টাম্পায় অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার (ইউএসএফ) দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হত্যা মামলার আসামি হিশাম সালেহ আবু আবুগারবিয়েহর মৃত্যুদণ্ড চেয়ে আবেদন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ফ্লোরিডার স্টেট অ্যাটর্নির কার্যালয়। ফ্লোরিডা স্টেটের আইনে মৃত্যুদণ্ড চাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ‘অ্যাগ্রাভেটিং ফ্যাক্টর’ বা গুরুতর উপাদান পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে প্রসিকিউশন। ৮ই মে শুক্রবার ফ্লোরিডার স্থানীয় গণমাধ্যম টাম্পাবে২৮ এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে আসে এসব তথ্য।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণ গ্র্যান্ড জুরির সামনে উপস্থাপনের একদিন পর স্টেট অ্যাটর্নি সুজি লোপেজ এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। আসামি হিশাম আবুগারবিয়েহর বিরুদ্ধে সাতটি অভিযোগ আনা হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে—নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি ও জামিল আহমেদ লিমনকে পরিকল্পিতভাবে অস্ত্র ব্যবহার করে দুটি হত্যার অভিযোগ, সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট করার অভিযোগ, অনুমোদনহীনভাবে মরদেহ সরানো বা গোপন করার দুটি অভিযোগ এবং মৃত্যু গোপনের উদ্দেশ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা মেডিকেল পরীক্ষককে অবহিত না করার দুটি অভিযোগ। আগামী ১৮ মে স্থানীয় সময় সকাল ৯টায় হিলসবরো কাউন্টি আদালতে পরবর্তী শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।
গত ১৬.এপ্রিল নিখোঁজ হন ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বৃষ্টি ও লিমন। লিমনের দেহাবশেষ উদ্ধারের পর ২৪ এপ্রিল শনাক্ত করার কথা জানায় স্থানীয় পুলিশ। এরপর ২৬ এপ্রিল বৃষ্টির দেহাবশেষ পাওয়া গেলেও তা শনাক্ত করা হয় ৩০ এপ্রিল।
স্বীকারোক্তি না থাকলেও তথ্য-প্রমাণ শক্তিশালী : হিলসবরো কাউন্টিতে আট বছর প্রসিকিউটর হিসেবে কাজ করা আইনজীবী জ্যানি থমাস টাম্পাবে২৮কে বলেন, গ্র্যান্ড জুরির কাজ অভিযুক্ত দোষী কি না তা নির্ধারণ করা নয়, বরং অভিযোগ গঠনের মতো যথেষ্ট প্রমাণ আছে কি না তা যাচাই করা।
তিনি আরও বলেন, এই মামলায় প্রমাণগুলো অনেকটাই পরিস্থিতিভিত্তিক। মরদেহ ভিন্ন স্থানে পাওয়া গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার অনুসন্ধান, রুমমেটের সঙ্গে সম্পর্ক—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে স্বীকারোক্তি না থাকলেও প্রসিকিউশনের অবস্থানকে শক্তিশালী বলে মনে করেন তিনি।
থমাস বলেন, আবুগারবিয়েহকে গ্রেপ্তারের সময় পুলিশকে সোয়াট টিমের সহায়তা নিতে হয়েছিল। মূলত তাকে জোর করে ঘর থেকে বের করে আনতে হয়েছিল। প্রসিকিউটর হিসেবে আমি বলব—এটা তার অপরাধী মনোভাবের ইঙ্গিত।
তবে মামলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের বিষয় থাকায় বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন থমাস। তিনি বলেন, ‘এসব তথ্য সংগ্রহে সমন জারি করতেও দীর্ঘ সময় লাগে।’
তার মতে, যদি পরিবার দ্রুত বিচার বলতে দ্রুত সাজা কার্যকর বোঝায়, তাহলে মৃত্যুদণ্ডের চেয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মামলা দ্রুত শেষ হয়। কারণ ফ্লোরিডার আইন অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ডের মামলায় রায়ের পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপিলের সুযোগ থাকে। যার ফলে চূড়ান্ত সাজা কার্যকর হতে ১০ বছর বা তার বেশি সময় লেগে যেতে পারে।
