উত্তর আমেরিকায় বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির অন্যতমবৃহৎ আন্তর্জাতিক আয়োজন ‘৩৫তম নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিকবাংলা বইমেলা ২০২৬’ অত্যন্ত উৎসবমুখর, প্রাণবন্ত ও বর্ণাঢ্যপরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে। গত ২২ মে (শুক্রবার) থেকে ২৫ মে(সোমবার) পর্যন্ত নিউ ইয়র্কের জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টসসেন্টারে (Jamaica Performing Arts Center) চার দিনব্যাপীপ্রবাসী বাঙালিদের এই প্রাণের মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হয়।এবারের মেলার মূল প্রতিপাদ্য ছিল- “যত বই তত প্রাণ’’। টানা দুই দিনের বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে প্রতিদিনমেলা প্রাঙ্গণে ছিল সর্বস্তরের মানুষের উপচে পড়া ভিড়।সমাপনী দিনে আকাশ মেঘমুক্ত হয়ে উজ্জ্বল রোদ ওঠায়দর্শনার্থীদের সমাগম ও বই বিক্রি কয়েকগুণ বেড়ে যায়, যাপ্রবাসের মাটিতে বাংলা সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগেরইবহিঃপ্রকাশ।প্রথম দিন (২২ মে, শুক্রবার): প্রাক-উদ্বোধন, স্মরণ ও বর্ণাঢ্যশুভ সূচনা মেলার প্রথম দিনটি ছিল আবেগ এবং ঐতিহ্যের এক অপূর্বমেলবন্ধন। বিকেল থেকেই নিউ ইয়র্কসহ দূর-দূরান্তের বিভিন্নঅঙ্গরাজ্য (যেমন: নিউজার্সি, কানেকটিকাট, ম্যাসাচুসেটস, ভার্জিনিয়া, পেনসিলভানিয়া, মেরিল্যান্ড, ফ্লোরিডা) থেকেবইপ্রেমী, লেখক, পাঠক ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা পরিবার-পরিজননিয়ে মেলা প্রাঙ্গণে জড়ো হতে থাকেন।

প্রাক-উদ্বোধনী ও জন্ম শতবর্ষে গুণীজন স্মরণ পর্ব
আজ দখিন দুয়ার খোলা: সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে জ্যামাইকাপারফর্মিং আর্টস সেন্টারের সামনের খোলা মাঠে ঐতিহ্যবাহীঢোলের বাদ্যের মাধ্যমে প্রাক-উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সূচনাহয়। বিশ্বজিত সাহার পরিকল্পনায় এবং মো. এহসান উদ্দিনেরসঞ্চালনায় কোনো প্রকার পূর্ব-ঘোষণা ছাড়াই সরাসরি শুরুহয় সমবেত সংগীত। মালবিকা চ্যাটার্জির নির্দেশনায় ‘সংগীতসাধনা’র শিক্ষার্থীরা সমবেত কণ্ঠে পরিবেশন করেন “আজিদখিন দুয়ার খোলা” এবং “বাউলা কে বানাইলো রে’’।সংগীতের এই আবহে পুরো প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে পড়ে বাংলাসংস্কৃতির শিকড় ও লোকঐতিহ্য।

