৩০শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আর্ন্তজাতিক

ইসলামীয় নেটো’য় যোগ দিতে আগ্রহী বাংলাদেশ, কেন পাক-সৌদি-তুর্কির হাত ধরতে চাইছে ঢাকা? চিন্তায় দিল্লি?- রিপোর্ট আনন্দবাজার এর

ইসলামীয় নেটো’য় যোগ দিতে আগ্রহী বাংলাদেশ, কেন পাক-সৌদি-তুর্কির হাত ধরতে চাইছে ঢাকা? চিন্তায় দিল্লি?- রিপোর্ট আনন্দবাজার এর

পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের ‘ইসলামীয় নেটো’য় এ বার যোগ দেবে বাংলাদেশ? ধীরে ধীরে ঢাকা সেই পথে পা বাড়াচ্ছে বলেই মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশ। যদিও সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে আনুষ্ঠানিক ভাবে কোনও বিবৃতি দেয়নি পদ্মাপারের প্রশাসন। তবে শেষপর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এতে সিলমোহর দিলে জাতীয় সুরক্ষার নিরিখে ভারতের যে চিন্তা বাড়বে, তা বলাই বাহুল্য।

চলতি বছরের ৭ অগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করে ইসলামাবাদ, রিয়াধ ও আঙ্কারা। এর পোশাকি নাম ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ (মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট)। সমঝোতা অনুযায়ী, তিন দেশের কোনও একটিতে সশস্ত্র আক্রমণ হলে, সেটিকে বাকিদের উপর হামলা হিসাবে গণ্য করা হবে। এ ছাড়া, সম্মিলিত প্রতিরক্ষার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে তাতে।

এই চুক্তিকেই ‘ইসলামীয় নেটো’ বলে উল্লেখ করছে পশ্চিমি গণমাধ্যমের একাংশ। সংশ্লিষ্ট সমঝোতার কিছু দিনের মধ্যেই এতে যোগদানের ব্যাপারে ‘ঢাকা আগ্রহী’ বলে তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করে বসেন বাংলাদেশের দুই মন্ত্রী। শুধু তা-ই নয়, সৌদির যুবরাজ মহম্মদ বিন সলমনের আমন্ত্রণে কিছু দিনের মধ্যেই রিয়াধ সফরে যাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক। তখনই গোটা বিষয়টি চূড়ান্ত হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

সম্প্রতি, এ ব্যাপারে গণমাধ্যমে মুখ খোলেন বাংলাদেশের বিদেশ প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তাঁর কথায়, ‘‘সৌদি, পাকিস্তান ও তুরস্কের আর্থিক ও প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যোগদানের ব্যাপারে ঢাকার ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে। তবে আমরা নিজস্ব স্বার্থ, পরিবর্তনশীল বিশ্ব অর্থনীতি ও বাণিজ্যিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেব।’’ তাঁর ওই বক্তব্যের পরই তুঙ্গে ওঠে ‘ইসলামীয় নেটো’য় যোগদানের জল্পনা।

পরে এ ব্যাপারে নিজেদের অবস্থান আরও স্পষ্ট করেন বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘‘যে কোনও চুক্তি বা বহুপাক্ষিক সংস্থায় যোগদানের বিষয়টি নির্ভর করবে ঢাকা ও এখানকার জনগণের স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত থাকছে, তার উপর।’’ তবে দক্ষিণ ইউরোপের তুরস্ক থেকে আরব দুনিয়া হয়ে পাকিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত জোটে ঢুকে পড়ার সম্ভাবনা একেবারেই উড়িয়ে দেননি তিনি।

মক্কা চুক্তিতে যোগদানে ‘আগ্রহী’ বাংলাদেশকে নিয়ে উদ্বিগ্ন ভারতের সাবেক সেনাকর্তারা। তাঁদের দাবি, এতে দেশের পূর্বাংশে ঘটবে ‘ইসলামীয় নেটো’র বিস্তার। ফলে ঢাকাকে ঘাঁটি করে অসম, ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গে সন্ত্রাসবাদ ছড়ানোর খেলায় নামতে পারে পাক গুপ্তচরবাহিনী আইএসআই (ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স)। তা ছাড়া, এতে তুর্কি এবং সৌদির অর্থ পেতেও সমস্যা হবে না পদ্মাপারের প্রতিবেশীর।

