২রা অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ভার্জিনিয়ায় মাহফুজ আহমেদের বিলিয়ন ডলারের গল্প

নজরুল মিন্টো : সময়টা ১৯৮৯ সাল। ১৮ বছরের এক তরুণ পড়াশোনার উদ্দেশ্যে জন্মভূমি ছেড়ে পাড়ি জমালেন যুক্তরাষ্ট্রে। পেছনে পড়ে রইল পরিচিত শহর, পরিবার, বন্ধুবান্ধব আর বেড়ে ওঠার চেনা জগৎ। সামনে নতুন দেশ, নতুন শিক্ষাব্যবস্থা, নতুন সংস্কৃতি এবং নিজের জায়গা করে নেওয়ার কঠিন পরীক্ষা। ভবিষ্যতের কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। ছিল স্বপ্ন আর সেই স্বপ্নের পেছনে ছুটে চলার সাহস। শুরু হলো পড়াশোনা, পাশাপাশি কাজ। কখনো অর্থের টানাপোড়েন, কখনো নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার সংগ্রাম। এভাবেই একের পর এক ধাপ পেরিয়েছেন। সময়ের সঙ্গে স্বপ্নও বড় হয়েছে। তিন দশকের বেশি সময় পর ফিরে তাকালে তাঁর সেই যাত্রাকে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। যে তরুণ একদিন পড়াশোনার স্বপ্ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন, তিনিই একসময় গড়ে তুলেছেন বিলিয়ন ডলারের এক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। তাঁর সেই পথচলা অধ্যবসায়, সংগ্রাম আর সাফল্যের এক অনুপ্রেরণামূলক গল্প।

সেই তরুণের নাম মাহফুজ আহমেদ। জন্ম বাংলাদেশে। শিক্ষার্থী ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে এসে ভর্তি হন ভার্জিনিয়ার জর্জ মেসন ইউনিভার্সিটিতে। নতুন দেশে বিদেশি শিক্ষার্থীর জীবন খুব সহজ ছিল না। থাকার খরচ বাঁচাতে গ্রেট ফলসে মামার বাড়িতে থাকতেন। পড়াশোনার খরচের একটি অংশ দিতেন তাঁর মা, বাকি অর্থের জন্য আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকেও ধার করতে হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পাশাপাশি কাজ করেছেন ডাইনিং হল, মনোবিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগে। শ্রেণিকক্ষ আর বইয়ের বাইরেও তখন চলছিল নিজের খরচ সামলানো এবং নতুন পরিবেশে জায়গা করে নেওয়ার লড়াই।

জর্জ মেসন ইউনিভার্সিটি থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক হওয়ার পর মাহফুজ আহমেদ প্রযুক্তি খাতে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলেও পড়াশোনা করেছেন। নর্থরপ গ্রুম্যানে পরামর্শক এবং মবিল অয়েলে জ্যেষ্ঠ প্রযুক্তি ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তিনি বড় প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত প্রয়োজন এবং দক্ষ কর্মীর চাহিদা খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান। সেখানেই তাঁর চোখে পড়ে নতুন এক ব্যবসার সম্ভাবনা।

১৯৯৪ সালে সেই ভাবনা থেকেই প্রতিষ্ঠা করেন Digital Intelligence Systems, সংক্ষেপে DISYS। কোনো ঝকঝকে অফিসে নয়, উত্তর ভার্জিনিয়ার একটি বাড়ির বেসমেন্টে শুরু হয় প্রতিষ্ঠানের কাজ। মাহফুজের বয়স তখন মাত্র ২৩ বছরের কাছাকাছি। দিনের চাকরি শেষ করে রাতে নিজের প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করতেন। সপ্তাহান্তও কাটত ব্যবসার পরিকল্পনা, গ্রাহক খোঁজা আর কাজের পেছনে। প্রথম দুই বছর ব্যবসা থেকে নিজেদের জন্য কোনো অর্থ নেননি। যা আয় হতো, আবার ব্যবসাতেই বিনিয়োগ করতেন। কখনো দিনে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করেছেন। আজকের Dexian-এর বিশাল পরিসরের পাশে সেই বেসমেন্টের শুরুর ছবিটি রাখলে বোঝা যায়, বড় প্রতিষ্ঠানের যাত্রা সব সময় বড় জায়গা থেকে শুরু হয় না।

পরে মাহফুজের ভাই মারুফ আহমেদও এই যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গী হয়ে ওঠেন। মারুফ নিজেও প্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তা ছিলেন। তাঁর সহপ্রতিষ্ঠিত তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী সরবরাহ ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটি ১৯৯৯ সালে DISYS-এর সঙ্গে একীভূত হলে তিনি অংশীদার ও প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। এরপর দুই ভাই একসঙ্গেই প্রতিষ্ঠানটিকে বড় করার কাজে এগিয়ে যান।

নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে বিশ্বজুড়ে শুরু হয় Y2K নিয়ে উদ্বেগ। আশঙ্কা ছিল, ২০০০ সাল শুরু হলে পুরোনো কম্পিউটার ব্যবস্থায় তারিখসংক্রান্ত সমস্যা দেখা দিতে পারে। বড় বড় প্রতিষ্ঠান তাই তাদের কম্পিউটার ব্যবস্থা পরীক্ষা ও হালনাগাদ করতে শুরু করে। বেড়ে যায় দক্ষ তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী ও প্রযুক্তিসেবার চাহিদা। এই সময়ই DISYS বড় গ্রাহক পেতে শুরু করে এবং ব্যবসার গতিও বদলে যেতে থাকে।

এরপর ব্যবসার পরিধি বাড়তে থাকে। ২০০৫ সালে DISYS যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে সম্প্রসারণ শুরু করে এবং ২০০৮ সালে পা রাখে আন্তর্জাতিক বাজারে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কর্মী সরবরাহের পাশাপাশি পরামর্শ ও প্রযুক্তি সমাধানের কাজও বাড়তে থাকে। একটি গ্রাহক থেকে আরেকটি গ্রাহক, একটি শহর থেকে আরেকটি শহর, তারপর এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম।

আরেকটি বড় পরিবর্তন আসে ২০২১ সালে। DISYS অধিগ্রহণ করে ফ্লোরিডাভিত্তিক তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান Signature Consultants। দুই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এক হওয়ার পর ২০২৩ সালে নতুন নাম হয় Dexian। তত দিনে উত্তর ভার্জিনিয়ার একটি বেসমেন্ট থেকে শুরু হওয়া ছোট্ট প্রতিষ্ঠানটি কর্মী ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিসেবা খাতের একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

Virginia Business-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে Dexian-এর রাজস্ব ছিল ১.১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশ্বের প্রায় ৭০টি স্থানে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ১২ হাজার কর্মী কাজ করছিলেন। একই রাজস্বের হিসাবে Washington Business Journal-এর ওয়াশিংটন ডিসি অঞ্চলের সংখ্যালঘু মালিকানাধীন ৬০টি বৃহত্তম প্রতিষ্ঠানের তালিকায় Dexian শীর্ষে ছিল। বর্তমানে উত্তর ও লাতিন আমেরিকা, ইউরোপ, ভারত এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম রয়েছে। তাদের গ্রাহকদের মধ্যে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম কোম্পানিগুলোর বার্ষিক Fortune 500 তালিকায় স্থান পাওয়া বহু প্রতিষ্ঠান।

প্রতিষ্ঠান বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুই ভাইয়ের দায়িত্বও বদলেছে। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে মাহফুজ প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব ভাই মারুফ আহমেদের হাতে তুলে দেন। এর আগে মারুফ প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট ও প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা ছিলেন। মাহফুজ দায়িত্ব নেন পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে। প্রায় তিন দশক ধরে গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন পরিচালনা ভাইয়ের হাতে ছেড়ে দিয়ে তিনি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের সঙ্গে যুক্ত থাকেন।

সাফল্যের স্বীকৃতিও এসেছে। ২০১৩ সালে মাহফুজ আহমেদ গ্রেটার ওয়াশিংটন অঞ্চলে Ernst & Young-এর Entrepreneur of the Year পুরস্কার পান। যে জর্জ মেসন ইউনিভার্সিটিতে তাঁর আমেরিকার ছাত্রজীবন শুরু হয়েছিল, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল ও কম্পিউটিং কলেজে ২০২২ সালে তিনি ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার দান করেন। পরের বছর বিশ্ববিদ্যালয় মাহফুজ ও মারুফ দুই ভাইকে তাঁদের সাফল্য ও অবদানের জন্য সম্মান জানায়।

সেই সম্মাননার সঙ্গে জড়িয়ে আছে দুই ভাইয়ের শুরুর দিনের একটি মজার স্মৃতিও। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় মারুফ মাঠ ও প্রাঙ্গণ পরিচর্যার কাজ করতেন। Fenwick Library-এর সামনে গার্বেজ বিন পরিষ্কার করাও ছিল তাঁর কাজের অংশ। বহু বছর পর সফল উদ্যোক্তা হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে দুই ভাই নিজেদের নামে কোনো জমকালো স্থাপনা চাননি। বরং চেয়েছিলেন, লাইব্রেরির কাছের একটি গার্বেজ বিন তাঁদের নামে উৎসর্গ করা হোক। শুনতে রসিকতা মনে হলেও এর মধ্যে ছিল অতীতকে মনে রাখার এক সুন্দর বার্তা। সাফল্যের এতটা পথ পেরিয়েও তাঁরা ভুলে যাননি কোথা থেকে তাঁদের যাত্রা শুরু হয়েছিল।

তথ্যসূত্র: George Mason University, Virginia Business, Dexian, Washington Business Journal এবং Ernst & Young নজরুল মিন্টো টরন্টো থেকে প্রকাশিত দেশেবিদেশে পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক ।