রয়টার্স/ইপসসের নতুন এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে ইমিগ্রেশন ইস্যুতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অবস্থান দুর্বল হয়েছে।
জরিপে আরো দেখা গেছে, নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে ৪০ শতাংশ ইমিগ্রেশন নীতির ক্ষেত্রে রিপাবলিকানদের দৃষ্টিভঙ্গিকেই শ্রেয় বলে মনে করেছেন; অন্যদিকে ৩৮ শতাংশ ডেমোক্র্যাটদের বেছে নিয়েছেন।
এই ব্যবধান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে সর্বনিম্ন। এর বিপরীতে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে—অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের পর—রিপাবলিকানরা ২৬ পয়েন্টের ব্যবধানে এগিয়ে ছিল।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা বা সমর্থনের হার তাঁর প্রেসিডেন্সির দুর্বলতা নির্দেশ করে—এই ধারণাটি যদিও হোয়াইট হাউস ধারাবাহিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে এসেছে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ডেভিস ইংগল ‘নিউজউইক’-কে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, “ইতিহাসের অন্য কোনো প্রেসিডেন্টই আমেরিকান জনগণের জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মতো এত বেশি কিছু অর্জন করতে পারেননি; তিনি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও আবাসনকে আরও সাশ্রয়ী করে তোলার মতো বিষয়গুলোতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।”
“প্রেসিডেন্ট কেবল আমেরিকাতেই নয়, বরং বিশ্বজুড়ে ইতিমধ্যেই ঐতিহাসিক অগ্রগতি সাধন করেছেন। তাঁর গৃহীত কর্মসূচির সুফল পাওয়া কেবল শুরু হয়েছে মাত্র।”
যা জানা প্রয়োজন
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ডেমোক্র্যাটদের তুলনায় রিপাবলিকানদের ইমিগ্রেশন নীতি অধিকতর জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এ সময় তাঁর নির্দেশে সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশের হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং দেশজুড়ে কঠোর দমনমূলক পদক্ষেপ অব্যাহত রয়েছে।
তবে দ্বিতীয় মেয়াদে অভিবাসন-সংক্রান্ত বেশ কিছু আলোচিত ও স্পর্শকাতর ঘটনা ঘটেছে—যার মধ্যে রয়েছে প্রাণঘাতী সংঘাত, হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং শিশুসহ আটক ব্যক্তির সংখ্যায় ব্যাপক উল্লম্ফন—যা সামগ্রিক নীতির বিষয়ে জনমতকে প্রভাবিত করেছে।
রয়টার্স/ইপসোস-এর এই জরিপটি চার দিন ধরে অনলাইনে পরিচালিত হয় এবং ১৭ আগস্ট প্রকাশিত হয়। এতে সারা দেশের ১,১৬৬ জন প্রাপ্তবয়স্ক যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকের মতামত অন্তর্ভুক্ত ছিল। জরিপটিতে উভয় দিকে ৩ শতাংশীয় পয়েন্টের ত্রুটির সীমা (মার্জিন অফ এরর) ছিল।
নিউজউইক মন্তব্যের জন্য ইমেইলের মাধ্যমে হোয়াইট হাউসের সাথে যোগাযোগ করেছে।
এ বছর ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির প্রতি জনসমর্থন যেভাবে কমেছে
ইপসোস (Ipsos)-এর জনমত জরিপ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প যখন পুনরায় ক্ষমতায় আসেন, তখন ৪৮ শতাংশ আমেরিকান অভিবাসন বিষয়ে তাঁর গৃহীত পদক্ষেপগুলোকে সমর্থন করেছিলেন।
২০২৪ সালে ট্রাম্পের পুনর্নির্বাচিত হওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর অভিবাসন নীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল; সে সময় তিনি অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে বৃহত্তম বহিষ্কার কার্যক্রম পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
সেই বছরের জুন নাগাদ রয়টার্স/ইপসোস-এর জনমত জরিপে দেখা যায় যে, এই হার চার পয়েন্ট কমে ৪৪ শতাংশে নেমে এসেছে।
