২৯শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

যুক্তরাষ্ট্র

বৈধ পথে যুক্তরাষ্ট্রে আসার দরজাও কি বন্ধের পথে? প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নতুন অভিবাসন কড়াকড়ি

বৈধ পথে যুক্তরাষ্ট্রে আসার দরজাও কি বন্ধের পথে? প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নতুন অভিবাসন কড়াকড়ি

যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে অভিবাসনের পথ আরও কঠিন হয়ে উঠছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসন অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ও তা নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি এবার বৈধ অভিবাসনের বিভিন্ন পথেও নতুন বিধিনিষেধ ও বাড়তি যাচাই-বাছাই চালু করছে। সর্বশেষ পদক্ষেপ হিসেবে বিশ্বজুড়ে অভিবাসী ভিসার সাক্ষাৎকার কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, কনস্যুলার কর্মকর্তাদের নতুন নির্দেশনা ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য বিশ্বব্যাপী অভিবাসী ভিসার সাক্ষাৎকারে এই সাময়িক বিরতি দেওয়া হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় আবেদনকারীরা ভবিষ্যতে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন কি না, তা আরও কঠোরভাবে যাচাই করা হবে।

এই সিদ্ধান্তের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে পরিবারভিত্তিক ভিসায় যেতে আগ্রহী অনেক আবেদনকারী অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। মার্কিন নাগরিকদের স্বামী-স্ত্রী, সন্তানসহ বিভিন্ন পারিবারিক অভিবাসী ভিসার আবেদনকারীদের সাক্ষাৎকার পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে। তবে পর্যটক ও শিক্ষার্থীসহ সব ধরনের অ-অভিবাসী ভিসা এই সাময়িক স্থগিতাদেশের আওতায় পড়ছে না।

নতুন কড়াকড়ির বড় একটি বিষয় হলো তথাকথিত ‘পাবলিক চার্জ’ নীতি। এর আওতায় কোনো আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন কি না, সেটি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। আবেদনকারীর আর্থিক সক্ষমতা, শিক্ষা, ইংরেজি ভাষার দক্ষতা, স্বাস্থ্য এবং অন্যান্য পরিস্থিতিও যাচাইয়ের আওতায় আসতে পারে।

এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত অনেক গ্রিন কার্ডপ্রত্যাশীর ক্ষেত্রেও কঠোরতা বাড়িয়েছে। নতুন নির্দেশনার কারণে কিছু আবেদনকারীকে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে নিজ দেশে গিয়ে স্থায়ী বসবাসের আবেদন-প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হতে পারে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে আবেদন দীর্ঘায়িত হওয়ার পাশাপাশি পরিবার বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

শুধু পরিবারভিত্তিক অভিবাসন নয়, কর্মসংস্থানভিত্তিক অভিবাসনও বাড়তি চাপের মুখে পড়েছে। বিভিন্ন কর্মভিসা, গ্রিন কার্ড এবং উচ্চ দক্ষতার কর্মীদের যুক্তরাষ্ট্রে আসার পথেও প্রশাসনিক যাচাই, ফি ও নীতিগত পরিবর্তন বাড়ানো হয়েছে। গবেষকরা বলছেন, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ দক্ষতার কর্মী পাওয়ার আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এদিকে এই কঠোর অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে আদালতেও চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। চলতি মাসে নিউইয়র্কের এক ফেডারেল বিচারক ৭৫টি দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার আগের একটি নীতি বাতিল করে দেন। বিচারকের মতে, শুধু কোনো দেশের নাগরিক হওয়ার কারণে ভিসা প্রক্রিয়া বন্ধ করা অভিবাসন আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে।

তবে আদালতের এই সিদ্ধান্তের পরও প্রশাসনের নতুন বৈশ্বিক ভিসা সাক্ষাৎকার স্থগিতাদেশ দেখিয়ে দিচ্ছে যে বৈধ অভিবাসনের ওপর কড়াকড়ি কমছে না। বরং নতুন প্রশিক্ষণ ও যাচাইয়ের মাধ্যমে ভিসা দেওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও কