৩১শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

শেষের পাতা

নিউইয়র্কে ১.২ বিলিয়ন ডলারের বিশাল স্বাস্থ্য জালিয়াতি কেলেঙ্কারি ফাঁস যা মিনেসোটার চেয়ে ১০ গুণ ভয়াবহ, বাংলাদেশী পরিবারও জড়িত

নিউইয়র্কে ১.২ বিলিয়ন ডলারের বিশাল স্বাস্থ্য জালিয়াতি কেলেঙ্কারি ফাঁস যা মিনেসোটার চেয়ে ১০ গুণ ভয়াবহ, বাংলাদেশী পরিবারও জড়িত

নিউইয়র্কে ১.২ বিলিয়ন ডলারের বিশাল স্বাস্থ্য জালিয়াতি কেলেঙ্কারি ফাঁস যা মিনেসোটার চেয়ে ১০ গুণ ভয়াবহ, বাংলাদেশী পরিবারও জড়িত ।

নিউ ইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদন অনুসারে, নিউ ইয়র্ক সিটির একজন ব্যক্তি বয়স্কদের সাহায্য করার জন্য তৈরি একটি নিউ ইয়র্ক ষ্টেট স্বাস্থ্য কর্মসূচিকে কাজে লাগিয়ে লক্ষ লক্ষ ডলার হাতিয়ে নিয়েছেন, অথচ তার কথিত রোগীটি হাজার হাজার মাইল দূরে বসবাস করতেন। এছাড়াও একই ধরনের আরও বেশ কয়েকটি ঘটনা ফাঁস হয়েছে। মেডিকেড জালিয়াতি মামলায় বিশেষজ্ঞ আইনজীবী রিচার্ড হ্যারো নিউ ইয়র্ক পোষ্টকে বলেছেন, নিউ ইয়র্কে উদ্ঘাটিত এই জালিয়াতি সম্প্রতিমিনেসোটায় উদ্ঘাটিত জালিয়াতির চেয়ে দশ গুণ বেশি ভয়াবহ।

‘দ্য নিউ ্য়র্ক পোস্ট’ পত্রিকাটি গত ১০ বছরে সিডিপ্যাপ (CDPAP) সুবিধাভোগীদের জাদিয়াতির দ্বারা চুরি করা অন্তত ১৭৯ মিলিয়ন ডলার শনাক্ত করতে পেরেছে, অন্যদিকে এই কর্মসূচিটির মধ্যস্বত্বভোগীদের পেছনে করদাতাদের অন্তত ১ বিলিয়ন ডলার অপচয় করেছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বল্লাল হোসেন নিউইয়র্কের কনজিউমার ডিরেক্টেড পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রামের (সিডিপ্যাপ) অধীনে তার পরিবারের এক ডজন সদস্যকে বেতনভুক্ত পরিচর্যাকারী (কেয়ারগিভার) হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছিলেন। এই কর্মসূচির অধীনে অসুস্থ প্রিয়জনের যত্ন নেওয়ার জন্য আত্মীয়দের পারিশ্রমিক পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। জানা গেছে, ছয় বছরে পরিবারটি ম্যানহাটনের একটি অ্যাপার্টমেন্টে হোসেনের বয়স্ক মায়ের যত্ন নেওয়ার জন্য ৩৪৮,০০০ ডলার হাতিয়ে নিয়েছিল, অথচ সেই পুরো সময়জুড়ে তার মা বাংলাদেশেই বসবাস করছিলেন।
প্রসিকিউটরদের মতে, আকস্মিক পরিদর্শনের সময় বল্লাল হোসেনের ভাই এমনকি তাদের অসুস্থ মায়ের ছদ্মবেশ ধারণ করতেন। এই সুচতুর প্রতারণাটি শেষ পর্যন্ত ফাঁস হয়ে যায়, যার ফলে বল্লালহোসেন বড় ধরনের চুরির অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন। এটি মেডিকেড কর্মসূচিতে সংঘটিত সবচেয়ে বেপরোয়া কেলেঙ্কারিগুলোর মধ্যে একটি, যা এখন রাজ্য কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন যে অপচয় ও জালিয়াতিতে জর্জরিত।