২০২৫ সালের জুন মাসে লস অ্যাঞ্জেলেসে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে; ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট’ (আইসিই)-এর কর্মকর্তারা ওই অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানোর পর এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সেই বিক্ষোভগুলো ছিল তৎকালীন সময়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইমিগ্রেশন নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রতিরোধ।
এর জবাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্যালিফোর্নিয়া ন্যাশনাল গার্ডকে ফেডারেল বা কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন এবং ‘জয়েন্ট টাস্ক ফোর্স ৫১’-এর অধীনে লস এঞ্জেলেসে মোতায়েন করার জন্য ২,০০০ গার্ড সদস্যকে তলব করেন।
সেই সময় এই পদক্ষেপটি ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছিল; ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসামও এর সমালোচনা করেন এবং ফেডারেল নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার সিদ্ধান্তে নিয়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।
গভর্নর নিউসাম বলেছিলেন যে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ইতিমধ্যেই তৎপর ছিল এবং ন্যাশনাল গার্ডের উপস্থিতি ছিল “উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে উসকানিমূলক”, যা “উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলবে”।
লস এঞ্জেলেসে আইসিই (ICE)-বিরোধী বিক্ষোভ নিউ ইয়র্ক সিটি, শিকাগো ও ডালাসসহ অন্যান্য শহরেও অনুরূপ আন্দোলনের অনুপ্রেরণা জোগায়।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সমর্থন আরও কমে যায়; এর পেছনে ছিল ‘মেট্রো সার্জ’ (Metro Surge) নামক আইসিই অভিযানের জেরে সৃষ্ট ব্যাপক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া। মিনেসোটার টুইন সিটিস—অর্থাৎ মিনিয়াপোলিস ও সেন্ট পল—অঞ্চলকে কেন্দ্র করে পরিচালিত এই অভিযানটি আংশিকভাবে সোমালি বাসিন্দাদের জড়িত থাকার অভিযোগে ওঠা জালিয়াতির বিষয়টির সাথে সম্পর্কিত ছিল।
ওই অভিযানের সময় তিন সপ্তাহেরও কম সময়ের ব্যবধানে দুজন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক গুলিতে প্রাণ হারান: তিন সন্তানের জননী ৩৭ বছর বয়সী রেনি গুড (আইস বা ICE-এর গুলিতে) এবং ৩৭ বছর বয়সী আইসিইউ নার্স অ্যালেক্স প্রেটি (বর্ডার প্যাট্রোলের গুলিতে)।
এর জেরে সমগ্র যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং ইমিগ্রেশন বিষয়ে ট্রাম্পের নীতির প্রতি জনসমর্থন হোয়াইট হাউসে তাঁর ফিরে আসার পর থেকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে;
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে মাত্র ৩৮ শতাংশ মনে করেন যে ইমিগ্রেশন ইস্যুতে তিনি ভালো কাজ করছেন।
ইপসোস/রয়টার্সের এই নতুন জরিপটি আইস (ICE)-এর গুলিতে আরেক ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনার প্রেক্ষাপটে প্রকাশিত হলো।
জুলাই মাসে, আইসিই (ICE)-এর একজন এজেন্ট জোহান সেবাস্টিয়ান ডুরান গুয়েরেরো নামের ২৫ বছর বয়সী এক কলম্বিয়ান গাড়িচালককে গুলি করে হত্যা করেন। ট্রাম্পের ইমিগ্রেশন -বিরোধী কঠোর অভিযান শুরুর পর থেকে এটি ছিল অন্তত নবম মৃত্যুর ঘটনা।
আইসিই-র হেফাজতে থাকাকালীন মৃত্যুর ঘটনা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
২০২৫ সালে আইসিই-র হেফাজতে অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা ২০০৪ সালের পর থেকে এক বছরে সর্বোচ্চ মৃত্যুর সংখ্যা।
