৩১শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

শেষের পাতা

নিউইয়র্কে বাংলাদেশিসহ দুটি প্রাণঘাতী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অভিযুক্ত ঘাতক জেসুস অ্যাকোস্টা গ্রেপ্তার

নিউইয়র্কে বাংলাদেশিসহ দুটি প্রাণঘাতী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অভিযুক্ত ঘাতক জেসুস অ্যাকোস্টা গ্রেপ্তার

নিউইয়র্ক সিটিতে কয়েক দিনের ব্যবধানে দুটি প্রাণঘাতী গোলাগুলির ঘটনায় জড়িত সন্দেহে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে ২৯ আগস্ট শনিবার নিউ ইয়র্ক পুলিশ জানিয়েছে এনওয়াইপিডি (NYPD) জানিয়েছে, কয়েক দিন ধরে তল্লাশি চালানোর পর ২৯ আগস্ট শনিবার সকালে ৩১ বছর বয়সী জেসুস অ্যাকোস্টাকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। ব্রুকলিন এর একটি বাংলাদেশি মালিকানাধীন পিজা ও গ্রীল রেস্তোরাঁ এবং ব্রঙ্কসের একটি জেলা ও গ্রোসারী দোকানে গোলাগুলির ঘটনায়—যাতে দুজন নিহত ও আরেকজন আহত হয়েছিলেন—পুলিশ অ্যাকোস্টাকে খুঁজছিল।

গত শনিবার ২২ আগস্ট রাতে ব্রুকলিন এর ব্রাউনসভিলের ‘আমেরিকান বেস্ট উইংস অ্যান্ড পিৎজা’য় গোলাগুলির প্রথম ঘটনাটি ঘটে। ৮৪২ রকওয়ে অ্যাভিনিউয়ের ‘আমেরিকান বেস্ট উইংস অ্যান্ড পিৎজা’ রেস্টুরেন্টে তখন কাজ করছিলেন মোহাম্মদ ইউসুফ ও তাঁর বন্ধু-সহকর্মী মোহাম্মদ রাসেল। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অ্যাকোস্টা রেস্টুরেন্টে ঢুকে প্রথমে রাসেলের পায়ে গুলি করে। এরপর ইউসুফের মাথায় গুলি চালায়। পরে রেস্টুরেন্ট থেকে টাকা নিয়ে পালিয়ে যায় সে। ইউসুফকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও বাঁচানো যায়নি।

গুলিবিদ্ধ রাসেল পরে ABC7 New York-কে সেই রাতের ভয়ংকর মুহূর্তের কথা জানান। তাঁর উরুতে গুলি লেগেছিল এবং প্রতিবেদন প্রকাশের সময়ও গুলিটি তাঁর শরীরে ছিল। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তিনি মেঝেতে পড়ে মৃতের ভান করেন। বন্দুকধারী কাছে এসে তাঁকে পরীক্ষা করেছিল বলেও জানান রাসেল। তাঁর ধারণা, তিনি মারা গেছেন ভেবেই হামলাকারী তাঁকে আর গুলি করেনি । সেই কয়েক মুহূর্তের অভিনয়ই সম্ভবত তাঁর জীবন বাঁচিয়ে দেয়। কিন্তু পাশে পড়ে থাকা বন্ধু ইউসুফ আর উঠতে পারেননি।

পরিবারের তথ্য ও বাংলাদেশি কমিউনিটির সূত্রে তাঁর পূর্ণ নাম মোহাম্মদ ইউসুফ রাজু। তিনি নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার আমিশাপাড়া ইউনিয়নের কংশনগর এলাকার বাসিন্দা। প্রায় তিন বছর আগে পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলানোর আশায় মেক্সিকো সীমান্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন। দেশে থাকা পরিবারটি তাঁর আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক গণমাধ্যম এবং তাঁর পরিবারের জন্য খোলা তহবিল সংগ্রহের নিমিত্ত তাঁকে দুই কন্যাসন্তানের জনক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কন্যা দুইজনের বয়স ১২ ও ৩ বছর।

ইতোমধ্যে নিউ ইয়র্কে জানাজার নামাজের পর মোহাম্মদ ইউসুফ রাজুর মরদেহ নিউ ইয়র্কের নোয়াখালী সোসাইটির উদ্যোগ ও সংগঠনের সভাপতি জাহিদ মিন্টুর ব্যবস্থাপনায় দাফনের জন্য বাংলাদেশে পরিবারের কাছে পাঠানো হয়েছে । এর দুদিন পর, ২৫ আগস্ট মঙ্গলবার মধ্যরাতের পরপরই ব্রঙ্কসের মেলরোজ এলাকার ‘১৪৯ গ্রিল’-এ ঢুকে পড়ার অভিযোগ ওঠে অ্যাকোস্টার বিরুদ্ধে।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বন্দুকধারী পিস্তল বের করে ৩৩ বছর বয়সী গ্রাহক টেইভন শুলারকে গুলি করছেন। এরপর ভিডিওতে দেখা যায়, গ্রাহক ও কর্মীরা যখন প্রাণ বাঁচাতে ছোটাছুটি করছেন, তখন বন্দুকধারী কাউন্টারের পেছনে গিয়ে ক্যাশ রেজিস্টার থেকে টাকা চুরি করছেন। ‘প্লাকি’ (Plucky) নামে পরিচিত টেইভন শুলার পরবর্তীতে হাসপাতালে মারা যান। টেইভন শুলারের বন্ধুরা তাঁর কথিত হত্যাকারীর আটকের খবর শুনে অত্যন্ত আনন্দিত হন। মনি (Mon’ee) বলেন, “তার ভাগ্যে যা ঘটেছে, সে তার যোগ্যই ছিল।”

‘ইউনাইটেড বোদেগাস অফ আমেরিকা’-র ফার্নান্দো মাতেও গ্রেপ্তারের খবরে সন্তোষ প্রকাশ করলেও বলেন যে, তিনি যেসব কর্মীর প্রতিনিধিত্ব করেন তাঁদের সুরক্ষায় আরও পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। আকোস্তার বিরুদ্ধে এর আগে ১৩ বার গ্রেপ্তারের ঘটনা রয়েছে; এর শুরুটা হয়েছিল ১৪ বছর বয়সে সংঘটিত একটি সশস্ত্র ডাকাতির মধ্য দিয়ে। সাবওয়ে প্ল্যাটফর্মে এক ব্যক্তিকে গুলি করার দায়ে তিনি রাজ্যের কারাগারে ১০ বছর সাজা ভোগ করেন এবং গত এপ্রিলে প্যারোলে মুক্তি পান।

গ্রেপ্তারের আগে, আকোস্তার অবস্থান শনাক্ত ও তাকে গ্রেপ্তারে সহায়তা করবে এমন তথ্যের জন্য এফবিআই ২৫,০০০ ডলার পর্যন্ত পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। এছাড়া, ‘ইউনাইটেড বোদেগাস অফ আমেরিকা’-ও তাকে গ্রেপ্তারে সহায়ক তথ্যের জন্য ১০,০০০ ডলার পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছিল। পুলিশ আকোস্তার গ্রেপ্তার সংক্রান্ত অতিরিক্ত কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি কিংবা তার বিরুদ্ধে কী কী অভিযোগ আনা হয়েছে, সে বিষয়েও কিছু জানায়নি।

এই দুই হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ব্রুকলিনের ঘটনাটি নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য আলাদা এক বেদনা হয়ে আছে। ইউসুফ ছিলেন রাতের শিফটে কাজ করা একজন অভিবাসী শ্রমজীবী মানুষ। পরিবারের জন্য আয় করতেন, দেশে টাকা পাঠাতেন, নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করছিলেন। অথচ কর্মস্থলে কয়েক সেকেন্ডের বন্দুক হামলায় সেই জীবন থেমে যায়।