গত ১৯৯৪ সালে বয়স্কদের নার্সিং হোম থেকে দূরে রাখতে সাহায্য করার জন্য তৈরি হওয়া সিডিপ্যাপ -CDPAP প্রোগ্রামটি সামান্য তদারকি ছাড়াই একটি বিশাল শিল্পে পরিণত হয়েছে। যে কেউ পরিচর্যাকারী হিসেবে যোগ্যতা অর্জন করতে পারে — কোনো চিকিৎসা প্রশিক্ষণ, সার্টিফিকেশন বা পূর্ব অভিজ্ঞতার প্রয়োজনই নেই।
তবে এই উন্মুক্ত নীতিটি ব্যয়বহুল প্রমাণিত হয়েছে। নিউ ইয়র্ক পোস্ট পত্রিকা গত এক দশকে CDPAP জালিয়াতির সাথে যুক্ত অন্তত ১৭৯ মিলিয়ন ডলারের চুরি হওয়া মেডিকেড তহবিলের সন্ধান পেয়েছে, পাশাপাশি মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে প্রায় কোনো রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই ১ বিলিয়ন ডলার করদাতার অর্থ অপচয় হওয়ার তথ্যও পেয়েছে।
আইনজীবী রিচার্ড হ্যারো বলেন, “CDPAP হলো সবচেয়ে বড় জালিয়াতি, কারণ এর সবকিছু মানুষের বাড়িতেই ঘটে।”
জালিয়াতির সংখ্যাগুলো তার বক্তব্যকে সমর্থন করে। নিউ ইয়র্ক ষ্টেট ডিপার্টমেন্ট অফ হেলথ এর রেকর্ড অনুযায়ী, CDPAP-এর ব্যয় ২০১৯ সালে ২.৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে ৯.১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। সেই সময়ে, এই সিডিপ্যাপ প্রোগ্রামটি ২,৫০,০০০ সুবিধাভোগীকে অন্তর্ভুক্ত করেছিল এবং সমগ্র নিউ ইয়র্ক ষ্টেট জুড়ে ৪,০০,০০০ পরিচর্যাকারীকে (কেয়ারগিভার)নিয়োগ করেছিল।
এমনকি নিউ ইয়র্ক ষ্টেটের নিজস্ব কর্মকর্তারাই বিপদ সংকেত দিয়েছেন। নিউ ইয়র্ক ষ্টেট ডিপার্টমেন্ট অফ হেলথ এই প্রোগ্রামটিকে একটি “আর্থিক সংকট” বলে অভিহিত করেছে, যখন গভর্নর ক্যাথি হোকুল ২০২৪ সালে এটিকে প্রকাশ্যে “নিউ ইয়র্কের ইতিহাসের সবচেয়ে অপব্যবহৃত প্রোগ্রামগুলোর মধ্যে একটি” হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।
ব্যয় নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা সেক্রটারী রবার্ট এফ. কেনেডি জুনিয়রের মতে, নিউ ইয়র্ক ষ্টেটের সিডিপ্যাপ কর্মসূচির ব্যয় বাড়তেই থাকে এবং ২০২৫ সালে তা ১২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়।
গত কয়েক বছরে নিউ ইয়র্কের হোম কেয়ার এবং প্রাপ্তবয়স্ক ডে-কেয়ার শিল্পের সাথে যুক্ত বড় ধরনের একাধিক জালিয়াতির ঘটনা ধারাবাহিকভাবে সামনে এসেছে।
নিউ ইয়র্ক পোস্ট পত্রিকার অপর একটি প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৫ সালে ব্রুকলিনের ব্যবসায়ী জাকিয়া খান ৬৮ মিলিয়ন ডলারের একটি জালিয়াতি চক্র চালানোর কথা স্বীকার করেন, যেখানে তার কেন্দ্রগুলো যে পরিষেবা কখনও দেয়নি, সেগুলোর জন্য মেডিকেডের কাছে বিল করা হয়েছিল। দুই বছর আগে, ব্রুকলিনের আরেক নির্বাহী, মারিয়ানা লেভিন, ১০০ মিলিয়ন ডলারের হোম হেলথ কেয়ার কেলেঙ্কারির জন্য চার বছরের বেশি কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। এবং ২০১৯ সালে, নিউ ইয়র্ক ষ্টেটের প্রসিকিউটররা হোপেটন কেয়ারের সিইও ফারাহ রুবানির বিরুদ্ধে মিথ্যা মেডিকেড দাবির মাধ্যমে ১১ মিলিয়ন ডলার চুরির অভিযোগ আনেন — যে অর্থ দিয়ে বিলাসবহুল গাড়ি এবং রিয়েল এস্টেট কেনা হয়েছিল বলে অভিযোগ উর্থাপন করা হয়। যদিও তিনি ফৌজদারিভাবে দোষী সাব্যস্ত হননি, আদালতের নথি অনুসারে রুবানি পরে ক্ষতিপূরণ বাবদ ১,৪৮,০০০ ডলার ফেরত দেন।
CDPAP-এ জালিয়াতি শুধু শীর্ষ পর্যায়ের সমস্যা নয়। নিউ ইয়র্ক ষ্টেটের তদন্তকারীরা বলছেন, কিছু পরিচর্যাকারী (কেঢারগিভার) —যাদের ঘণ্টাপ্রতি মজুরি ১৮.৬৫ থেকে ২০.৬৫ ডলার ছিল —এমন রোগীদের জন্য বিল করেছেন যারা ইতিমধ্যেই হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন, মারা গেছেন, অথবা এমনকি একাধিক রোগীর জন্য একই সময়ে কাজ করার বিলও করেছেন। একটি অভ্যন্তরীণ সূত্র দ্য নিউ ইয়র্ক পোস্টকে জানিয়েছে যে, কিছু ‘ব্যক্তিগত সহকারী’ পরিবারের সদস্যদের যত্ন নেওয়ার জন্য ২৩ ঘণ্টার কর্মদিবসের দাবি করেছেন এবং বছরে ২ লক্ষ ডলারেরও বেশি মজুরি হাতিয়ে নিয়েছেন।