বিনম্র নিবেদন ও মোমবাতি প্রজ্বলন: ‘আগুনের পরশমণি’রআবহসংগীতের সাথে স্মারকচিত্রে মোমবাতি প্রজ্বলন করেবাংলা ভাষা ও সাহিত্যের তিন মহান ব্যক্তিত্ব- মহাশ্বেতা দেবী, শামসুদ্দীন আবুল কালাম এবং তপন রায়চৌধুরী-এরজন্মশতবর্ষ উপলক্ষে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। মোমবাতিপ্রজ্বলন করেন ইমদাদুল হক মিলন, জিয়াউদ্দিন আহমেদ ওনজরুল ইসলাম। স্মৃতিচারণ ও পাঠ: ‘বিনম্র নিবেদন’ পর্বেরোকেয়া রফিক বেবী কথাসাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবীর রচনারঅংশবিশেষ এবং শহিদুল আলম সাচ্চু ইতিহাসবিদ তপনরায়চৌধুরীর ‘বাঙালনামা’ থেকে পাঠ করেন। এছাড়াশামসুদ্দীন আবুল কালাম স্মরণে সংগীত পরিবেশন করেনপাপি মনা ও তাঁর দল। নৃত্যানুষ্ঠান: চন্দ্রা ব্যানার্জিরপরিকল্পনা ও নির্দেশনায় ‘নৃত্যাঞ্জলি’র শিল্পীরা “আলোকেরএই ঝরনা ধারায়”, “হৃদয় আমার নাচেরে” এবং “বাগিচায়বুলবুলি তুই” গানের সঙ্গে মনোমুগ্ধকর নৃত্য পরিবেশনকরেন। বইমেলায় আহ্বান: অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে মহিতোষতালুকদার তাপস “নতুন বইয়ের ঘ্রাণ নিতে বইমেলায় যাবগো” স্লোগানে দর্শকদের সঙ্গে নিয়ে পুরো বইমেলা প্রাঙ্গণপ্রদক্ষিণ করেন, যা মেলায় এক প্রাণবন্ত ও উৎসবমুখরপরিবেশ সৃষ্টি করে। পাশাপাশি তিনি সমবেত কণ্ঠে“আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে” গানটির পরিবেশনায় নেতৃত্বদেন, যা পুরো আয়োজনকে আরও আবেগঘন ওউদ্দীপনাময় করে তোলে।

মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ও মঙ্গল প্রদীপ
প্রাক-উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ওসাংবাদিক ইমদাদুল হক মিলন ফিতা কেটে ৩৫তম নিউ ইয়র্কআন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণাকরেন। ৩৫ বছরের মাইলফলক: মেলার ৩৫ বছর পূর্তিকেস্মরণীয় করে রাখতে বইমেলা প্রাঙ্গণের মূল প্রবেশপথে বাংলাও ইংরেজি- দুই ভাষায় তুলে ধরা হয় নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিকবাংলা বইমেলার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। সেখানে ১৯৯২ সালথেকে ২০২৬ পর্যন্ত প্রতি বছরের উদ্বোধকদের নাম, ছবি ওপরিচিতি নান্দনিক বিন্যাসে প্রদর্শন করা হয়। বর্ণিল এইপ্রদর্শনী শুধু দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণই করেনি, বরং তিনদশকেরও বেশি সময় ধরে প্রবাসে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ওসংস্কৃতির ধারাবাহিক অভিযাত্রার এক ঐতিহাসিক দলিলহিসেবেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্বলন: প্রাক-উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এবং উদ্বোধকের ঘোষণার পর মিলনায়তনে দেশ-বিদেশেরখ্যাতনামা লেখক, বুদ্ধিজীবী, গবেষক, প্রকাশক ও গুণীজনসহমোট ৩৫ জন সম্মাননীয় অতিথি একসঙ্গে মেলার ‘মঙ্গলপ্রদীপ’ প্রজ্বলন করেন। এরপর আমন্ত্রিত অতিথি ওদর্শকবৃন্দ সমবেত কণ্ঠে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয়সংগীত পরিবেশন করেন। মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্বলনে উপস্থিতছিলেন কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন, অর্থনীতিবিদঅধ্যাপক রেহমান সোবহান, সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনকজাহান, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ফরিদুর রেজা সাগর, ড. দীপেনভট্টাচার্য, সিনিয়র সাংবাদিক তৌফিক ইমরোজ খালিদী, কবিসুবোধ সরকার, ফারুক মঈনউদ্দীন, জনপ্রিয় লেখক সাদাতহোসাইন, প্রকাশক মনিরুল হক, অধ্যাপক মোস্তফা সারওয়ার, জাফর আহমদ রাশেদ, গৌতম দত্ত, শামস আল মমীন, ফারুক আহমেদ, রোকেয়া হায়দার, ফেরদৌস সাজেদীন, খোরশেদুল ইসলাম, আশরাফ কায়সার, গোলাম ফারুকভূঁইয়া, রাজু আলাউদ্দিন, সৈয়দ জাকি হোসেন, বিরূপাক্ষপাল, নজরুল মিন্টু, আশরাফ আহমেদ, মহিতোষ তালুকদারতাপস, মেজবাহ উদ্দিন আহমদ, হুমায়ূন কবীর ঢালী, জহিরুল আবেদীন জুয়েল, জসিম উদ্দিন, সজল আহমেদ, রেদওয়ানুর রহমান জুয়েল, দীপংকর তালুকদার, রতন চন্দ্রপাল এবং নাহিদা আশরাফী প্রমুখ।
উদ্বোধনী আলোচনা ও আজীবন সম্মাননা
প্রধান অতিথির বক্তব্য: প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও চিন্তাবিদঅধ্যাপক রেহমান সোবহান প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন,“গত ৩৫ বছরে বাংলাদেশিরা আমেরিকায় একটি দৃশ্যমানজাতিগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে; আগামী ৩৫ বছরেবাংলাদেশিরা এদেশের সমাজ-সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশহয়ে উঠবে।” তিনি ১৯৭১ সালের স্মৃতিচারণ করে আজকেরপ্রজন্মের কাছে সঠিক ইতিহাসচর্চার মধ্য দিয়ে জাতীয়ইতিহাসের বহু বিতর্কিত বিষয়ে ঐকমত্যের প্রয়াস চালিয়েযাওয়ার আহ্বান জানান।
মুক্তধারা সুকৃতজ্ঞ সম্মাননা: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চিন্তা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যেঅসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অধ্যাপক রেহমানসোবহানকে ‘মুক্তধারা সুকৃতজ্ঞ সম্মাননা’ ও আজীবনসম্মাননা প্রদান করা হয়। বিশেষ সংলাপ: বিশিষ্টসমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহান বর্তমান বাংলাদেশেনতুন প্রজন্মের একটি অংশের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলেরপ্রতি সমর্থন জানানোর প্রবণতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশকরেন। রেহমান সোবহান ও রওনক জাহানের এই বিশেষসংলাপ পর্বটি সঞ্চালনা করেন বইমেলার আহ্বানকারী ড.নজরুল ইসলাম।

বিশ্বজিত সাহাকে নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন ও বিশেষসম্মাননা
মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও বিশ্বজিত সাহা-এরঐতিহাসিক অবদানকে সম্মান জানিয়ে প্রথম দিনেই একটিদীর্ঘ ও আবেগঘন প্রামাণ্যচিত্র (Documentary) প্রদর্শনকরা হয়। এতে দেখানো হয়, কীভাবে ১৯৯২ সালে সম্পূর্ণব্যক্তিগত উদ্যোগে, অত্যন্ত সীমিত পরিসরে তিনি নিউ ইয়র্কেএই বইমেলার বীজ বপন করেছিলেন। তাঁর এই দীর্ঘ ওনিরলস পথচলাকে সম্মান জানিয়ে অনুষ্ঠানে তাঁকে বিশেষসম্মাননা প্রদান করা হয় এবং উপস্থিত সকলে দাঁড়িয়েকরতালি দিয়ে তাঁকে অভিনন্দন জানান।
