যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্ম নেওয়া শিশুদের নাগরিকত্ব সীমিত করার ট্রাম্পের দ্বিতীয় উদ্যোগে একজন ফেডারেল বিব প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের নীতি সীমিত করার নিমিত্ত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নতুন প্রচেষ্টাও আদালতের বাধার মুখে পড়েছে। মেরিল্যান্ডের ফেডারেল বিচারক ডেবোরা বোর্ডম্যান গত ২ সেপ্টেম্বর নতুন নির্বাহী আদেশটির বাস্তবায়ন ঠেকাতে প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। এর ফলে প্রশাসন আপাতত ওই আদেশের আওতায় থাকা শিশুদের নাগরিকত্ব অস্বীকার বা চ্যালেঞ্জ করার মতো পদক্ষেপ নিতে পারবে না।
এটি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আইনি ধাক্কা। কারণ একই বিষয়ে প্রশাসনের আগের উদ্যোগও আদালতে আটকে গিয়েছিল। গত জুনে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট আগের বিস্তৃত প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে রায় দেয়। এরপর ট্রাম্প প্রশাসন তুলনামূলকভাবে সীমিত একটি নতুন আদেশ তৈরি করে আগস্টে সেটি জারি করে।
নতুন আদেশটির লক্ষ্য ছিল বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের পরিধি সীমিত করা। হোয়াইট হাউসের প্রকাশিত নির্বাহী আদেশে বিদেশি সরকারের কিছু কর্মী, নির্দিষ্ট বিদেশি শত্রু হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের সন্তান এবং যুক্তরাষ্ট্রে বাণিজ্যিকভাবে জন্মের ব্যবস্থা করে নাগরিকত্ব অর্জনের চেষ্টা করা পরিবারের কথা বলা হয়েছে।
প্রশাসন এই নীতিকে মূলত নাগরিকত্বের অপব্যবহার রোধের পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। কিন্তু অভিবাসন অধিকার সংগঠনগুলো যুক্তি দিয়েছে, নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সংবিধান ও দীর্ঘদিনের আদালতের ব্যাখ্যা পরিবর্তন করা যায় না।
বিচারক বোর্ডম্যানের আদেশের গুরুত্ব এখানেই। তিনি শুধু প্রশাসনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি; বরং মামলাকারীদের সাংবিধানিক দাবির সম্ভাব্য শক্তির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। আদালতের মতে, সংশ্লিষ্ট শ্রেণির শিশুদের নাগরিকত্ব বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আগের সিদ্ধান্তগুলো গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের ভিত্তি চতুর্দশ সংশোধনীর নাগরিকত্ব ধারার সঙ্গে সম্পর্কিত। ১৮৬৮ সালে অনুমোদিত এই সংশোধনী যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব আইনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হয়। বহু দশক ধরে এর ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে জন্ম নেওয়া শিশুদের নাগরিকত্ব স্বীকৃত হয়েছে, কিছু ঐতিহাসিক ব্যতিক্রম ছাড়া।
ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন আদেশকে তাই শুধু অভিবাসন নীতি হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যায় না। এর সঙ্গে সাংবিধানিক ব্যাখ্যা, নির্বাহী ক্ষমতার সীমা এবং সুপ্রিম কোর্টের নজিরও সরাসরি যুক্ত।
এই মামলায় অভিবাসী পরিবারগুলোর উদ্বেগও সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া কোনো শিশুর বাবা-মা যদি বিদেশি নাগরিক হন, তাদের অভিবাসন অবস্থার ওপর ভিত্তি করে শিশুটির নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে কি না—এটাই বড় প্রশ্ন। নতুন আদেশের কারণে এমন পরিবারগুলো ভবিষ্যতে নথিপত্র, পাসপোর্ট এবং নাগরিকত্বের স্বীকৃতি নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে পারে বলে অধিকার সংগঠনগুলো আশঙ্কা করছে।
তবে আদালতের বর্তমান সিদ্ধান্ত চূড়ান্তভাবে পুরো আইনি বিতর্ক শেষ করেনি। এটি একটি প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞা। মূল মামলার শুনানি, পরবর্তী আদালতের সিদ্ধান্ত এবং শেষ পর্যন্ত আপিল প্রক্রিয়া—সবকিছু সামনে রয়েছে। প্রশাসন চাইলে উচ্চ আদালতে বিষয়টি নিয়ে যেতে পারে।
রাজনৈতিক দিক থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসন নিয়ন্ত্রণকে দ্বিতীয় মেয়াদের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক অগ্রাধিকার হিসেবে ধরে রেখেছে। জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নিয়ে অবস্থানটি তার সমর্থকদের কাছে জনপ্রিয় হলেও বিরোধীদের কাছে এটি সাংবিধানিক অধিকার সীমিত করার চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, অভিবাসন ইস্যুটি আরও রাজনৈতিক গুরুত্ব পেতে পারে। রিপাবলিকানরা সীমান্ত নিরাপত্তা ও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণকে নিজেদের রাজনৈতিক সাফল্যের অংশ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। ডেমোক্র্যাটরা আবার আদালতের রায় ও সাংবিধানিক অধিকারকে সামনে এনে প্রশাসনের নীতির বিরোধিতা করছে।
এদিকে এই আইনি লড়াইয়ের প্রভাব পাসপোর্ট নীতিতেও পড়তে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ইতিমধ্যে শিশুদের পাসপোর্ট আবেদনের সময় বাবা-মায়ের নাগরিকত্ব বা অভিবাসন অবস্থার প্রমাণ চাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নিয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত তাই ভবিষ্যৎ পাসপোর্ট প্রক্রিয়ার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
গত ৩ সেপ্টেম্বরের পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নীতি কার্যকরভাবে আটকে আছে। তবে এখানেই শেষ নয়। মামলাটি উচ্চ আদালতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব আইনের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও বড় সাংবিধানিক বিতর্ক তৈরি হতে পারে।