তথাকথিত ‘আর্থিক মধ্যস্থতাকারী’, অর্থাৎ যে বেসরকারি সংস্থাগুলো সিডিপ্যাপ অংশগ্রহণকারীদের জন্য বেতন ও কাগজপত্র প্রক্রিয়াকরণের কাজ করে, তারাও তদন্তের আওতায় এসেছে। ২০২৩ সাল নাগাদ, ৬০০টিরও বেশি মধ্যস্থতাকারী (মিডলম্যান বা মার্কেটার) সম্মিলিতভাবে বছরে ১ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পারিশ্রমিক পাচ্ছিল, যাদের মধ্যে কেউ কেউ ন্যূনতম তদারকি প্রদান করেও প্রতি অংশগ্রহণকারীর কাছ থেকে মাসে ১,০০০ ডলার করে নিচ্ছিল।
নিউ ইয়র্ক ষ্টেট গভর্নর হোকুলের ২০২৩ সালের সংস্কার এই বিশৃঙ্খলা দূর করার জন্য শত শত মধ্যস্থতাকারীর পরিবর্তে একটি একক নিয়ন্ত্রক — জর্জিয়া-ভিত্তিক পাবলিক পার্টনারশিপস, এলএলসি (পিপিএল)-কে নিয়োগের উদ্যোগ নেন। মামলা এবং বিলম্বের কারণে জর্জরিত এই পরিবর্তনটি অবশেষে এপ্রিল ২০২৫ সালে কার্যকর হয়।
নিউ ইয়র্ক ষ্টেটের স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, এই পরিবর্তনের ফলে করদাতাদের ইতিমধ্যেই ১ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হয়েছে এবং প্রশাসনিক ব্যয় ৯০ শতাংশেরও বেশি কমেছে। নিউ ইয়র্ক ষ্টেটের কর্মকর্তারা বলেছেন, যে কাজের জন্য আগে ষ্টেটকে প্রতি অংশগ্রহণকারীর জন্য মাসে ১,০০০ ডলার খরচ করতে হতো, এখন তা প্রায় ৬৮.৫০ ডলারে নেমে এসেছে।
নিউ ইয়র্ক ষ্টেট ডিপার্টমেন্ট অফ হেলথ এর একজন মুখপাত্র দ্য নিউ ইয়র্ক পোস্টকে বলেছেন, “প্রতারকরা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই ত্রুটিপূর্ণ পুরোনো ব্যবস্থাটি টিকিয়ে রাখার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিল — কিন্তু সেই দিন শেষ, কারণ আমরা তাদের বন্ধ করে দিয়েছি।”