স্বরচিত কবিতা পাঠ ও সংগীত কবিতা পাঠ: মো. নজরুল ইসলামের সঞ্চালনায় আমন্ত্রিতকবিদের স্বরচিত কবিতা পাঠের আসরে কবিতা পাঠ করেন ববহোলম্যান, মোস্তফা সারওয়ার, সুবোধ সরকার, গৌতম দত্ত, শামস আল মমীন, কৌশিক সেন, জাফর আহমদ রাশেদ, দর্পণ কবীর, রুদ্র শংকর ও ফারুক আহমেদ। একলা গানেরদেশে: প্রথম দিনের শেষলগ্নে শাহ মাহবুবের পরিবেশনায়একক সংগীতানুষ্ঠান ‘একলা গানের দেশে’ অনুষ্ঠিত হয়।দ্বিতীয় দিন (২৩ মে, শনিবার): সাহিত্য আড্ডা, সেমিনার, বিতর্ক ও রবীন্দ্র-সন্ধ্যা সারাদিনের ঝড়-বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়া সত্ত্বেও দ্বিতীয় দিনেমেলা প্রাঙ্গণ ছিল সাহিত্যপ্রেমীদের পদচারণায় মুখরিত।
গদ্যের অন্দরমহল ও লেখক-পাঠক আড্ডা
দুপুরে উন্মুক্ত লালন প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় লেখক, পাঠক ওপ্রকাশকদের প্রাণবন্ত আড্ডা ‘গদ্যের অন্দরমহল’। ফারুকফয়সলের পরিচালনায় এতে অংশ নেন ইমদাদুল হক মিলন, ড. দীপেন ভট্টাচার্য, সাদাত হোসাইন, ফেরদৌস সাজেদীন, মোস্তফা সারওয়ার, বিরূপাক্ষ পাল, আশরাফ কায়সার ও রাজুআলাউদ্দিন। এ সময় জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক সাদাতহোসাইনের অটোগ্রাফ ও ছবি তোলার জন্য বৃষ্টির মধ্যেওপাঠকদের দীর্ঘ লাইন ছিল চোখে পড়ার মতো।
কাব্যের কোলাহল (স্বরচিত কবিতা পাঠ)
মূল মঞ্চে (মহাশ্বেতা দেবী মঞ্চ) দিমা নেফারতিতিরসঞ্চালনায় এবং এবিএম সালেহ উদ্দীনের ব্যবস্থাপনায় একবিশাল কবিতা পাঠের আসর বসে। এতে স্বরচিত কবিতাপাঠ করেন মোস্তফা সারওয়ার, রানু ফেরদৌস, ফিরোজহুমায়ুন, জুলি রহমান, জান্নাতুল ফেরদৌস, হুমায়ূন কবীরঢালী, মনিজা রহমান, সুরীত বড়ুয়া, ছন্দা বিনতে সুলতান, স্বপন বিশ্বাস, তাহমিনা খান, মোহাম্মদ মহিবুর রহমান, বিমল সরকার, শামছুন ফৌজিয়া, হুমায়ুন কবির, মাকসুদাআহমেদ, কুলসুম আক্তার সুমী, মো. শারফুল আলম, আরিআহমেদ অর্ণব, সোমা রোজারিও, এসরাত জাহান বর্ণা এবংএবিএম সালেহ উদ্দীন।
গুণীজন শ্রদ্ধাঞ্জলি, সেমিনার ও নতুন বইয়ের আলোচনা
জন্মশতবর্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি: শামসুদ্দীন আবুল কালাম, মহাশ্বেতাদেবী ও তপন রায়চৌধুরীকে নিয়ে বিশেষ আলোচনা করেনআবদুন নূর, সুবোধ সরকার ও নসরত শাহ আজাদ।সঞ্চালনা করেন অভীক সানোয়ার। একাত্তরের গণহত্যা ওমুক্তিযুদ্ধ সেমিনার: ‘একাত্তরের গণহত্যা, ইতিহাসেরদালিলিক সংরক্ষণ এবং মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অবদান’ শীর্ষকসেমিনারে আলোচনা করেন জিয়াউদ্দিন আহমেদ, ইমদাদুলহক মিলন ও রাজিয়া নাজমী। সঞ্চালনা করেন ওবায়েদুল্লাহমামুন। নতুন বই নিয়ে আলোচনা: লেখক ও কবিরা তাঁদেরসদ্য প্রকাশিত বই নিয়ে আলোচনা ও মতবিনিময় করেন।এতে অংশ নেন বদরুজ্জামান রুহেল, বনানী সিনহা, মৈত্রেয়ীদেবী, গোপন দাশ, মো. শারফুল আলম, এ মোহিত, মোহাম্মদমহিবুর রহমান, আহবাব চৌধুরী খোকন, মনিজা রহমান, মোহাম্মদ আজাদ ও আশরাফ আহমেদ।

‘কলম ও কৌতূহল’ সাহিত্য আলোচনা
পারমিতা হিমের প্রাণবন্ত ও রসাল সঞ্চালনায় সমকালীনলেখালেখি ও সাহিত্য ভাবনা নিয়ে বিশেষ মতবিনিময় সভাঅনুষ্ঠিত হয়। এতে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন সাদাতহোসাইন, দীপেন ভট্টাচার্য, কৌশিক সেন, আশরাফ কায়সারএবং রাজু আলাউদ্দিন।
জমজমাট বিতর্ক ও রবীন্দ্র-সন্ধ্যা
আকর্ষণীয় বিতর্ক: মূল মঞ্চে “প্রবাস জীবন–বাঙালিকেদিয়েছে বাণিজ্যিকতা, কেড়ে নিয়েছে আন্তরিকতা” শীর্ষক একচমৎকার বিতর্ক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। পক্ষে অংশ নেনকাবেরী মৈত্রেয়, শামীম রেজা ও মোহাম্মাদ নাকিবউদ্দীন(দলপতি) এবং বিপক্ষে অংশ নেন বাবু কামরুজ্জামান, নাজনীন আহমেদ ও বিরূপাক্ষ পাল (দলপতি) । সভাপতিছিলেন রোকেয়া হায়দার। বিপক্ষ দলের দলপতি বিরূপাক্ষপালের ক্ষুরধার ও বুদ্ধিদীপ্ত যুক্তি দর্শকদের ভরপুর আনন্দদেয়। অদিতি মহসিনের একক সংগীত: দ্বিতীয় দিনের রাতেরঅন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল প্রখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পীঅদিতি মহসিন-এর একক সংগীতানুষ্ঠান ‘সীমার মাঝেঅসীম’। তাঁর শুদ্ধ ও নান্দনিক পরিবেশনায় দর্শক-শ্রোতারারাত ১১টা পর্যন্ত মুগ্ধ হয়ে থাকেন।
তৃতীয় দিন (২৪ মে, রবিবার): নতুন প্রজন্মের উৎসব ওগৌরবময় পুরস্কার রজনী তৃতীয় দিনটি সাজানো হয়েছিল শিশু-কিশোরদেরসৃজনশীলতা এবং গুণীজনদের প্রাতিষ্ঠানিক পুরষ্কার প্রদানেরমধ্য দিয়ে।
চিত্রাঙ্কন ও বাংলা লিখন প্রতিযোগিতা সকাল থেকেই লালন প্রাঙ্গণে শিশু-কিশোর-যুবদের উপচেপড়া ভিড় ছিল। বাংলা ভাষা, একুশে ফেব্রুয়ারি, শহীদ মিনারএবং জাতীয় স্মৃতিসৌধকে কেন্দ্র করে আয়োজিত চিত্রাঙ্কন ওবাংলা লিখন প্রতিযোগিতায় বিপুল সংখ্যক নতুন প্রজন্মেরশিশু অংশ নেয়। নিরুপমা সাহার পরিচালনায় এবং শাহানাবেগম, সুপ্রিয়া দে চৌধুরীসহ অন্যান্যদের সহযোগিতায় এইসফল আয়োজন সম্পন্ন হয়।
কবিতার আঙিনায় (স্বরচিত কবিতা পাঠ)
কাজী নজরুল মঞ্চে এবিএম সালেহ উদ্দীনের সঞ্চালনা ওব্যবস্থাপনায় স্বরচিত কবিতা পাঠের আসরে অংশ নেন: শামসআল মমীন, হোসাইন কবির, বেনজির শিকদার, জেবুন্নেছাজোৎস্না, মুহাম্মদ আলী বাবুল, শারমিন রেজা ইভা, লায়লাফারজানা, সৈয়দ মামুনুর রশীদ, দিমা নেফারতিতি, কামরুজ্জামান বাচ্চু, নাহিদ ফেরদৌস, রেজাউল করিম টিটুল, সীমু আফরোজা, আলম সিদ্দিকী, সুমন শামসুদ্দিন, শাহআলম দুলাল, এইচ বি রিতা, বনানী সিনহা, মাসুম আহমদ, মিয়া এম আছকির, শ্যাম দাস বৈদ্য, রওনক আফরোজ, লতাচৌধুরী এবং কাজী এজাবুল খালিদ মিঠু।

