার প্রতিশোধ হিসেবেই মার্কিন সরকার তাকে আটক করেছিল। এছাড়া হ্যানলন উল্লেখ করেন, কয়েক দশক ধরে বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে বসবাস করার পরও কেন হঠাৎ সারসুরকে ‘নিরাপত্তার জন্য হুমকি’ হিসেবে গণ্য করা হলো, তার কোনো ব্যাখ্যা সরকারি আইনজীবীরা দিতে পারেননি।

ট্রাম্প প্রশাসন হ্যানলনের এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে। সারসুরের আইনজীবীরা জানান, টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত সারসুর আইসিই-র হেফাজতে থাকাকালীন ৩০ পাউন্ডেরও বেশি ওজন হারিয়েছিলেন। এ সময় মাসে মাত্র একবার তার রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করা হতো, যা তার অঙ্গ অকার্যকর হয়ে পড়া বা মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি করেছিল।

‘কেএফএফ হেলথ নিউজ’ (KFF Health News) এবং ‘অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস’-এর এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অন্তত ৩৩টি স্টেটে শত শত বন্দি চিকিৎসার অবহেলার একই ধরনের অভিযোগ এনে ফেডারেল আদালতে মামলা দায়ের করেছেন।