দীর্ঘ ২০ বছরের আইনি লড়াই শেষে নিউইয়র্ক সিটির ট্যাক্সি, লিভারি, ব্ল্যাক কার, উবার ও লিফটসহ টিএলসি (Taxi and Limousine Commission) লাইসেন্সধারী চালকদের জন্য এসেছে বড় সুখবর। যুক্তরাষ্ট্রের সেকেন্ড সার্কিট কোর্ট অব আপিলস প্রায় ১৯ হাজার ৫০০ চালকের জন্য সর্বোচ্চ ১৪০ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ চুক্তির অনুমোদন দিয়েছে। এই রায়কে নিউইয়র্ক সিটির ইতিহাসে ‘ডিউ প্রসেস’ বা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া সংক্রান্ত সবচেয়ে বড় সমঝোতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন আদালত।
গত ৩০ জুন বিচারপতি রিচার্ড জে. সুলিভান এই সমঝোতা অনুমোদন করেন। আদালতের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি শুধু নিউইয়র্ক নয়, যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ সাংবিধানিক অধিকার-সংক্রান্ত ক্ষতিপূরণ চুক্তি।
কেন এই মামলা?
মামলার মূল অভিযোগ ছিল, কোনো চালক গ্রেফতার হলেই—দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই—নিউইয়র্ক সিটির টিএলসি তার লাইসেন্স স্থগিত করে দিত। অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগ পরে খারিজ হয়ে যেত বা মামলার গুরুত্ব কমে যেত। কিন্তু ততদিনে চালকরা কাজ হারাতেন, আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যেত এবং পরিবারের ওপর নেমে আসত চরম আর্থিক সংকট।
চালকদের অভিযোগ ছিল, লাইসেন্স স্থগিতের আগে বা পরে তাদের ন্যায্য শুনানির সুযোগ দেওয়া হতো না। অর্থাৎ, আদালতের রায়ের আগেই তাদের কার্যত দোষী হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
২০০৬ সালে শুরু, ২০২৫-এ বড় জয়
এই মামলার সূচনা হয় ২০০৬ সালে। ম্যানহাটনের আইনজীবী ড্যানিয়েল অ্যাকম্যান প্রথম মামলাটি দায়ের করেন। তিনি বলেন, “কোনো মামলা এত দীর্ঘ হওয়া উচিত নয় যে সেটি কলেজে পড়ার বয়সে পৌঁছে যায়। কিন্তু এই মামলায় সেটাই হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, বছরের পর বছর টিএলসি এমন একটি নীতি অনুসরণ করেছে, যা অসাংবিধানিক বলে তারা শুরু থেকেই দাবি করে আসছিলেন। একজন চালকের লড়াই থেকে হাজারো মানুষের ন্যায়বিচার
মামলার প্রথম বাদী ছিলেন কুইন্সের ট্যাক্সিচালক জনাথন নেবে। ১৯৯২ সাল থেকে তিনি ট্যাক্সি চালাতেন। একদিন দুই যাত্রী ভাড়া না দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার পর উল্টো তার বিরুদ্ধেই অভিযোগ করা হয়। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই তার লাইসেন্স স্থগিত করা হয়।
পরবর্তীতে জানা যায়, এমন ঘটনার শিকার শুধু তিনি নন; একই ধরনের পরিস্থিতিতে হাজার হাজার চালকের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে। কারা ক্ষতিপূরণ পাবেন?
আদালতের অনুমোদিত সমঝোতা অনুযায়ী, ২০০৩ সালের ২৮ জুন থেকে ২০২০ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে যেসব টিএলসি লাইসেন্সধারী চালকের লাইসেন্স গ্রেফতারের কারণে স্থগিত করা হয়েছিল, তারা এই ক্ষতিপূরণের আওতায় আসবেন। ক্ষতিপূরণের পরিমাণ সবার জন্য এক হবে না। কার লাইসেন্স কতদিন স্থগিত ছিল এবং তিনি ক্ষতিপূরণের শুনানির আবেদন করেছিলেন কি না—এসব বিষয় বিবেচনায় অর্থ নির্ধারণ করা হবে।
কিছু চালক সর্বোচ্চ ৩৬ হাজার ডলার পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন। আর মামলার নামভুক্ত মূল বাদীরা অতিরিক্ত ১৫ হাজার ডলার পাবেন।আইনজীবীদের পারিশ্রমিক
১৪০ মিলিয়ন ডলারের এই তহবিলের ২৫ শতাংশ, অর্থাৎ ৩৫ মিলিয়ন ডলার, মামলায় বাদীপক্ষের আইনজীবীদের পারিশ্রমিক হিসেবে বরাদ্দ করা হয়েছে। যদিও নিউইয়র্ক সিটি এই অর্থ কমানোর আবেদন করেছিল, আদালত তা নাকচ করে দেন। টিএলসি কী বলছে?
নিউইয়র্ক সিটির টিএলসি জানিয়েছে, এই মামলার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা নীতিটি তারা অনেক আগেই বাতিল করেছে। ২০২০ সালে লাইসেন্স স্থগিতের পুরো প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা হয়েছে, যাতে চালকদের ন্যায্য শুনানি ও আইনি অধিকার নিশ্চিত করা যায়।
ট্যাক্সি ওয়ার্কার্স অ্যালায়েন্সের প্রতিক্রিয়া
নিউইয়র্ক ট্যাক্সি ওয়ার্কার্স অ্যালায়েন্সের নির্বাহী পরিচালক ভৈরবী দেশাই বলেন, “এটি শুধু একটি আইনি বিজয় নয়; এটি হাজারো চালকের মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের স্বীকৃতি। তবে প্রকৃত স্বস্তি তখনই আসবে, যখন ক্ষতিপূরণের চেক চালকদের হাতে পৌঁছাবে। হারিয়ে যাওয়া সময় বা ক্ষতির পূরণ কখনোই সম্ভব নয়, কিন্তু এই অর্থ অন্তত তাদের ভবিষ্যৎকে কিছুটা নিরাপদ করবে।”
দীর্ঘ দুই দশকের আইনি লড়াই শেষে এই রায়কে নিউইয়র্কের টিএলসি লাইসেন্সধারী চালকদের জন্য এক ঐতিহাসিক বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশি, দক্ষিণ এশীয় এবং অন্যান্য অভিবাসী চালকদের একটি বড় অংশ এই ক্ষতিপূরণের আওতায় আসতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।















