১লা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

নোবেলজয়ী বঙ্গসন্তান অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প

নজরুল ইসলাম মিন্টু : আমরা অনেকেই অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম শুনিনি। অথচ তিনি বিশ্বের চারজন বাঙালি নোবেলজয়ীর একজন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অমর্ত্য সেন এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পর বাঙালি হিসেবে নোবেলজয়ীদের তালিকায় তাঁর নাম যুক্ত হয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, বাঙালি সমাজে তাঁকে নিয়ে খুব বেশি উচ্চকণ্ঠ আলোচনা হয়নি। গণমাধ্যমেও তাঁর জীবন, কাজ ও বিশ্বজোড়া অবদান নিয়ে চোখে পড়ার মতো ধারাবাহিক আয়োজন দেখা যায়নি। ফলে বৈশ্বিক দারিদ্র্য দূরীকরণে যুগান্তকারী অবদান রাখা এই বাঙালি অর্থনীতিবিদ অনেকের কাছেই রয়ে গেছেন প্রায় অজানা।

অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু একজন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ নন, তিনি বাঙালি মেধা, গবেষণা ও মানবিক চিন্তার এক উজ্জ্বল প্রতিনিধি। ২০১৯ সালে তিনি তাঁর স্ত্রী ও সহগবেষক এস্থার দুফ্লো এবং মার্কিন অর্থনীতিবিদ মাইকেল ক্রেমারের সঙ্গে যৌথভাবে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তাঁদের গবেষণার মূল বিষয় ছিল, কীভাবে বাস্তব পরীক্ষার মাধ্যমে দারিদ্র্য কমানোর কার্যকর পথ খুঁজে পাওয়া যায়। সহজভাবে বললে, তাঁরা দেখিয়েছেন, দারিদ্র্য দূর করতে বড় বড় বক্তৃতা বা কাগুজে পরিকল্পনা যথেষ্ট নয়। দরকার মাঠে গিয়ে দেখা, কোন সহায়তা মানুষের জীবনে সত্যিই পরিবর্তন আনে। তাঁর নোবেলজয়ী গবেষণার ভেতর দিয়ে বাঙালির মেধা, দক্ষিণ এশিয়ার দারিদ্র্যের বাস্তবতা এবং বাংলাদেশের মাঠপর্যায়ের উন্নয়ন অভিজ্ঞতা বিশ্ব আলোচনায় নতুন গুরুত্ব পেয়েছে।

অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্ত্রী এস্থার দুফ্লো নিজেও অর্থনীতিতে নোবেল পাওয়া বিশ্বের দ্বিতীয় নারী এবং সবচেয়ে কম বয়সী নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ হিসেবে ইতিহাস গড়েন। নোবেলজয়ী দম্পতিদের ধারায় অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় ও এস্থার দুফ্লোর নামও বিশেষ মর্যাদায় যুক্ত হয়। ২০১৯ সালের নোবেল ঘোষণার সময় এই দম্পতির যৌথ জীবন ও গবেষণা এক ঐতিহাসিক স্বীকৃতি পায়। তাঁদের জীবন দেখায়, গবেষণা কখনো কখনো শুধু পেশা থাকে না, তা হয়ে ওঠে যৌথ স্বপ্ন, যৌথ পরিশ্রম এবং মানবকল্যাণের সম্মিলিত অঙ্গীকার।

অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর সহকর্মীদের সবচেয়ে আলোচিত পদ্ধতি হলো Randomized Controlled Trials বা RCT। বিষয়টি সহজ করে বললে, কোনো সহায়তা বা নীতি সত্যিই কাজ করছে কি না, তা মাঠে পরীক্ষা করে দেখা। চিকিৎসাবিজ্ঞানে যেমন নতুন ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়, তাঁরা তেমনি দারিদ্র্য কমানোর উদ্যোগগুলোও বাস্তব জীবনে পরীক্ষা করেছেন। কোন সহায়তা দরিদ্র মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনে, আর কোন উদ্যোগ শুধু কাগজে ভালো দেখায়, তাঁদের কাজ সেই পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করেছে।

অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৬১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভারতের মুম্বাইয়ে। বাবা দীপক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মা নির্মলা বন্দ্যোপাধ্যায় দুজনই অর্থনীতির অধ্যাপক ছিলেন। ফলে অর্থনীতি তাঁর কাছে শুধু পাঠ্যবিষয় ছিল না, ছিল চিন্তা ও আলোচনার পারিবারিক আবহ। তাঁর শৈশব ও শিক্ষাজীবনের বড় অংশ কেটেছে কলকাতায়। সাউথ পয়েন্ট স্কুলে পড়াশোনার পর তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৯৮১ সালে অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রি নেন। এরপর ১৯৮৩ সালে দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ এবং ১৯৮৮ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন।

