বাংলাদেশের চাঁদপুরের প্রত্যন্ত গ্রামের এক শিক্ষার্থীর অসাধারণ সাফল্যের গল্প এখন অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে অনেকের কাছে। চাঁদপুর এর মতলব উত্তর উপজেলার ফতেপুর পশ্চিম ইউনিয়নের নবুরকান্দি গ্রামের মেয়ে সানজিদা আক্তার তুলি যুক্তরাষ্ট্রের একটি খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয় – লুইজিয়ানার টুলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিষয়ে পিএইচডি করার সুযোগ পেয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি পেয়েছেন ৪ লক্ষ ৮০ হাজার ডলার ( বাংলাদেশের টাকায় প্রায় ছয় কোটি টাকা) এর পূর্ণাঙ্গ বৃত্তি।
ভর্তি ও আর্থিক সহায়তা সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক চিঠি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা স্টেটের নিউ অরলিন্সে অবস্থিত টুলেন ইউনিভার্সিটির স্কুল অব সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ডক্টরাল প্রোগ্রামে ২০২৬ সালের ফল সেমিস্টার থেকে যোগ দেবেন সানজিদা। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে পিএইচডি অধ্যয়নের পুরো সময়জুড়ে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি শিক্ষাবর্ষে তিনি স্টাইপেন্ড ও গ্রীষ্মকালীন গবেষণা সহায়তা বাবদ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার পাবেন। এর পাশাপাশি তার সম্পূর্ণ টিউশন ফি মওকুফ করা হবে, যার বার্ষিক মূল্য ৬৫ হাজার ৪ মার্কিন ডলার। এছাড়া শিক্ষার্থী স্বাস্থ্যবিমার শতভাগ ব্যয়ও বহন করবে বিশ্ববিদ্যালয়।
পাঁচ বছর মেয়াদি পিএইচডি কর্মসূচিতে স্টাইপেন্ড, গবেষণা সহায়তা, টিউশন ফি মওকুফ এবং স্বাস্থ্যবিমাসহ মোট আর্থিক সুবিধার পরিমাণ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় পাঁচ কোটি ৮২ লাখ টাকার সমান। ফলে এটি একজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর জন্য উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক একাডেমিক অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সানজিদার শিক্ষাজীবনের শুরু নবুরকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরে তিনি মান্দারতলী মুজাদ্দেদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। এরপর চাঁদপুরের আল-আমিন একাডেমি থেকে মাধ্যমিক এবং চাঁদপুর সরকারি মহিলা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন।
উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর গবেষণাভিত্তিক উচ্চশিক্ষার লক্ষ্যে বিদেশে আবেদনের প্রস্তুতি শুরু করেন। দীর্ঘদিনের সেই প্রচেষ্টার ফল হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম স্বনামধন্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গবেষণার সুযোগ পেলেন।.
সানজিদা আক্তার তুলি মতলব উত্তর উপজেলা কৃষক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাদেকুর রহমান এবং সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক অজুফা সরকারের মেয়ে। নিজের এই অর্জন সম্পর্কে সানজিদা বলেন, প্রত্যন্ত একটি গ্রাম থেকে উঠে এসে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গবেষণার সুযোগ পাওয়া তার জীবনের অন্যতম বড় স্বপ্নপূরণ। তিনি মনে করেন, পরিবারের সমর্থন, শিক্ষকদের দিকনির্দেশনা এবং ধারাবাহিক পরিশ্রমই তাকে এই অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, গ্রামের শিক্ষার্থীরা যেন কখনও নিজেদের সীমাবদ্ধ মনে না করে। বিশেষ করে মেয়েদের উদ্দেশে তিনি বলেন, জন্মস্থান বা পারিপার্শ্বিকতা নয়, বরং স্বপ্ন, যোগ্যতা ও অধ্যবসায়ই একজন মানুষের গন্তব্য নির্ধারণ করে। সানজিদার এই সাফল্যের খবরে তার পরিবার, শিক্ষক, সহপাঠী এবং এলাকাবাসীর মধ্যে আনন্দের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের মতে, তার এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং চাঁদপুরের শিক্ষার্থীদের জন্যও একটি অনুপ্রেরণার উদাহরণ।
শিক্ষাবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সুযোগ এবং পূর্ণাঙ্গ বৃত্তি অর্জন দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়। সানজিদার সাফল্য প্রমাণ করেছে, প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও সুযোগ ও প্রস্তুতি পেলে বিশ্বমানের শিক্ষাঙ্গনে নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে পারেন।