২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে ১৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে; বর্তমান প্রবণতা অনুযায়ী, এ বছর মৃত্যুর সংখ্যা গত বছরের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জনসমর্থন কমে যাওয়া সত্ত্বেও, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তাঁর সহযোগীরা অবৈধ অভিবাসন ও সীমান্ত নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগের প্রেক্ষিতে নেওয়া এই কঠোর পদক্ষেপকে একটি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা হিসেবেই তুলে ধরেছেন।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ‘স্টেট অফ দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন যে, তাঁর প্রশাসন “রেকর্ড সংখ্যক অবৈধ অপরাধী ইমিগ্রানট থেকে বহিষ্কার করছে” এবং এই নীতির ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠী আরও নিরাপদ হয়ে উঠছে।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা সর্বনিম্ন পর্যায়ে
রয়টার্স/ইপসোস-এর জরিপ অনুযায়ী, ইমিগ্রেশন নীতি ছাড়াও প্রট্রাম্পের সামগ্রিক জনপ্রিয়তার হার তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
চার দিন ধরে চলা এই জরিপে
অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৩৩ শতাংশ ট্রাম্পের কার্যক্রমের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন এবং ৬৪ শতাংশ এর বিরোধিতা করেছেন।
অসন্তোষের অন্যতম প্রধান কারণ হলো ইরান-কেন্দ্রিক সংঘাত। সংঘাত শুরুর প্রায় ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও শান্তি আলোচনা বারবার থমকে গেছে, যা এই সংঘাত কতদিন চলতে পারে তা নিয়ে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
রয়টার্সের উক্ত জরিপে দেখা গেছে, সামগ্রিকভাবে ৮০ শতাংশ আমেরিকান—যার মধ্যে ৮৭ শতাংশ ডেমোক্র্যাট এবং ৭১ শতাংশ রিপাবলিকান অন্তর্ভুক্ত—মনে করেন যে এই সংঘাত দীর্ঘ সময় ধরে চলবে।
অন্যদিকে, জরিপে অংশগ্রহণকারী ১৬ শতাংশের ধারণা, সংঘাতটি কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে।
ইরান-কেন্দ্রিক সংঘাত আমেরিকানদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপরও প্রভাব ফেলেছে—যা ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দাদের জন্য একটি প্রধান উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখা দিয়েছে ।
এই সংঘাত বিশ্বব্যাপী তেল বাণিজ্যের এক-পঞ্চমাংশকে প্রভাবিত করেছে এবং এর ফলে পেট্রোলের দাম বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দারা চাপের মুখে পড়েছেন।
গত শুক্রবার ১৪ আগস্ট যুদ্ধ এবং তেলের দামের ওপর এর প্রভাব নিয়ে কথা বলার সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, “আমি কখনোই ক্ষমা চাইব না। আমি সঠিক কাজটিই করেছি।”
রয়টার্স/ইপসোস-এর উক্ত জরিপে দেখা গেছে যে, অর্থনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে ভোটারদের ঝোঁক ডেমোক্র্যাটদের দিকেই বেশি।
জরিপে অংশগ্রহণকারী ৩৮ শতাংশ ভোটার মনে করেন ডেমোক্র্যাটরা অর্থনীতি ভালো পরিচালনা করবেন; অন্যদিকে ৩৫ শতাংশ ভোটার রিপাবলিকানদের কর্মপদ্ধতিকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
এরপর কী হতে পারে
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ইমিগ্রেশন ইস্যুতে দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্যের ব্যবধান কমে আসাটা রিপাবলিকানদের জন্য একটি আগাম সতর্কবার্তা হতে পারে; কারণ দীর্ঘকাল ধরে এই ইস্যুতে তারা সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। ইমিগ্রেশন এখনো ট্রাম্পের অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত, তবে ডেমোক্র্যাটরা যদি ক্রমাগত তাদের অবস্থান শক্তিশালী করতে থাকে, তবে গুরুত্বপূর্ণ কংগ্রেসনাল নির্বাচনে ভোটারদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে রিপাবলিকানরা হয়তো আর এই ইস্যুটির ওপর আগের মতো জোরালোভাবে নির্ভর করতে পারবে না।
আগামী মাসগুলোতে বোঝা যাবে যে, কঠোর প্রয়োগ-কৌশল ও আটক-সংক্রান্ত নীতিমালা নিয়ে উদ্বেগ জনমতকে প্রভাবিত করতে থাকবে, নাকি প্রশাসনের সীমান্ত-নিরাপত্তা বিষয়ক কার্যক্রম রিপাবলিকানদের সেই আগের বড় ব্যবধানের অবস্থানে ফিরিয়ে আনবে—যা ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুর দিকে তাদের অনুকূলে ছিল।