২০২৪ সালের ৫ অগস্ট গণঅভ্যুত্থানে পতন হয় বাংলাদেশের শেখ হাসিনা সরকারের। তড়িঘড়ি দেশ ছেড়ে পালিয়ে এসে ভারতে আশ্রয় নেন তিনি। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, তার পর থেকেই ঢাকার ফৌজে মৌলবাদী চিন্তাভাবনা এবং ইসলামিকরণের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। উদাহরণ হিসাবে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের কথা বলা যেতে পারে। বর্তমানে প্রকাশ্যেই ধর্মীয় বার্তা দিচ্ছেন তিনি।

কিছু দিন আগে বাহিনীর নতুন ইউনিটগুলির নামকরণ করেন সেনাপ্রধান ওয়াকার। তখনই প্রথম চার খলিফার নাম ব্যবহারের নির্দেশ দেন তিনি। মক্কা-চুক্তির ঠিক আগে এ বছরের জুলাইয়ে পাঁচ দিনের তুরস্ক সফর করতেও দেখা যায় তাঁকে। অন্য দিকে ভারতীয় গোয়েন্দাদের দাবি, হাসিনার পতনের পর থেকেই ক্রমাগত ঢাকায় আনাগোনা বাড়ছে পাক সেনাকর্তা ও গুপ্তচরদের একাংশের।

জনপ্রিয় যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর (পড়ুন ২০২৫ সাল) চার দিনের বাংলাদেশ সফর করেন পাক ফৌজের জয়েন্ট চিফ অফ স্টাফ কমিটির চেয়ারম্যান জেনারেল সাহির শামশাদ মির্জা। ওই সময় ঢাকার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস এবং তিন বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে বৈঠক হয় তাঁর। সূত্রের খবর, এর পরেই পদ্মাপারে আইএসআইয়ের দফতর খোলার অনুমতি পায় ইসলামাবাদ।

সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, ‘ইসলামীয় নেটো’য় বাংলাদেশ যোগ দিলে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের নামে ঢাকায় প্রভাব বৃদ্ধির আরও সুযোগ পাবে পাকিস্তান। এর ফলে ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে চিড় ধরার আশঙ্কা প্রবল। তাই মক্কা চুক্তিতে যাওয়ার আগে তারেক সরকারকে সতর্ক করেছেন পদ্মাপারের সাবেক কূটনীতিক এম শহিদুল ইসলাম। সব দিক খতিয়ে দেখে এতে পা ফেলার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

এই ইস্যুতে ইতিমধ্যেই এক্স হ্যান্ডলে (সাবেক টুইটার) একটি পোস্ট করেন শহিদুল। সেখানে তিনি লেখেন, ‘‘বাংলাদেশকে নিজের স্বার্থের কথা চিন্তা করে বিদেশনীতি ঠিক করতে হবে, অন্যকে খুশি করতে নয়। মক্কা চুক্তির মূল্য কিন্তু কম জটিল নয়। এতে এমন সব সংঘাতে ঢাকা জড়িয়ে যাবে যেগুলি জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। ফলে তাড়াহুড়ো না করে বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়াই ভাল।’’

প্রায় একই সুর শোনা গিয়েছে বাংলাদেশের অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসার মেজর জেনারেল শহিদুল হকের গলায়। সমাজমাধ্যমে করা পোস্টে তিনি লেখেন, ‘‘বাহ্যিক ভাবে মক্কা চুক্তি খুবই ভাল। কিন্তু, এর অন্তর্নিহিত গতিপ্রকৃতি কঠোর ভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কারণ, এতে ভারত-পাক, ইরান-সৌদি বা ইজ়রায়েল-তুরস্ক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ষোলো আনা, যেগুলি ঢাকার স্বাধীনতা বিঘ্নিত করতে পারে।’’

পদ্মাপারের সাবেক কূটনীতিক এম শহিদুল ইসলাম মনে করেন, বৈদেশিক কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং জ্বালানি নিরাপত্তাই সৌদি আরবের কাছে বাংলাদেশের স্বাভাবিক প্রত্যাশা হওয়া উচিত। এগুলি ঢাকার অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণে সহায়ক হবে। তুরস্কের থেকে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও হাতিয়ার আমদানিতেও আপত্তি নেই তাঁর। তবে সরাসরি ‘ইসলামীয় নেটো’য় যাওয়ার একরকম বিরোধিতাই করেছেন তিনি।

