৫ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আর্ন্তজাতিক

নারী অধিকার আন্দোলনের গ্লোরিয়া স্টেইনেম ৯২ বছর বয়সে চলে গেলেন, শোক আমেরিকা জুড়ে

নারী অধিকার আন্দোলনের গ্লোরিয়া স্টেইনেম ৯২ বছর বয়সে চলে গেলেন, শোক আমেরিকা জুড়ে

যুক্তরাষ্ট্রের নারী অধিকার আন্দোলনের অন্যতম প্রভাবশালী কণ্ঠ গ্লোরিয়া স্টেইনেমের মৃত্যুতে দীর্ঘ সংগ্রামের স্মৃতি ও উত্তরাধিকার নিয়ে শোক নেমেছে দেশজুড়ে গভীরভাবে। যুক্তরাষ্ট্রের নারী অধিকার আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ, লেখক ও কর্মী গ্লোরিয়া স্টেইনেম ৯২ বছর বয়সে মারা গত ৩রা সেপ্টেম্বর মারা গেছেন। তাঁর মৃত্যু যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান হিসেবে দেখা হচ্ছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, নিউইয়র্ক শহরে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি নারীর সমতা, প্রজনন অধিকার এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষে সক্রিয় ছিলেন।

গ্লোরিয়া স্টেইনেম শুধু একজন লেখক বা বক্তা ছিলেন না; তিনি যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক নারী অধিকার আন্দোলনের সবচেয়ে দৃশ্যমান নেতাদের একজন হয়ে উঠেছিলেন। ষাট ও সত্তরের দশকে যখন নারীদের কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা, পরিবার এবং রাজনীতিতে বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন জোরদার হচ্ছিল, তখন তাঁর লেখা ও বক্তৃতা লাখো মানুষের কাছে পৌঁছায়। তাঁর পরিচিত চেহারা, বড় চশমা এবং শান্ত কিন্তু দৃঢ় বক্তব্য তাঁকে মার্কিন নারী আন্দোলনের একটি প্রতীকে পরিণত করেছিল।

সাংবাদিকতা দিয়েই তাঁর পেশাগত জীবনের বড় অংশের সূচনা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তিনি সাংবাদিকতার প্রচলিত সীমার বাইরে গিয়ে সামাজিক পরিবর্তনের আন্দোলনে সরাসরি যুক্ত হন। নারীদের জীবনে বৈষম্য কীভাবে কাজ করে, কর্মক্ষেত্রে তাদের কী ধরনের বাধার মুখোমুখি হতে হয় এবং নিজেদের শরীর ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কেন গুরুত্বপূর্ণ—এসব প্রশ্নকে তিনি জনআলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসেন।

১৯৬০-এর দশক ও ১৯৭০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের অধিকার নিয়ে যে বৃহৎ সামাজিক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তার সঙ্গে স্টেইনেমের নাম গভীরভাবে যুক্ত। তিনি বিভিন্ন সংগঠন গড়ে তোলার কাজে অংশ নেন এবং রাজনৈতিকভাবে নারীদের আরও সক্রিয় করার চেষ্টা করেন। জাতীয় পর্যায়ে নারী রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।

গ্লোরিয়া স্টেইনেমের সাংবাদিকতার সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি ছিল তাঁর অনুসন্ধানী কাজ। তিনি এমন বিষয় নিয়ে লিখেছেন, যেগুলো সে সময় অনেক গণমাধ্যমে গুরুত্ব পেত না। কর্মক্ষেত্রে নারীদের অভিজ্ঞতা, যৌন বৈষম্য এবং সামাজিক প্রত্যাশার কারণে নারীদের জীবনে তৈরি হওয়া সীমাবদ্ধতা নিয়ে তাঁর লেখাগুলো ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। তাঁর কাজের মাধ্যমে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও বৃহত্তর সামাজিক কাঠামোর মধ্যে সম্পর্কটি সাধারণ পাঠকের সামনে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

নারীদের জন্য প্রকাশিত ‘মিস’ সাময়িকীর প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও তাঁর নাম জড়িত। এই প্রকাশনা নারীর অধিকার, রাজনীতি, কর্মক্ষেত্র, পরিবার ও সামাজিক বৈষম্য নিয়ে আলোচনা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছিল। প্রচলিত নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনের বাইরে গিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রশ্নকে নারীদের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে এটি বিশেষ ভূমিকা রাখে।

স্টেইনেমের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে সমর্থন যেমন ছিল, তেমনি বিরোধিতাও ছিল। নারী অধিকার আন্দোলনের একজন দৃশ্যমান মুখ হওয়ায় তিনি বহুবার কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েছেন। কিন্তু তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল বিতর্কের মধ্যেও সক্রিয় থাকা। তিনি বিভিন্ন প্রজন্মের নারী অধিকারকর্মীদের সঙ্গে কাজ করেছেন এবং নতুন প্রজন্মের কর্মীদের উৎসাহ দিয়েছেন।

প্রজনন অধিকার ছিল তাঁর দীর্ঘদিনের আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নিজের জীবনের একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও তাঁর রাজনৈতিক চিন্তায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল। পরবর্তী সময়ে তিনি নারীদের নিজেদের শরীর ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারকে সামাজিক ন্যায়বিচারের অংশ হিসেবে তুলে ধরেন। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের গর্ভপাত অধিকার আন্দোলনের ইতিহাসেও তাঁর নাম গুরুত্বপূর্ণভাবে উচ্চারিত হয়।

গ্লোরিয়া স্টেইনেম শুধু নারীদের অধিকার নিয়ে কাজ করেননি। তিনি বৃহত্তর সামাজিক ন্যায়বিচার, সমতা এবং মানবাধিকারের প্রশ্নেও সক্রিয় ছিলেন। তাঁর কাজের পরিধি সময়ের সঙ্গে আরও বিস্তৃত হয়। বয়স বাড়লেও তিনি জনসম্মুখে বক্তব্য দেওয়া এবং সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকা অব্যাহত রাখেন। নব্বইয়ের দশকেও তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক মতামত নিয়ে গণমাধ্যমে আলোচনা হয়েছে।

২০১৩ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাঁকে প্রেসিডেনশিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম প্রদান করেন। এই সম্মান যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কারগুলোর একটি। পুরস্কারটি তাঁর দীর্ঘ সামাজিক ও রাজনৈতিক অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়।

তাঁর ব্যক্তিজীবনও ছিল প্রচলিত অনেক ধারণার বাইরে। দীর্ঘ সময় তিনি বিবাহ না করেই জীবন কাটিয়েছেন। পরে ২০০০ সালে ডেভিড বেলকে বিয়ে করেন। বেল ২০০৩ সালে মারা যান। স্টেইনেম নিজের জীবনকে প্রচলিত সামাজিক প্রত্যাশার সঙ্গে না মিলিয়ে নিজের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরিচালনা করার পক্ষে ছিলেন।

তাঁর লেখালেখির ক্ষেত্রেও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং সামাজিক পরিবর্তনের বিষয়টি বারবার ফিরে এসেছে। তাঁর স্মৃতিকথা ‘এ লাইফ অন দ্য রোড’-এ তিনি নিজের দীর্ঘ ভ্রমণ, আন্দোলন এবং মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তাঁর জীবনের একটি মজার তথ্য হলো—সারা জীবন সক্রিয়ভাবে দেশজুড়ে ঘুরে বেড়ালেও তিনি নিজে গাড়ি চালানো শেখেননি।

গ্লোরিয়া স্টেইনেমের মৃত্যু তাই কেবল একজন লেখক বা রাজনৈতিক কর্মীর মৃত্যু নয়। তাঁর প্রজন্মের নারী অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হারাল যুক্তরাষ্ট্র। তাঁর কাজের প্রভাব আজও বিভিন্ন নারী অধিকার সংগঠন, সামাজিক আন্দোলন এবং রাজনৈতিক আলোচনায় দেখা যায়।

বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের অনেক কর্মী তাঁর কাছ থেকে আন্দোলন, সংগঠন গড়ে তোলা এবং সামাজিক পরিবর্তনের জন্য জনমত তৈরির শিক্ষা পেয়েছেন। তাঁর মৃত্যুর পর সেই উত্তরাধিকার কীভাবে নতুন প্রজন্মের হাতে এগিয়ে যাবে, সেটিও এখন আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্টেইনেম শেষ বয়স পর্যন্ত সমতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে সক্রিয় ছিলেন। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় সম্ভবত এটিই—তিনি শুধু পরিবর্তনের দাবি করেননি, বরং কয়েক দশক ধরে সেই পরিবর্তনের জন্য প্রকাশ্যে কাজ করেছেন।

নিউইয়র্কে তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তাঁর অবদান নতুন করে স্মরণ করা হচ্ছে। নারী অধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে তাঁর নাম বহুদিন থাকবে। তাঁর জীবন দেখিয়েছে, একজন সাংবাদিকের লেখা কীভাবে একটি সামাজিক আন্দোলনের শক্তিশালী কণ্ঠ হয়ে উঠতে পারে এবং কয়েক দশক ধরে সেই কণ্ঠ কীভাবে সমাজের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আলোচনাকে প্রভাবিত করতে পারে।