নতুন বই নিয়ে আলোচনা ও সাহিত্য মতবিনিময়
সোহানা নাজনীনের সঞ্চালনায় নতুন বই নিয়ে পাঠকদেরসাথে মতবিনিময় করেন লায়লা ফারজানা, রেজাউল করিমটিটুল, রানু ফেরদৌস, মাহমুদ রেজা চৌধুরী, ইব্রাহীম চৌধুরীখোকন, এসরাত জাহান বর্ণা, সাঈদ তারেক, রাজিয়া নাজমীও বিমল সরকার সারথি। এছাড়া বন্যা মির্জার সঞ্চালনায়‘বাংলা সাহিত্যে সমকালীনতা’ শীর্ষক বিশেষ আলোচনায়অংশ নেন ফরিদুর রেজা সাগর, ইমদাদুল হক মিলন, ফারুকমঈনউদ্দীন ও মেজবাহ উদ্দিন আহমদ।
মুক্তধারা-জিএফবি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৬ ও প্রকাশনাপুরস্কার
মুক্তধারা-জিএফবি সাহিত্য পুরস্কার: মেলার অন্যতমমর্যাদাপূর্ণ এই পুরস্কার অর্জন করেন প্রখ্যাত ভাষাসৈনিক, মুক্তিযোদ্ধা ও ঔপন্যাসিক ড. আবদুন নূর। পুরস্কারের প্রবর্তকও ফাউন্ডেশনের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক গোলাম ফারুক ভূঁইয়াবিজয়ীর নাম ঘোষণা করেন। পুরস্কার হিসেবে তাঁর হাতে নগদ৩ হাজার মার্কিন ডলার, সম্মাননা ক্রেস্ট ও বিশেষ স্মারকতুলে দেওয়া হয়। প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, “অনেক সময়নিজের মানুষের কাছ থেকে স্বীকৃতি পাওয়া কঠিন হয়।আজকের এই সম্মান আমাকে গভীরভাবে আপ্লুত করেছে।”
চিত্ত রঞ্জন সাহা শ্রেষ্ঠ প্রকাশনা পুরস্কার: বাংলা প্রকাশনাশিল্পে অনন্য অবদানের জন্য এবছর শ্রেষ্ঠ প্রকাশনা সংস্থাহিসেবে এই সম্মানজনক পুরস্কার লাভ করে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান‘বাতিঘর’। মুক্তধারা স্মারক বক্তৃতা: ‘মুক্তধারা স্মারক বক্তা২০২৬’ হিসেবে একক বক্তৃতা প্রদান করেন কথাসাহিত্যিকইমদাদুল হক মিলন। এছাড়া জীবনানন্দ দাশের জীবন ওসাহিত্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেন ফারুকমঈনউদ্দীন।
চতুর্থ ও সমাপনী দিন (২৫ মে, সোমবার): কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিশেষ জোড় সংলাপ ও সমাপ্তি
সমাপনী দিনে নিউ ইয়র্কের আবহাওয়া ছিল অত্যন্ত মনোরম। টানা দুদিনের বৃষ্টির পর উজ্জ্বল রোদে মেলা প্রাঙ্গণে তিলধারণের ঠাঁই ছিল না এবং প্রকাশকদের স্টলগুলোতেব্যাপক বই বিক্রি হয়।
সৃজনশীলতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং তরুণদের ভাবনা
সমাপনী দিনের সবচেয়ে আধুনিক ও আলোচিত পর্ব ছিল“সৃজনশীলতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)” শীর্ষকঅনুষ্ঠান। রাব্বানী ভূঁইয়ার সঞ্চালনায় শতাধিক টিনএজার ওতরুণ এই সেশনে অংশ নিয়ে সাহিত্য, প্রযুক্তি, ভবিষ্যতেরশিক্ষা এবং মানব সৃজনশীলতার ওপর এআই-এর প্রভাবনিয়ে চমৎকার মতবিনিময় করে। বক্তারা উল্লেখ করেন যে, প্রযুক্তি যত বৈপ্লবিকই হোক না কেন, humanitarian বোধ ওনিজস্ব সাংস্কৃতিক শিকড় ধরে রাখাই হবে আগামী প্রজন্মেরসবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সেশনে অংশ নেয় দানিয়াল দর্পণসামি, মীম দে শ্রাবণী, প্রজ্ঞাত্তম সাহা প্রজ্ঞা, ফারজিন কবীরকাব্য, অদ্রিতা দে ও ধীরাজ সাহা।
