২৬শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

যুক্তরাষ্ট্র
জ্যাকারি উলফ

প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন বাতিলের ক্ষমতা নেই ট্রাম্পের

প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন বাতিলের ক্ষমতা নেই ট্রাম্পের

ওয়াশিংটনে রিপাবলিকানদের একক ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কা এবং জনসমর্থনের ঘাটতি নিয়ে উদ্বিগ্ন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে বারবার বিতর্কিত মন্তব্য করছেন। যদিও সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন বাতিল করার ক্ষমতা তার নেই, তবে নির্বাচন ব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তারের নানা উদ্যোগ নিচ্ছে তার প্রশাসন।

সিএনএনের এসএসআরএস পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, সব ইস্যুতেই ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা নিম্নমুখী। এ অবস্থায় তিনি একাধিকবার প্রকাশ্যে নির্বাচন না হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এ সপ্তাহে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প নির্বাচন বাতিলের কথা বলেন। তিনি দাবি করেন, রিপাবলিকানরা এতটাই সফল যে ‘নির্বাচনই করার দরকার নেই’।

তবে পরে হোয়াইট হাউস ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে রসিকতা বলে ব্যাখ্যা দেয়। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচন বাতিলের বিষয়ে ‘মজা করছিলেন’ এবং ‘ব্যঙ্গ করছিলেন’।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে এক অনুষ্ঠানে ইউক্রেনে সামরিক আইন জারির কারণে নির্বাচন না হওয়ার প্রসঙ্গ উঠে এলে ট্রাম্প বলেন, ‘যুদ্ধ চলাকালে নির্বাচন হয় না—তাহলে যদি সাড়ে তিন বছর পর আমরা কারও সঙ্গে যুদ্ধে জড়াই, তাহলে আর নির্বাচন হবে না? এটা তো ভালো।’

ট্রাম্পের এ মন্তব্য উপস্থিতদের হাসির খোরাক হলেও বিতর্ক সৃষ্টি করে। তবে ট্রাম্প প্রায়ই এমন মন্তব্য করেন, যা প্রথমে রসিকতা মনে হলেও পরে আর তেমন থাকে না। যেমন গ্রিনল্যান্ড কেনার প্রসঙ্গটি রসিকতা ছিল না।

ইতিহাস বলছে, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধকালেও নিয়মিত নির্বাচন আয়োজন করেছে। ইউক্রেনের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধকালীন সময়েও নির্বাচন করেছে। ১৮১২ সালে ব্রিটিশ আক্রমণের সময়, ১৮৬৪ সালে গৃহযুদ্ধের মধ্যেও এবং ২০ শতকে দুটি বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র নির্বাচন আয়োজন করেছে।

নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে ট্রাম্পের উদ্বেগ স্বাভাবিক। কারণ ইতিহাস বলছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল সাধারণত আসন হারায়। তাই আসন হারানোর আশঙ্কায় ট্রাম্প প্রশাসন দ্রুতগতিতে নীতিগত ও কাঠামোগত পরিবর্তন আনছে। মাত্র কয়েকটি আসন হারালেই প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যেতে পারে, ফলে বাজেট ও তদন্তের ক্ষমতা তাদের হাতে চলে যাবে।

সংবিধান অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ৩ জানুয়ারি নতুন কংগ্রেস শপথ নেবে। নির্বাচন বাতিল করার ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের নেই। কংগ্রেস চাইলে নির্বাচন দিনের তারিখ পরিবর্তন করতে পারে, তবে নির্বাচন বাতিল করতে পারে না। নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব রাজ্যগুলোর। বড় ধরনের দুর্যোগে কোনো রাজ্য নিজস্ব নির্বাচন স্থগিত করতে পারে, তবে তাত্ত্বিকভাবে এমন সুযোগ থাকলেও এর কোনো নজির নেই।

মার্কিন নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি ট্রাম্পের অবিশ্বাসের ইতিহাস পুরনো। ২০২০ সালের নির্বাচনের পর ভোটিং মেশিন জব্দ করতে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন না করায় তিনি আফসোস করেছেন বলে সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসকে জানান। এমনকি যেসব নির্বাচন তিনি জিতেছেন, সেগুলোকেও তিনি কারচুপির ফল বলে দাবি করেছেন। তবে ব্যাপক ভোট জালিয়াতির কোনো প্রমাণ আজও মেলেনি। অন্যদিকে, নির্বাচন কর্মকর্তারা সম্ভাব্য নানা ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে ভাবছেন।

দ্য আটলান্টিক আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অ্যারিজোনার সেক্রেটারি অব স্টেট অ্যাড্রিয়ান ফন্টেস বলেন, ‘আপনি নির্বাচন বাতিল করতে পারেন না। আমরা নানা পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি, যাতে কেউ কিছু বাতিল করতে বা অবৈধভাবে দখল করতে চাইলে আমরা আদালতের শরণাপন্ন হতে পারি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় গণতন্ত্র রক্ষা করতে পারি।’