দীর্ঘদিন ধরে তিনি এমআইটির ফোর্ড ফাউন্ডেশন ইন্টারন্যাশনাল প্রফেসর অব ইকোনমিক্স হিসেবে কাজ করেছেন এবং J-PAL এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক হিসেবে যুক্ত আছেন। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে তিনি ও এস্থার দুফ্লো ইউনিভার্সিটি অব জুরিখে নতুন একাডেমিক অধ্যায় শুরু করার কথা রয়েছে। তাঁর কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক অবদান হলো Abdul Latif Jameel Poverty Action Lab, সংক্ষেপে J-PAL। ২০০৩ সালে অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, এস্থার দুফ্লো এবং সেন্দিল মুল্লাইনাথন এমআইটিতে এই গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। শুরুতে এর নাম ছিল Poverty Action Lab। পরে সমাজসেবী ও ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আব্দুল লতিফ জামিলের অনুদানের পর তাঁর প্রয়াত বাবার স্মরণে এর নাম হয় Abdul Latif Jameel Poverty Action Lab।

J-PAL কোনো সাধারণ গবেষণা প্রতিষ্ঠান নয়। এই প্রতিষ্ঠানটি দেখতে চায়, দারিদ্র্য কমাতে কোন পদ্ধতি বাস্তবে কাজ করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আর্থিক সহায়তা, জলবায়ু পরিবর্তন, নারী উন্নয়ন এবং সামাজিক সুরক্ষার মতো বিষয়ে মাঠপর্যায়ে গবেষণা করেছে। এর গবেষণা নেটওয়ার্কে এক হাজারের বেশি গবেষক যুক্ত আছেন এবং বিভিন্ন দেশে দুই হাজারের বেশি পরীক্ষামূলক মূল্যায়ন করা হয়েছে। এসব গবেষণার লক্ষ্য একটাই, দরিদ্র মানুষের জীবনে কোন সহায়তা সত্যিই ফল দেয়, তা নিশ্চিতভাবে জানা।

বাংলাদেশের সঙ্গে অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গবেষণার সম্পর্ক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর নোবেলজয়ী কাজ এবং J-PAL এর বৈশ্বিক দারিদ্র্য বিমোচন মডেল তৈরিতে বাংলাদেশের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা বড় ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে ব্র্যাকের Targeting the Ultra Poor কর্মসূচি বা গ্রাজুয়েশন মডেল বিশ্বজুড়ে দারিদ্র্য গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। এই মডেলে অতি দরিদ্র পরিবারকে শুধু ঋণ দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয় না। তাদের দেওয়া হয় উৎপাদনক্ষম সম্পদ, যেমন গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি বা অন্য জীবিকা সহায়ক উপকরণ। এর সঙ্গে থাকে প্রশিক্ষণ, নিয়মিত সহায়তা, সঞ্চয়ের অভ্যাস এবং আত্মনির্ভরতার পথনির্দেশ।

অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, এস্থার দুফ্লো এবং তাঁদের গবেষণা নেটওয়ার্ক এই গ্রাজুয়েশন মডেলের কার্যকারিতা নিয়ে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে গবেষণা করেন। গবেষণায় দেখা যায়, এককালীন বড় সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদি সহচর্য দরিদ্র পরিবারকে দারিদ্র্যের ফাঁদ থেকে বের হয়ে আসার বাস্তব সুযোগ তৈরি করে দিতে পারে। পরবর্তী সময়ে এই মডেল বিশ্বের বহু দেশে প্রয়োগ করা হয় এবং বহু পরিবারকে আত্মনির্ভরতার পথে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে। বাংলাদেশের মাটিতে গড়ে ওঠা এই দারিদ্র্য বিমোচন পদ্ধতি এভাবেই বৈশ্বিক উন্নয়ন আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশে J-PAL শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আর্থিক সহায়তা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সামাজিক সুরক্ষার মতো ক্ষেত্রে নানা গবেষণা ও আলোচনার সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশের গ্রাম, অতি দরিদ্র মানুষের সংগ্রাম, ব্র্যাকের মতো প্রতিষ্ঠানের কাজ এবং মানুষের জীবন বদলানোর নানা উদ্যোগ অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গবেষণাকে বাস্তবতার মাটিতে দাঁড় করিয়েছে। একজন বাঙালি অর্থনীতিবিদ হিসেবে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে শুধু গবেষণার তথ্য নয়, দরিদ্র মানুষের জীবন বোঝার এক বাস্তব পাঠশালা।

অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাজের ভেতরে একটি গভীর মানবিক ভাবনা আছে। তিনি ও এস্থার দুফ্লো তাঁদের আলোচিত বই Poor Economics এ দেখিয়েছেন, দরিদ্র মানুষকে অলস বা অবিবেচক ভাবা বড় ভুল। দরিদ্র মানুষ প্রতিদিন খুব অল্প সম্পদ নিয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়। কখন খাবার কিনবে, কখন ওষুধ কিনবে, সন্তানকে স্কুলে পাঠাবে কি না, ঋণ নেবে কি না, এসব প্রশ্ন তাদের জীবনের অংশ। তাঁদের আরেক বই Good Economics for Hard Times এ অভিবাসন, বাণিজ্য, বৈষম্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো কঠিন বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

এস্থার দুফ্লো নিজেও আধুনিক উন্নয়ন অর্থনীতির অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। ১৯৭২ সালের ২৫ অক্টোবর ফ্রান্সের প্যারিসে তাঁর জন্ম। ইতিহাস ও অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনার পর ১৯৯৩ সালে রাশিয়ার মস্কোতে গবেষণার অভিজ্ঞতা তাঁর চিন্তার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন-পরবর্তী বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সংকট দেখে তিনি বুঝতে পারেন, অর্থনীতি শুধু তত্ত্বের বিষয় নয়, মানুষের জীবনের বাস্তব প্রশ্নের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।

১৯৯৬ সালে এস্থার দুফ্লো এমআইটিতে পিএইচডি শুরু করেন। তখন অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন এমআইটির তরুণ অধ্যাপক। তিনি দুফ্লোর পিএইচডি উপদেষ্টাদের একজন ছিলেন। এই একাডেমিক পরিচয় ধীরে ধীরে গবেষণার গভীর সহযাত্রায় রূপ নেয়। ১৯৯৯ সালে দুফ্লো পিএইচডি শেষ করেন এবং এমআইটির ফ্যাকাল্টি হিসেবে যোগ দেন। এরপর দুজনের মধ্যে তৈরি হয় গভীর গবেষণাগত বোঝাপড়া, যার ভিত্তি ছিল মাঠপর্যায়ের অর্থনীতি, দারিদ্র্য বোঝার নতুন পদ্ধতি এবং মানুষের জীবনে কার্যকর পরিবর্তন আনার অভিন্ন লক্ষ্য।

দীর্ঘ গবেষণা, চিন্তা ও কাজের পথ ধরে অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় ও এস্থার দুফ্লোর ব্যক্তিগত সম্পর্কও গভীর হয়। ২০১৫ সালে তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের দুই সন্তান রয়েছে। ব্যক্তিগত জীবন ও পেশাগত গবেষণার এই সহযাত্রা তাঁদের সম্পর্ককে এক অনন্য মাত্রা দিয়েছে।

অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় কেবল একজন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ নন। তিনি বাঙালি বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের এক আধুনিক উত্তরসূরি। রবীন্দ্রনাথ মানুষের আত্মা ও মানবতার কথা বলেছেন, অমর্ত্য সেন মানুষের সক্ষমতা ও স্বাধীনতার প্রশ্ন তুলেছেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূস দরিদ্র মানুষের ঋণপ্রাপ্তির নতুন পথ খুলেছেন, আর অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় দেখিয়েছেন, দরিদ্র মানুষের প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্তের ভেতরেও অর্থনীতির বড় শিক্ষা লুকিয়ে থাকে।

অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অর্জন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা অভিবাসী বঙ্গসন্তানেরা জ্ঞান, গবেষণা, প্রযুক্তি, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ব্যবসা ও মানবসেবার নানা ক্ষেত্রে বাঙালির মুখ উজ্জ্বল করে চলেছেন। তাঁদের সাফল্য প্রমাণ করে, বাঙালির মেধা কোনো ভূগোলের ভেতর সীমাবদ্ধ নয়। পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক, সৃজনশীলতা, পরিশ্রম ও মানবিক দায়বদ্ধতা নিয়ে বাঙালি আগামী দিনেও বিশ্বসভায় নিজের অবস্থান আরও দৃঢ় করবে। নজরুল ইসলাম মিন্টু টরন্টো থেকে প্রকাশিত “দেশেবিদেশে” পতিকার সম্পাদক ।

তথ্যসূত্র:
Nobel Prize in Economic Sciences 2019
MIT Economics, Abhijit Banerjee Profile
J-PAL, Abhijit Banerjee Profile
BRAC Institute of Governance and Development
কৃতজ্ঞতা: হাসানুজ্জামান সাকী