সাদাত হোসাইনের সাথে বিশেষ মুখোমুখি কথোপকথন
‘তপন রায়চৌধুরী মঞ্চে’ (মূল মঞ্চ) বিকেলের অন্যতম প্রধানআকর্ষণ ছিল জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইনেরমুখোমুখি অনুষ্ঠান। মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের সিইও বিশ্বজিতসাহা-এর প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় এই বিশেষ সাহিত্য আড্ডায়দর্শকদের উপচে পড়া ভিড় ছিল। সাহিত্য, নতুন প্রজন্মেরপাঠাভ্যাস, সামাজিক পরিবর্তন, লেখকের ব্যক্তিগতঅভিজ্ঞতা এবং সৃজনশীলতার নানা দিক নিয়ে বিশ্বজিতসাহার ক্ষুরধার প্রশ্নের মুখোমুখি সংলাপে বসেন সাদাতহোসাইন। সরাসরি এই প্রশ্নোত্তর ও মতবিনিময় পর্বটি ছিলঅত্যন্ত প্রাণবন্ত।
সমাপনী দিনের সাহিত্য ও শিশু উৎসব
দিনভর লালন প্রাঙ্গণ ও তপন রায়চৌধুরী মঞ্চে ছোটদের গল্পলেখার বিশেষ কর্মশালা পরিচালনা করেন অতিথি লেখক ওশিশুসাহিত্যিক আশিক মুস্তাফা। এছাড়া রং-তুলিতেশিশু-কিশোর-যুব উৎসব, উত্তরাধিকার দুই প্রজন্ম (পণ্ডিতরামকানাই দাসের গান), উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীরসংগীতানুষ্ঠান এবং অধ্যাপক ড. মোস্তফা সারওয়ারের‘উচ্চশিক্ষার জন্য দিক-নির্দেশনা’ বিষয়ক আলোচনাঅনুষ্ঠিত হয়।

শিশু-কিশোর-যুবাদের উৎসব ও অংশগ্রহণকারীদেরতালিকা
বই, বাংলা ভাষা, শিল্পচর্চা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুনপ্রজন্মকে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যেই মেলার বিভিন্ন দিনে নানাসৃজনশীল প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছিল। এখানেদিনভিত্তিক অংশগ্রহণকারী শিশু-কিশোরদের তালিকাদেওয়া হলো: ২৩ মে (শনিবার): অনুভব চৌধুরি, আরোহীচৌধুরী, স্নেহা চৌধুরী, প্রীতম সিনহা কৃষ, প্রীতিশ সিনহা প্রেম, সত্যম আচার্য, দেবাপর্ণ আচার্য, শ্রেয়শ্রী গুন, সম্পূর্ণা গুনএবং ওম রায়। ২৪ মে (রবিবার): শুভশ্রী সাহা, রিদ্ধিমা সাহা, ওরিয়ন দেবনাথ, ঈশান বিশ্বাস, অবন্তী অথৈ, আদৃশা কুমার, অধরা অথি, তাসনিম ফারিয়া, মাহাথীর মোহাম্মদ, কৌশিকমন্ডল অংকুর, এিলোক, আরোশি বিশ্বাস, অবনি রায়, অভিকরায়, জয় শ্রী নিয়োগী, তাসনিম জামান আনিসা, ফাতিমাজামান ন্যান্সি, এিদিবা মল্লিক, প্রমিত চক্রবর্তী, রূপান্তিকা, প্রীতম দে, ভাষা সাহা, পূর্ণা দে, আযহার চৌধুরী এবং আসমা। ২৫ মে (সোমবার): ভাষা সাহা, পূর্ণা সাহা, রিদ্ধি, শ্রেষ্ঠা, হিয়া, পারোমিতা, ফিনিক্স, চার্ভি, রুপকথা, অহনা, অভয়া, প্রিয়ন্তি, কূহূ, অর্চিসমিতা, দেবলীনা, শ্রুতি, মৃম্ময়, ঐতিহ্য, অমিশা, রুকমীনি, উদিশা, প্রজ্ঞা