মাদারীপুর নিজ বাড়ির পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত বৃষ্টি : ফ্লোরিডায় নিহত বাংলাদেশি পিএইচডি গবেষক নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে। ৯ই মে শনিবার সন্ধ্যায় মাদারীপুর সদরের খোয়াজপুর ইউনিয়নের চরগোবিন্দপুর গ্রামে তার মরদেহ সমাহিত করা হয়। এর আগে আজ সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে এমিরেটস এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে বৃষ্টির মরদেহ ঢাকায় পৌঁছায়।
বৃষ্টির পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করে মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াদিয়া শাবাব বলেন, ‘বৃষ্টি উচ্চশিক্ষা শেষে দেশে ফিরে দেশের উন্নয়নে বড় অবদান রাখতে পারতেন। তাকে যে বা যারা হত্যা করেছে, তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতে বাংলাদেশ সরকার ও দূতাবাস মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। যেকোনো প্রয়োজনে প্রশাসন বৃষ্টির পরিবারের পাশে রয়েছে।’
৯ই মে শনিবার দুপুর ১২টায় বৃষ্টির গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, নিকটাত্মীয় ও প্রতিবেশীরা মরদেহ দেখার জন্য ভিড় করেছেন। দুপুর দেড়টার দিকে মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি বাড়িতে পৌঁছালে সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।
মেয়ের শোকে মা বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। বৃষ্টির চাচিকে জড়িয়ে ধরে তিনি আহাজারি করে বলছিলেন, ‘আমার কলিজার টুকরা আমাকে ছেড়ে কোথায় চলে গেল? এখন আমি কাকে নিয়ে থাকব? আমার বৃষ্টিকে তোমরা ফিরিয়ে দাও।’
বাদ আসর চরগোবিন্দপুর উত্তরকান্দি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বৃষ্টির জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর তারই পরিকল্পনা ও ভাইয়ের করা নকশায় নবনির্মিত বাড়ির পাশেই তাকে দাফন করা হয়।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে বৃষ্টির বাবা জহির উদ্দিন আকন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ঈদে গ্রামে এসে যেন সবাই একসঙ্গে থাকতে পারি, সেজন্য বৃষ্টির পছন্দের নকশায় বাড়িটি করেছিলাম। জুলাই মাসে দেশে এসে তার এই বাড়িটি উদ্বোধন করার কথা ছিল। কিন্তু আমার মা বাড়ি উদ্বোধন না করে পরপারে চলে গেল। এখন এই বাড়িতে আমি কীভাবে থাকব?’
তিনি জানান, বৃষ্টি সবসময় বলত, পিএইচডি শেষে দেশে ফিরে আসবে এবং কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে দেশের জন্য নতুন কিছু উদ্ভাবন করবে। এখন বৃষ্টির বাবার একটাই দাবি, হত্যাকারীর যেন সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হয়।
বৃষ্টির চাচাতো বোন তুলি আক্তার বলেন, ‘আমি একাদশ শ্রেণিতে পড়ি। আপুর মতো আমারও উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন ছিল। কিন্তু এই ঘটনার পর পরিবার আর আমাকে বাইরে পাঠাতে চাচ্ছে না। যদি এই হত্যাকাণ্ডের কঠিন বিচার না হয়, তবে শিক্ষার্থীরা বিদেশে গিয়ে পড়াশোনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। হত্যাকারীর ফাঁসি হওয়া উচিত।’
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি গত ১৬ এপ্রিল নিখোঁজ হন। পরে ২৪ এপ্রিল লিমনের এবং ২৬ এপ্রিল বৃষ্টির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। গত ৪ মে লিমনের মরদেহ দেশে এনে সমাহিত করা হয়েছে।














