নুরুল্লাহ সাইদ : যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশটির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যও আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। বিভিন্ন শহর ও শহরতলিতে নতুন মসজিদ, ইসলামিক স্কুল, হিন্দু মন্দির ও ধর্মীয় কমিউনিটি সেন্টার গড়ে উঠছে। অনেক ক্ষেত্রে নতুন ভবন নির্মাণের পরিবর্তে পুরোনো চার্চ, বাড়ি, অফিস কিংবা বাণিজ্যিক ভবন কিনে সেগুলোকে উপাসনালয় ও কমিউনিটি ব্যবহারের উপযোগী করা হচ্ছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে অভিবাসনের ভূমিকা স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের আদমশুমারি ব্যুরোর সর্বশেষ বিস্তারিত হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিদেশে জন্ম নেওয়া মানুষের সংখ্যা ছিল ৪ কোটি ৬২ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০১০ সালে এই সংখ্যা ছিল ৪ কোটি। অর্থাৎ এক দশকে বিদেশে জন্ম নেওয়া জনসংখ্যা ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে।
ধর্মীয় পরিচয়ের ক্ষেত্রেও অভিবাসীদের মধ্যে বৈচিত্র্য তুলনামূলক বেশি। পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৩-২৪ সালের ধর্মীয় চিত্রবিষয়ক গবেষণা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম না নেওয়া প্রাপ্তবয়স্কদের ১৪ শতাংশ খ্রিস্টান ছাড়া অন্য কোনো ধর্মের অনুসারী। তাদের মধ্যে প্রায় ৪ শতাংশ মুসলিম, ৪ শতাংশ হিন্দু এবং ৩ শতাংশ বৌদ্ধ।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের একই গবেষণা বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম জনগোষ্ঠীর ৫৯ শতাংশ এবং হিন্দু জনগোষ্ঠীর ৭৭ শতাংশ বিদেশে জন্মগ্রহণকারী। ফলে নতুন অভিবাসী পরিবারগুলোর সঙ্গে দেশটির ধর্মীয় বৈচিত্র্যের সম্পর্কটি জনসংখ্যার পরিসংখ্যানেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মসজিদের ক্ষেত্রেও গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য বিস্তার দেখা গেছে। সর্বশেষ বড় আকারের জাতীয় মসজিদ জরিপের ২০২০ সালের হিসাবে, যুক্তরাষ্ট্রে ২ হাজার ৭৬৯টি মসজিদ শনাক্ত করা হয়েছিল। ২০১০ সালে এই সংখ্যা ছিল ২ হাজার ১০৬টি। অর্থাৎ এক দশকে মসজিদের সংখ্যা ৩১ শতাংশ বেড়েছিল।
তবে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এর চেয়ে নতুন কোনো সমমানের পূর্ণাঙ্গ জাতীয় মসজিদ জরিপ প্রকাশিত হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই ২ হাজার ৭৬৯ সংখ্যাটিকে বর্তমানের নিশ্চিত সংখ্যা হিসেবে নয়, সর্বশেষ বড় জাতীয় জরিপের সংখ্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মসজিদ এখন শুধু নামাজের স্থান হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকছে না। অনেক ইসলামিক সেন্টারের সঙ্গে শিশুদের ইসলামিক শিক্ষা, কোরআন শিক্ষা, ইসলামিক স্কুল, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, সামাজিক সহায়তা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড যুক্ত হচ্ছে। বিশেষ করে নতুন অভিবাসী পরিবারগুলোর জন্য এসব প্রতিষ্ঠান ধর্মীয় জীবনের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ ও কমিউনিটির সঙ্গে যুক্ত থাকার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠছে।
মন্দিরের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে হিন্দু মন্দিরের কোনো একক সরকারি জাতীয় তালিকা নেই। তবে ২০২৬ সালের একটি হিন্দু মন্দিরভিত্তিক তথ্যভান্ডারে দেশটির ৫০টি অঙ্গরাজ্যে ১ হাজার ২৫৬টি মন্দিরের তালিকা রয়েছে। এটি সরকারি গণনা নয়, বরং একটি বেসরকারি তথ্যভান্ডার। ফলে এই সংখ্যাকে বর্তমান মন্দিরের আনুষ্ঠানিক জাতীয় সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
হিন্দু মন্দিরগুলোও অনেক ক্ষেত্রে শুধু পূজার স্থান নয়। ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পাশাপাশি শিশুদের শিক্ষা, ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চা, সংগীত, নৃত্য এবং বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ফলে মন্দিরগুলো অভিবাসী পরিবারগুলোর কাছে ধর্মীয় পরিচয়ের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রাখার কেন্দ্র হিসেবেও ভূমিকা রাখছে।
পুরোনো ভবনকে নতুন ধর্মীয় কাজে ব্যবহার করার প্রবণতাও এই পরিবর্তনের একটি দৃশ্যমান দিক। কোনো এলাকায় নতুন অভিবাসী কমিউনিটি গড়ে উঠলে তারা অনেক সময় নতুন করে জমি কিনে ভবন নির্মাণের পরিবর্তে আগে থেকেই থাকা চার্চ, বাড়ি, অফিস বা অন্য কোনো স্থাপনা কিনে সেটিকে মসজিদ, মন্দির কিংবা কমিউনিটি সেন্টারে রূপান্তর করে। এতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান যেমন গড়ে ওঠে, তেমনি পুরোনো ভবনও নতুন কমিউনিটির সামাজিক জীবনের অংশ হয়ে যায়।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের আরেকটি বিশ্লেষণ বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী অভিবাসীদের মধ্যে ৮৭ শতাংশ কোনো না কোনো ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত। তাদের মধ্যে ৭০ শতাংশ খ্রিস্টান। মুসলিম, হিন্দু ও বৌদ্ধসহ অন্যান্য ধর্মের অনুসারীরাও অভিবাসী জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ।
সামগ্রিক জনসংখ্যার চিত্রেও পরিবর্তনটি ধরা পড়ছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৩-২৪ সালের জরিপে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ৭ দশমিক ১ শতাংশ খ্রিস্টান ছাড়া অন্য কোনো ধর্মের পরিচয় দিয়েছেন। ২০০৭ সালে এই হার ছিল ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। নতুন জরিপে মুসলিম ১ দশমিক ২ শতাংশ এবং হিন্দু ০ দশমিক ৯ শতাংশ।
তবে এই পরিবর্তনকে শুধু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। এটি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন, জনসংখ্যার পরিবর্তন এবং বহুসাংস্কৃতিক সমাজের বিকাশের সঙ্গে যুক্ত একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। নতুন প্রজন্মের অভিবাসী পরিবারগুলো যেমন আমেরিকান সমাজের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করছে, তেমনি নিজেদের ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির পরিচয়ও ধরে রাখছে।
ফলে আমেরিকার অনেক শহরের দৃশ্যপটে এখন পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে পুরোনো চার্চ, নতুন মসজিদ, ইসলামিক স্কুল, হিন্দু মন্দির এবং বিভিন্ন ধর্মীয় কমিউনিটি সেন্টার। অভিবাসনের ধারাবাহিকতার সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানও যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের আরও দৃশ্যমান অংশ হয়ে উঠছে।
ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং অভিবাসনের ধারাবাহিক প্রভাব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মীয় মানচিত্র যে আগের তুলনায় আরও বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠছে, মসজিদ, মন্দির ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিস্তার তারই দৃশ্যমান প্রতিফলন। – ওয়েব পোর্টাল আমেরিকা বাংলা -র সৌজন্যে