ওম সাহা প্রজ্ঞা, ধীরাজ সাহা, অদ্রিতা দে, দানিয়াল দর্পন সামি, শ্রাবণী দেমীম, ফাসির কবীর কাব্য, সুধিষ্ণা সাহা, বাসুদেব রায়, অর্জুনদও, লিয়ানা মানহা, এল মানহা, দূর্গা ক্ষএিয়, দৃষিকাচৌধুরী, অর্জুন, শৌভিক, আদিত্য, অভিয়াংসু, আরাধ্য, শ্রুতি, পূর্ণা দে, রিক মুখার্জি, সুকন্যা শৈলি, শ্রেষ্ঠা প্রিয়দর্শিনী, দ্বিতীয়া ফেরদৌস, সারা রায় এবং চারুলতা।
প্রকাশকদের সন্তোষ ও সফল সমাপ্তি
মেলায় বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে আগত ২৬টি শীর্ষপ্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। ভিসা জটিলতা, দীর্ঘবিমানযাত্রা, বই পরিবহনের উচ্চ ব্যয় এবং আন্তর্জাতিকশিপমেন্টের নানা বাধা অতিক্রম করে প্রকাশকেরা নিউ ইয়র্কেপৌঁছান। কেউ কেউ অতিরিক্ত লাগেজে বই বহন করে নিয়েআসেন, আবার কেউ কেউ কয়েক মাস আগেই বই পাঠানোরব্যবস্থা করেন। রেকর্ড পরিমাণ বিক্রি: শেষ দিনেগবেষণামূলক বই, নতুন উপন্যাস, স্মৃতিকথা এবং শিশুতোষবইয়ের রেকর্ড পরিমাণ বিক্রি হয়েছে এবং অনেক স্টলে বইপ্রায় শেষ হয়ে যায়। প্রকাশকদের অনুভূতি: প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান‘অনন্যা’র প্রকাশক মনিরুল হক প্রথম দিনের পর শেষদিনেও আশাতীত উপস্থিতিতে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন,“নিউ ইয়র্ক বইমেলা শুধু একটি বইমেলা নয়, এটি প্রবাসীবাঙালির আত্মিক মিলনমেলা। এত দূরে এসেও পাঠকদের যেভালোবাসা পাই, সেটিই আমাদের নতুন করে কাজ করারঅনুপ্রেরণা দেয়।”
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও সমাপ্তি
অনুষ্ঠানের শেষলগ্নে সমবেত কণ্ঠে বাংলাদেশ ওআমেরিকার জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে ৩৫তমমেলার সফল সমাপ্তি ঘটে। মেলা কমিটির আহ্বায়ক ড. নজরুল ইসলাম, সহযোগী আহ্বায়ক ওবায়েদুল্লাহ মামুন, রাব্বানী ভূঁইয়া এবং চেয়ারপারসন ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদসংশ্লিষ্ট সকলকে, বিশেষ করে স্বেচ্ছাসেবকদের ও প্রবাসেরসংবাদমাধ্যমকে ধন্যবাদ জানান। মুক্তধারা ফাউন্ডেশনেরকর্ণধার বিশ্বজিত সাহা আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “দেখতেদেখতে ৩৫ বছর পার হয়ে গেল। নিউ ইয়র্ক বইমেলা আজশুধু একটি অনুষ্ঠান নয়- এটি প্রবাসী বাঙালির এক যৌবনেরঅহংকার।”
৩৬তম মেলার আগাম ঘোষণা
সমাপনী মঞ্চ থেকে আগামী বছরের মেলার তারিখ ঘোষণাকরা হয়। ২০২৭ সালের ৩৬তম নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিকবাংলা বইমেলা অনুষ্ঠিত হবে ২১ মে থেকে ২৪ মে পর্যন্ত।“যত বই তত প্রাণ”- এই চিরন্তন সত্যকে বুকে ধারণ করেসফলভাবে শেষ হলো প্রবাসের বুকে জেগে ওঠা এক টুকরোঅপরূপ বাংলাদেশের এই উৎসব।














