১১ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

কমিউনিটি

নিউইয়র্কে বর্ণাঢ্য আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো ‘নিউইয়র্ক গ্লোবাল শর্ট ফিল্ম ফেস্ট ২০২৬’

নিউইয়র্কে বর্ণাঢ্য আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো ‘নিউইয়র্ক গ্লোবাল শর্ট ফিল্ম ফেস্ট ২০২৬’

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র নির্মাতা, শিল্পী, কলাকুশলী ও অতিথিদের অংশগ্রহণে নিউইয়র্কে বর্ণাঢ্য আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ‘নিউইয়র্ক গ্লোবাল শর্ট ফিল্ম ফেস্ট ২০২৬’-এর প্রথম আসর। গত ৮ আগস্ট, শনিবার নিউইয়র্কের দুটি ভেন্যুতে দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্রের এই উৎসব।

এবারের উৎসবে ৩৮টি দেশ থেকে ২৮২টি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র জমা পড়ে। দীর্ঘ বাছাই ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া শেষে সেখান থেকে নির্বাচিত ৩০টি চলচ্চিত্র উৎসবের দুই ভেন্যুতে প্রদর্শিত হয়। ১১টি বিভাগে পুরস্কারের পাশাপাশি একটি বিশেষ পুরস্কারসহ মোট ১২টি পুরস্কার দেওয়া হয়।

বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির চলচ্চিত্র নির্মাতা, শিল্পী, কলাকুশলী এবং চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ উৎসবকে আন্তর্জাতিক মিলনমেলায় পরিণত করে। আমন্ত্রিত অতিথিদের উপস্থিতিও পুরো আয়োজনে যোগ করে ভিন্ন মাত্রা।

পুরস্কার পেল যেসব চলচ্চিত্র
এবারের উৎসবে সেরা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের Banana Triangle Six। চলচ্চিত্রটির পরিচালক মার্ক ই. ক্র্যান্ডাল।

সেরা স্বল্পদৈর্ঘ্য প্রামাণ্যচিত্র হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের Back to One – Return to Ground Zero, পরিচালক সিলভেস্টার পি. লুকাসিয়েভিচ।

ফ্রান্সের স্তেফান মার্তিনে তাঁর A BRUSHSTROKE (UN COUP DE PINCEAU) চলচ্চিত্রের জন্য সেরা পরিচালক—স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মার্জ ক্লেইনম্যান Stoop Chat with Aleathea & Ariam চলচ্চিত্রের জন্য পেয়েছেন সেরা পরিচালক—প্রামাণ্যচিত্র পুরস্কার।

ব্রাজিলের সান্তিয়াগো হোসে আসেফ পরিচালিত I Learned to Cry পেয়েছে সেরা চিত্রগ্রহণ পুরস্কার। বাংলাদেশের রাহাতুদ জামান পরিচালিত Maybe, That’s Why… পেয়েছে সেরা সম্পাদনা এবং চীনের গুওজং লু পরিচালিত Spring in a Bottle পেয়েছে সেরা পরীক্ষামূলক চলচ্চিত্র পুরস্কার।

তুরস্কের জিন আতাশ পরিচালিত Nemesis পেয়েছে সেরা চিত্রনাট্য পুরস্কার। ভারতের অরুণা আর্য গুপ্তা পরিচালিত One Rupee Sky পেয়েছে সেরা সামাজিক প্রভাববিষয়ক চলচ্চিত্র এবং যুক্তরাষ্ট্রের পলি রবিনোভিৎজ পরিচালিত What Love’s Worth পেয়েছে সেরা শিক্ষার্থী চলচ্চিত্র পুরস্কার।

যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাডাম বালজেভিচ পরিচালিত The Red Letter পেয়েছে সেরা অপেশাদার চলচ্চিত্র নির্মাতা পুরস্কার। আর বিশেষ ফেস্টিভ্যাল স্পিরিট অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ঝেংদি লি ও খ্রিস্টিনা অরলেটস্কা পরিচালিত In Your Shoes। স্কুল বুলিং এবং সচেতনতা বিষয়ক চমৎকার এই ফিল্মটি নির্মাণ ও অভিনয় করেছেন ব্রুকলিনের মিড উড হাই স্কুলের শিক্ষার্থীরা।

ব্রাজিল, তুরস্ক, ফ্রান্স ও চীনের পুরস্কারজয়ীরা সশরীরে উপস্থিত হতে না পারলেও উৎসবের জন্য শুভেচ্ছা পাঠান। অন্য বিজয়ী এবং তাঁদের প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে ট্রফি ও সনদ গ্রহণ করেন। নিউইয়র্ক ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য স্টেট থেকে বিজয়ী ও চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অনুষ্ঠানে যোগ দেন। ভারত ও বাংলাদেশের পুরস্কারজয়ীদের উপস্থিতিও উৎসবের আন্তর্জাতিক বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করে।

সেরা অপেশাদার চলচ্চিত্র নির্মাতা পুরস্কারজয়ী The Red Letter-এর পরিচালক অ্যাডাম বালজেভিচের পরিবর্তে চলচ্চিত্রটির অভিনেতা জ্যাক গাসকি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে প্রতিনিধিত্ব করেন।

কুইন্স পাবলিক লাইব্রেরিতে প্রথম সেশন
দিনের প্রথম অধিবেশন শুরু হয় সকালে কুইন্স পাবলিক লাইব্রেরি—সেন্ট্রাল মিলনায়তনে। সকালের অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা ও প্রযোজক সুশনা চৌধুরী।

স্বাগত ও পরিচিতি পর্বের মধ্য দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান। বক্তব্য রাখেন নিউইয়র্ক ফিল্ম ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা এবং নিউইয়র্ক গ্লোবাল শর্ট ফিল্ম ফেস্ট ২০২৬-এর ফেস্টিভ্যাল ডিরেক্টর শামীম আল আমিন এবং কুইন্স পাবলিক লাইব্রেরি সেন্ট্রালের প্রোগ্রামিং অ্যান্ড আউটরিচ বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক চিত্রা দেওদাত। উৎসব আয়োজনে সহযোগিতার স্বীকৃতি ও কৃতজ্ঞতা হিসেবে কুইন্স পাবলিক লাইব্রেরির চিত্রা দেওদাতের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন শামীম আল আমিন।

এরপর শুরু হয় চলচ্চিত্র প্রদর্শনী। সকালের অধিবেশনে বিভিন্ন দেশের ১৮টি নির্বাচিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়। প্রদর্শনীতে উপস্থিত কয়েকজন নির্মাতা তাঁদের চলচ্চিত্র ও নির্মাণের অভিজ্ঞতা নিয়ে সংক্ষিপ্ত অনুভূতি প্রকাশ করেন। প্রথম অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্য দেন উৎসবের ইভেন্ট কো-অর্ডিনেটর ইশতিয়াক আহমেদ।

জেক্যালে জমকালো সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণ
উৎসবের দ্বিতীয় অধিবেশন শুরু হয় বিকেল ৪টায় জ্যামাইকা সেন্টার ফর আর্টস অ্যান্ড লার্নিং (জেসিএল) মিলনায়তনে। শুরুতেই ছিল চলচ্চিত্র নির্মাতা, অতিথি ও দর্শকদের অংশগ্রহণে ‘মিট অ্যান্ড গ্রিট’ পর্ব।

এই পর্বের অন্যতম আকর্ষণ ছিল জমকালো রেড কার্পেট আয়োজন। বিভিন্ন দেশ ও ভাষার চলচ্চিত্র নির্মাতা, শিল্পী, অতিথি এবং চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে জেসিএলের লবি হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। পারস্পরিক পরিচয়, শুভেচ্ছা বিনিময় এবং ছবি তোলার মধ্য দিয়ে উৎসবের এই পর্বটি চলচ্চিত্র নির্মাতা ও অতিথিদের মিলনমেলায় পরিণত হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে নিউইয়র্ক গ্লোবাল শর্ট ফিল্ম ফেস্টের প্রথম আসরটি আমেরিকাকে উৎসর্গ করা হয়। এবারের উৎসবের থিম কান্ট্রি ছিল আমেরিকা।

মূল অনুষ্ঠান শুরু হয় আমেরিকার ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে নির্মিত একটি বিশেষ ভিডিওচিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে। এরপর পরিবেশিত হয় বিশ্বখ্যাত গান ‘নিউইয়র্ক, নিউইয়র্ক’। লিজা মিনেলি ও ফ্রাঙ্ক সিনাত্রার পরিবেশনায় জনপ্রিয়তা পাওয়া গানটি অনুষ্ঠানে পরিবেশন করেন আলভান চৌধুরী।

পুরস্কারজয়ী গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব জেনিফার রামপারসাউডের প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় এগিয়ে চলে মূল অনুষ্ঠান। স্বাগত বক্তব্য দেন নিউইয়র্ক ফিল্ম ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও ফেস্টিভ্যাল ডিরেক্টর শামীম আল আমিন। উদ্বোধনী বক্তব্য দেন উৎসবের আহ্বায়ক এবং ডায়াসপোরা ইউএসএ-এর প্রতিষ্ঠাতা ডা. প্রতাপ দাস।

২০২৬ সালের আট সদস্যের জুরি বোর্ডের প্রধান, খ্যাতিমান আমেরিকান চলচ্চিত্র নির্মাতা ও ফাইন আর্ট ফটোগ্রাফার লিয়ার লেভিন অনুষ্ঠানে সশরীরে উপস্থিত হতে না পারলেও ভিডিওচিত্রের মাধ্যমে তাঁর বক্তব্য ও শুভেচ্ছা তুলে ধরা হয়।

আরও বক্তব্য দেন উৎসবের লিড ফেস্টিভ্যাল কো-অর্ডিনেটর এবং ডায়াসপোরা ইউএসএ-এর সাধারণ সম্পাদক এজাজ আলম। এই অধিবেশনে পুরস্কারজয়ী চলচ্চিত্রসহ আরও ১২টি নির্বাচিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়। উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান। বিজয়ী চলচ্চিত্র নির্মাতা ও তাঁদের প্রতিনিধিদের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রফি ও সনদ তুলে দেওয়া হয়।

পুরস্কার ও সনদ তুলে দেন চিত্রনাট্যকার ক্রিস মুর; ফেস্টিভ্যাল ম্যানেজিং ডিরেক্টর আশরাফুন নাহার লিউজা; নিউইয়র্ক ফিল্ম ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও ফেস্টিভ্যাল ডিরেক্টর শামীম আল আমিন; শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবা পেশাজীবী ফিলিপ এস্তানিসলাস; ফেস্টিভ্যাল আহ্বায়ক ও ডায়াসপোরা ইউএসএ-এর প্রতিষ্ঠাতা ডা. প্রতাপ দাস; কুইন্স ওয়ার্ল্ড ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের নির্বাহী পরিচালক কাথা ক্যাটো; কুইন্স ওয়ার্ল্ড ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের আর্টিস্টিক ডিরেক্টর

ডোনাল্ড প্রেস্টন ক্যাটো; অটিজম সোসাইটি হ্যাবিলিটেশন অর্গানাইজেশন (আসো) এর নির্বাহী পরিচালক রুবাইয়া রহমান; সিপিএ সারোয়ার চৌধুরী; সাপ্তাহিক বাঙালির সম্পাদক কৌশিক আহমেদ; বিশিষ্ট শিল্পী তাজুল ইমাম; সংস্কৃতি ব্যক্তিত্ব আতিয়া সীমা; লিড ফেস্টিভ্যাল কো-অর্ডিনেটর ও ডায়াসপোরা ইউএসএ-এর সাধারণ সম্পাদক এজাজ আলম এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা কিথ পাওয়েল।

অটিজম সচেতনতায় বিশেষ পর্ব
অনুষ্ঠানের তৃতীয় পর্ব সঞ্চালনা করেন শারমিন মুনমুন। এই পর্বে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের পাশাপাশি অটিজম সচেতনতা নিয়ে একটি বিশেষ আয়োজন রাখা হয়।

অটিজম সোসাইটি হ্যাবিলিটেশন অর্গানাইজেশন (আসো)-এর উদ্যোগে অটিজম বিষয়ে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে নির্মিত একটি পাপেট কার্টুন সিরিজের একটি পর্ব অনুষ্ঠানে প্রদর্শন করা হয়। অটিজম সম্পর্কে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং এ বিষয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরির বার্তা ছিল এই বিশেষ পরিবেশনায়। প্রদর্শনীর পর আসো-এর নির্বাহী পরিচালক রুবাইয়া রহমান অটিজম সচেতনতার গুরুত্ব এবং সংগঠনটির কার্যক্রম নিয়ে বক্তব্য রাখেন।

আয়োজক, অংশীদার ও পৃষ্ঠপোষক
আন্তর্জাতিক এই চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজন করে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান নিউইয়র্ক ফিল্ম ফাউন্ডেশন। উৎসবের অন্যতম অংশীদার ছিল ডায়াসপোরা ইউএসএ।

এ ছাড়া অংশীদার হিসেবে যুক্ত ছিল ফিল্মফ্রিওয়ে, কুইন্স পাবলিক লাইব্রেরি, অটিজম সোসাইটি হ্যাবিলিটেশন অর্গানাইজেশন (আসো) এবং ওয়ান ওয়ান অর্গানাইজেশন।

উৎসবের পৃষ্ঠপোষক ছিল ট্রু-মেড ফার্মা, স্ট্যান্ডার্ড এক্সপ্রেস, বিএ এক্সপ্রেস এবং সিপিএ সারোয়ার চৌধুরী। উৎসবের কারিগরি অংশীদার ছিল থ্রিএম স্টুডিও এবং ক্রিয়েটিভ পার্টনার ছিল দ্য লেন্স নিউইয়র্ক।

বিশ্ব চলচ্চিত্রের মিলনমেলা
প্রথম আয়োজনেই ৩৮টি দেশের ২৮২টি চলচ্চিত্র জমা পড়া নিউইয়র্ক গ্লোবাল শর্ট ফিল্ম ফেস্টকে একটি বৈচিত্র্যময় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র প্ল্যাটফর্ম হিসেবে সামনে নিয়ে এসেছে। নিউইয়র্কের দুটি ভেন্যুতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, মিট অ্যান্ড গ্রিট, রেড কার্পেট, সংগীত পরিবেশনা, পুরস্কার বিতরণ, অটিজম সচেতনতামূলক আয়োজন এবং বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র নির্মাতা ও অতিথিদের অংশগ্রহণ পুরো দিনটিকে একটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র মিলনমেলায় রূপ দেয়।

আয়োজকদের প্রত্যাশা, নিউইয়র্ক গ্লোবাল শর্ট ফিল্ম ফেস্ট ভবিষ্যতেও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের নতুন ও প্রতিভাবান চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কাজ তুলে ধরার পাশাপাশি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ, সংস্কৃতি, ভাষা ও মানুষের মধ্যে সংযোগ তৈরির একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চ হিসেবে এগিয়ে যাবে।প্রেস বিজ্ঞপ্তি অনুসারে