তবে কী ধরনের পরিস্থিতির প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানাতে চাননি। নির্বাচন বাতিলের কল্পনা করলেও বাস্তবে ট্রাম্প নির্বাচন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছেন। এর কিছু প্রভাব হতে পারে সুদূরপ্রসারী।

ট্রাম্পের শুরু করা পুনর্নির্ধারণ বা রিডিস্ট্রিক্টিং যুদ্ধ এখনও চলমান। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে নির্বাচনি আসন পুনর্নির্ধারণের মাধ্যমে রিপাবলিকানরা নিজেদের পক্ষে আরও নয়টি অনুকূল আসন তৈরি করেছে। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা পেয়েছে ছয়টি আসন, যার বেশিরভাগই ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে।

রিপাবলিকানরা মনে করছে, ফ্লোরিডায় তাদের জন্য আরও আসন নিজেদের অনুকূলে নেওয়ার সুযোগ আছে। আর ডেমোক্র্যাটরা আগামী এপ্রিলে ভার্জিনিয়ায় নির্বাচনি আসন পুনর্নির্ধারণের বিষয়ে একটি ব্যালট উদ্যোগ (ভোটারদের সরাসরি সিদ্ধান্তের জন্য প্রস্তাব) নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।

সুপ্রিম কোর্ট যদি ভোটাধিকার আইন আরও দুর্বল করে, তবে রিপাবলিকানরা আরও অনেক রাজ্যে মানচিত্র পুনর্নির্ধারণ করতে পারবে। এর ফলে ভবিষ্যতে প্রতিনিধি পরিষদের চিত্র বদলে যেতে পারে। জাতিগত সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা না থাকলে বহু রাজ্যে সংখ্যালঘু দলের প্রতিনিধিত্ব কমে যেতে পারে। টেক্সাসে ডেমোক্র্যাট এবং ক্যালিফোর্নিয়ায় রিপাবলিকান আসন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে, যদিও উভয় রাজ্যেই দুই দলের লাখো সমর্থক রয়েছে।

ট্রাম্প চান রাজ্যগুলো কীভাবে নির্বাচন পরিচালনা করবে, সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়াতে। আদালতের বাধায় আপাতত অনেক উদ্যোগ থেমে গেলেও এটাই তার লক্ষ্য।

বৃহস্পতিবার একটি ফেডারেল আদালত ক্যালিফোর্নিয়ার পক্ষে রায় দিয়ে প্রশাসনের দাবি খারিজ করে দেন।
প্রশাসন রাজ্যের ২ কোটি ৩০ লাখ ভোটারের তথ্য হস্তান্তরের নির্দেশ চেয়েছিল।

সুপ্রিম কোর্ট এখন ডাকযোগে পাঠানো ব্যালট যদি নির্বাচনের দিনের আগে পোস্টমার্ক করা হলেও পরে পৌঁছায়, সেগুলো গণনায় ধরা হবে কি না, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। এই সিদ্ধান্ত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাপকভাবে চালু হওয়া মেইল-ইন ভোটিং ব্যবস্থার ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ট্রাম্প নিজে ডাকযোগে ভোট দিলেও, তিনি এই পদ্ধতির কড়া সমালোচক। তার নির্বাহী আদেশ রাজ্যগুলোর ভোটিং মেশিন ব্যবহারের প্রক্রিয়াও এলোমেলো করে দিতে পারে, যা ভোট গণনা মারাত্মকভাবে ধীর করে দিতে পারে।

ট্রাম্প প্রশাসন নির্বাচন তদারকিও ধীরে ধীরে দুর্বল করেছে। শুরুতেই সাইবারসিকিউরিটি অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার সিকিউরিটি এজেন্সির কার্যক্রম কমানো হয়। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সচিব ক্রিস্টি নোম রাজ্যগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময়ের একটি নেটওয়ার্কের তহবিল বাতিল করেন, যা সমন্বিত সাইবার হামলা প্রতিরোধে সহায়ক ছিল।

বিচার মন্ত্রণালয়ের সিভিল রাইটস ডিভিশনের কার্যক্রমও মূল লক্ষ্য থেকে সরিয়ে আনা হয়েছে। বর্তমানে তাদের একটি কাজ হলো ভোটার তালিকা ‘পরিষ্কার’ করতে রাজ্যগুলোকে সহায়তা করা, যদিও এক বিচারক সম্প্রতি এটিকে সিভিল রাইটস আইনের অপব্যবহার বলে রায় দিয়েছেন।

নভেম্বর পর্যন্ত এখনও অনেক সময় বাকি। এর মধ্যে নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে আরও নানা কৌশল নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আর ট্রাম্প যে মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে ইতোমধ্যেই গভীরভাবে ভাবছেন, তা স্পষ্ট। – সিএনএন