বিভিন্ন স্টেটে বসবাসরত ফেডারেল সুযোগ-সুবিধা ভোগী অবৈধ অভিবাসীদের তথ্য ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটিকে না দিলে স্টেটগুলো বিলিয়ন ডলার অর্থ হারাতে পারে বলে সতর্ক করেছে ট্রাম্প প্রশাসনের ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিস বা বিচার বিভাগ।
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতি কার্যকর করা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন ও স্টেটগুলোর মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ স্টেটগুলোকে সতর্ক করেছে, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কাছে থাকা অনিবন্ধিত বা বৈধ অভিবাসন মর্যাদা না থাকা ব্যক্তিদের তথ্য ফেডারেল কর্তৃপক্ষের কাছে সরবরাহ না করলে কিছু স্টেট বিপুল পরিমাণ ফেডারেল অর্থ হারাতে পারে।
এই নির্দেশনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সম্ভাব্য বিস্তৃতি। শুধু সামাজিক সহায়তা বা কল্যাণ কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত সরকারি সংস্থার তথ্য নয়, স্টেট সমুহের বিশ্ববিদ্যালয়, ডিপার্টমেন্ট অফ মোটর ভেহিকেল বিভাগ এবং অন্যান্য সরকারি সংস্থার কাছেও থাকা তথ্যের বিষয়টি এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে এটি যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণকে শুধু সীমান্ত বা অভিবাসন দপ্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে স্টেটগুলোর সরকারি প্রশাসনের আরও বিস্তৃত অংশের সঙ্গে যুক্ত করছে।
বিচার বিভাগের নতুন ব্যাখ্যা ১৯৯৬ সালের একটি কল্যাণ সংস্কার আইনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, আইনটি স্টেট সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে পাওয়া তথ্য ফেডারেল সরকারের সঙ্গে ভাগ করার সুযোগ দেয়। তবে এর ব্যাখ্যা নিয়ে দীর্ঘদিনের আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং স্টেটগুলো ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থানের বিরুদ্ধে আদালতে যেতে পারে।
বিষয়টির আর্থিক দিকও বড়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলোচনায় থাকা ফেডারেল অর্থের মধ্যে সাময়িক সহায়তা কর্মসূচিতে ১৬.৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি এবং সামাজিক নিরাপত্তা-সংক্রান্ত প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল রয়েছে। যদিও অনিবন্ধিত অভিবাসীরা এসব কর্মসূচির অনেকগুলোর জন্য সরাসরি যোগ্য নন, প্রশাসন স্টেটগুলোর তথ্য সংগ্রহ ও আইন প্রয়োগে সহযোগিতার ওপর জোর দিচ্ছে। এখানেই রাজনৈতিক বিরোধের সূত্রপাত।
ডেমোক্র্যাট নেতৃত্বাধীন স্টেটগুলো দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, ফেডারেল সরকার অভিবাসন প্রয়োগের দায়িত্ব স্টেট ও স্থানীয় সরকারের ওপর অতিরিক্ত চাপিয়ে দিতে চাইছে। বিশেষ করে যেসব স্টেট স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ফেডারেল অভিবাসন কার্যক্রম থেকে আলাদা রাখতে চায়, তারা এই ধরনের তথ্য আদান-প্রদানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারে।
অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি হলো, কোনো ব্যক্তি যদি যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ ইমিগ্রেশন ছাড়া অবস্থান করেন, তাহলে ফেডারেল ইমিগ্রেশন আইন কার্যকর করার জন্য সরকারের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকা প্রয়োজন। ট্রাম্প প্রশাসন সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ইমিগ্রেশন আইন প্রয়োগকেও আরও কার্যকর করতে চাইছে।
এই নীতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে অভিবাসী পরিবারগুলোর ওপর। কোনো ব্যক্তি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ডিপার্টমেন্ট অফ মোটর ভেহিকেল বিভাগ বা অন্য কোনো স্টেট সংস্থায় নিজের পরিচয় বা নথি জমা দিলে সেই তথ্য ভবিষ্যতে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা তৈরি হলে মানুষ সরকারি সেবা নিতে দ্বিধা করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্টেটে বিপুল সংখ্যক অভিবাসী শিক্ষার্থী এবং অভিবাসী পরিবারের সন্তান উচ্চশিক্ষায় রয়েছে। যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ইমিগ্রেশন তথ্য সরবরাহের বিষয়ে নতুন দায়িত্ব নিতে হয়, তাহলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ফেডারেল সরকারের সম্পর্ক আরও জটিল হতে পারে।
ডিপার্টমেন্ট অফ মোটর ভেহিকেল বিভাগও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ড্রাইভিং লাইসেন্স বা গাড়ির নিবন্ধনের জন্য অনেক মানুষকে ব্যক্তিগত পরিচয় ও আবাসিক তথ্য দিতে হয়। এসব তথ্য ইমিগ্রেশন আইন প্রয়োগে ব্যবহার করা হলে স্টেট ভিত্তিক তথ্যব্যবস্থা ফেডারেল ইমিগ্রেশন ব্যবস্থার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে যাবে।
তবে এটি এখনও সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হয়ে গেছে—এমনভাবে বিষয়টি দেখা ঠিক হবে না। স্টেটগুলো আদালতে চ্যালেঞ্জ করলে যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিস বা বিচার বিভাগের এই ব্যাখ্যার সাংবিধানিক ও আইনি বৈধতা নিয়ে বিচার হতে পারে। ফেডারেল সরকার কতটা স্টেটগুলোকে তথ্য সরবরাহে বাধ্য করতে পারে, সেটিও বড় প্রশ্ন।
এই বিতর্কের আরেকটি দিক হলো ব্যক্তিগত গোপনীয়তা। সরকারি সংস্থার কাছে থাকা ইমিগ্রেশন সংক্রান্ত তথ্য কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে এবং কোন সংস্থার সঙ্গে ভাগ করা যাবে—এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আইনে একাধিক বিধান রয়েছে। তাই তথ্য আদান-প্রদানের পরিধি বাড়াতে গেলে নতুন আইনি প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এটি ইমিগ্রেশন নীতিমালা কার্যকর করার ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। সীমান্ত থেকে শুরু করে অভ্যন্তরীণ প্রয়োগ, ভিসা, পাসপোর্ট এবং সরকারি তথ্যব্যবস্থা সবকিছুকে ইমিগ্রেশন নিয়ন্ত্রণের বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।
স্টেটগুলির জন্য আবার বিষয়টি ফেডারেল অর্থায়ন বনাম স্থানীয় প্রশাসনিক স্বাধীনতার প্রশ্ন তৈরি করছে। তারা যদি প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে নেয়, তাহলে ফেডারেল সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়বে; আর যদি না মানে, তাহলে অর্থ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে এবং আদালতে দীর্ঘ লড়াই শুরু হতে পারে।
ফলে গত ৩ সেপ্টেম্বরের এই পরিস্থিতি শুধু অভিবাসীদের তথ্যের প্রশ্ন নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যবস্থা, স্টেট সরকারের ক্ষমতা, ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা এবং ইমিগ্রেশন লনআইন প্রয়োগের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়েও বড় বিতর্কের সূচনা করতে পারে।