যদিও এগুলির উল্টো যুক্তিও রয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক এবং সামরিক নেতৃত্বের একাংশ চরম ভারত-বিরোধিতা করে থাকেন। তাঁদের দাবি, মক্কা চুক্তির অংশ হলে আখেরে লাভ হবে ঢাকার। এতে পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্রের ‘নিরাপত্তা ছাতা’য় আশ্রয় পাওয়ার সুযোগ মিলবে বলে মনে করেন তাঁরা। যদিও আণবিক সুরক্ষার বিষয়টি গোপন রেখেছে সমঝোতায় সই করা তিন দেশ।

গত কয়েক বছর ধরে রাষ্ট্রপুঞ্জের শান্তিবাহিনীতে যোগ দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মোতায়েন থেকেছে বাংলাদেশের ফৌজ। প্রাক্তন মার্কিন কূটনীতিক জন ড্যানিলোভিচ মনে করেন, এই পরিস্থিতিতে মক্কা চুক্তির অংশ হলে তুরস্ক ও পাক সেনার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়ার সুযোগ পাবে ঢাকা। এতে এক দিকে যেমন বাড়বে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, অন্য দিকে তেমনই অত্যাধুনিক হাতিয়ারের প্রশিক্ষণ নিতে সুবিধা হবে তাঁদের।

তবে রাষ্ট্রপুঞ্জের শান্তিরক্ষা বাহিনীর অংশ হওয়ার সঙ্গে মক্কা চুক্তির একটি মূলগত পার্থক্য রয়েছে। সেটা হল, প্রথমটিতে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার কোনও আশঙ্কা নেই। তা ছাড়া শান্তি ফৌজ থেকে যখন-তখন বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে ঢাকার। এক বার ‘ইসলামীয় নেটো’র অংশ হলে সেই সুবিধা একেবারেই পাবে না বাংলাদেশ। তখন অন্যের যুদ্ধে প্রাণ দিতে হতে পারে পদ্মাপারের সৈনিকদের।

মক্কা চুক্তির অংশ হওয়ার জেরে ইতিমধ্যেই ৮,০০০ ফৌজি এবং বায়ুসেনার এক স্কোয়াড্রনকে (১২-২৪টি লড়াকু জেট) সৌদিতে মোতায়েন করেছে পাকিস্তান। অগস্টের তৃতীয় সপ্তাহে তুরস্কের একাধিক সামরিক বিমানের ঘন ঘন ইসলামাবাদে অবতরণের ছবি প্রকাশ্যে এসেছে। ভারতীয় গোয়েন্দাদের সন্দেহ, রাওয়ালপিন্ডিকে লাগাতার অত্যাধুনিক হাতিয়ার সরবরাহ করছে আঙ্কারা।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মক্কা চুক্তিতে চলে যাওয়া নয়াদিল্লির পক্ষে মেনে নেওয়া বেশ কঠিন। তবে ঢাকার উপর চাপ তৈরির বেশ কিছু তাসও রয়েছে কেন্দ্রের হাতে। অবস্থানগত দিক থেকে পদ্মাপারের দেশটির তিন দিকেই রয়েছে ভারত। দক্ষিণ-পশ্চিমে মায়ানমারের সঙ্গে ছোট্ট সীমান্ত ভাগ করে নিয়েছে তারা। উপরন্তু আর্থিক দিক থেকে এ দেশের উপর যথেষ্ট নির্ভরশীলতা রয়েছে তাদের।

বাংলাদেশের মোট চাহিদার প্রায় ১৭ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করে থাকে ভারত। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য এ দেশের একাধিক বন্দর ব্যবহার করে ঢাকা। ১৯৬৬ সালে গঙ্গার জল পেতে এ দেশের সঙ্গে ৩০ বছরের চুক্তি করে তারা। আগামী ডিসেম্বরে শেষ হবে তার মেয়াদ। বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, মক্কা চুক্তির দোহাই দিয়ে এ ব্যাপারে নতুন করে সমঝোতায় নাও যেতে পারে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার।