৩০শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বাংলাদেশে তিন সাংবাদিককে মারধর, অভিযোগ যুবদল নেতার বিরুদ্ধে

শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বরে তিন সাংবাদিককে মারধর করা হয়েছে৷ জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি আরিফুজ্জামান মোল্লার নেতৃত্বে তার সমর্থকেরা মারধর করেছেন বলে অভিযোগ করেন আক্রান্ত সাংবাদিকেরা হামলার শিকার সাংবাদিকেরা হলেন ডেইলি স্টারের সাংবাদিক জাহিদ হাসান, নিউজ টুয়েন্টিফোর টেলিভিশন ও জাগো নিউজের জেলা প্রতিনিধি বিধান মজুমদার ও মানবকণ্ঠের জেলা প্রতিনিধি বরকত মোল্লা৷ গত মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট ) সকালে ওই তিন সাংবাদিক জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের প্রাঙ্গণে গেলে তাদের মারধর করা হয়৷ শরীয়তপুরের বিএনপির নেতারা তখন সেখানে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করছিলেন৷

ডেইলি স্টারের সাংবাদিক জাহিদ হাসান বলেন, ‘‘পেশাগত দায়িত্ব পালন করার জন্য আমি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে যাই৷ সেখানে একটি বিক্ষোভ মিছিল হচ্ছিল৷ ওই মিছিলের ছবি ও ভিডিও ধারণ করার সময় যুবদল নেতা আরিফ মোল্লা (আরিফুজ্জামান) তার সহযোগীদের নিয়ে আমাকে মারধর করেছেন৷ তারা আমার ক্যামেরা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন৷ স্থানীয় কয়েকজন আইনজীবী আমাকে উদ্ধার করে তাদের কার্যালয় নিয়ে যান৷”

নিউজ টুয়েন্টিফোর টেলিভিশন ও জাগো নিউজের জেলা প্রতিনিধি বিধান মজুমদার বলেন, ‘‘তথ্য সংগ্রহ করার জন্য আমি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যাই৷ ভবনের নিচতলা থেকে দোতলায় যাচ্ছিলাম৷ সেখানে যুবদলের নেতা আরিফ মোল্লা ও তার সহযোগীরা আমাকে চড়–থাপ্পড় ও লাথি মেরে ভবন থেকে বের করে দেন৷ আমি তাদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেবো৷”

সাংবাদিকদের মারধরের বিষয়ে জানতে যুবদলের সাবেক সভাপতি আরিফুজ্জামান মোল্লাকে কয়েক দফা ফোন করা হয়৷ কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি। কয়েকজন সাংবাদিক জানান, শরীয়তপুর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গত শনিবার রাতে প্রেসক্লাবের সীমানাপ্রাচীরের তিনটি দেয়াল ভেঙে দেওয়া হয়৷ সাংবাদিক বি এম ইসরাফিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রেসক্লাব সভাপতি আবুল হোসেন ও জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগমের ছবি দিয়ে এ ঘটনার প্রতিবাদ করেন৷ ওই ঘটনার জেরে তার ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে৷ তাতে বি এম ইসরাফিলের ডান হাতের কবজি ভেঙে যায়৷

সাংবাদিক ইসরাফিলের ওপর হামলা ও প্রেসক্লাবের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে ফেলার প্রতিবাদে শরীয়তপুরে কর্মরত সাংবাদিকেরা গত রোববার বিকেলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন৷ কর্মসূচি চলাকালে জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম সেখান দিয়ে যেতে চাইলে সাংবাদিকেরা তাকে ঘিরে রাখেন৷ এ সময় সাংবাদিকেরা জেলা প্রশাসকের প্রত্যাহার দাবি করে বিক্ষোভ করতে থাকেন৷

ওই ঘটনায় শরীয়তপুরের বিএনপির একটি পক্ষ সাংবাদিকদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়৷ বিএনপির কর্মীরা শরীয়তপুর প্রেসক্লাব ও কয়েকজন সাংবাদিকের উদ্দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখালেখি করেন৷ সভা করে সাংবাদিকদের বিপক্ষে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত নেন তারা৷

এর পরিপ্রেক্ষিতে আজ বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের আয়োজন করা হয়৷ ‘শরীয়তপুর জেলার সর্বস্তরের জনগণ’ লেখা ব্যানার নিয়ে বিএনপির জেলা পর্যায়ের কিছু নেতার উপস্থিতিতে কয়েক শ মানুষ কর্মসূচিতে অংশ নেন৷ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে জেলা প্রশাসককে ঘিরে ‘মব সৃষ্টিকারী কয়েকজন সাংবাদিকের’ শাস্তি দাবি করে ব্যানার লেখা হয়৷

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বিএনপির নেতা–কর্মী ও সমর্থকেরা যখন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে জড়ো হচ্ছিলেন, তখন সেখানে যান সাংবাদিক জাহিদ হাসান, বিধান মজুমদার ও বরকত মোল্লা৷ জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি আরিফুজ্জামান মোল্লার নেতৃত্বে তার বেশ কয়েকজন সমর্থক ওই তিন সাংবাদিককে মারধর করেন৷

বিএনপির পক্ষে করা ওই বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য দেন শরীয়তপুর জেলা বিএনপির সহসভাপতি শাহ মোহাম্মদ আবদুস সালাম, সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি সিরাজুল হক মোল্লা, সাধারণ সম্পাদক মাহবুব মোর্শেদ প্রমুখ৷ বিএনপি নেতারা দাবি করেন, জেলা প্রশাসক সরকারের প্রতিনিধি, তার গাড়ি ঘিরে সাংবাদিকেরা মব সৃষ্টি করেছেন৷ সাংবাদিকেরা সন্ত্রাসী আচরণ করে জেলা প্রশাসকের প্রত্যাহার চেয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি৷ তিনি আরো বলেন, সাংবাদিকরা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করেছিলেন৷ তারা প্রেসক্লাবের নামে অবৈধভাবে সরকারি জমি দখলে রেখেছেন৷

বিএনপি নেতা ও প্রেসক্লাবের ভাষ্য

জানতে চাইলে শরীয়তপুর জেলা বিএনপির সহসভাপতি শাহ মোহাম্মদ আবদুস সালাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘‘সাংবাদিকেরা জেলা প্রশাসকের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করেছেন৷ তারা এভাবে তার প্রত্যাহার চাইতে পারেন না৷ সাংবাদিকতার আড়ালে কিছু সন্ত্রাসী ও ফ্যাসিবাদের দোসররা বিএনপি সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য এমন কাজ করেছেন৷ এ কারণে আমরা প্রতিবাদ সমাবেশ করেছি৷ সেখানে কোনো সাংবাদিক নিগৃহীত বা মারধরের শিকার হয়েছেন কি না, তা আমার জানা নেই৷”

শরীয়তপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘‘জেলা প্রশাসক কোনো নোটিশ ছাড়া প্রেসক্লাবের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে দিয়েছেন৷ ওই ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে সময় টিভির সাংবাদিক সন্ত্রাসী হামলার শিকারের পর আহত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন৷ এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সাংবাদিকেরা মানববন্ধন করেছেন এবং জেলা প্রশাসকের প্রত্যাহার দাবি করেছেন৷ এমন একটি পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আজ যুবদলের এক নেতা তিন সাংবাদিককে মারধর করেছেন, যা অপ্রত্যাশিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত৷ আমরা প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে এ ঘটনার আইনগত পদক্ষেপ নেবো৷”

বিষয়টি জানার জন্য শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগমকে কয়েক দফা ফোন করা হয়৷ কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি৷ সাংবাদিকদের মারধরের বিষয়টি জানতে শরীয়তপুরের পুলিশ সুপার রওনক জাহান ও পালং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহ আলমকে কয়েক দফা ফোন করা হয়৷ তারাও ফোন ধরেননি৷ ওই দুজনকে খুদে বার্তা দিলেও কোনো জবাব দেননি৷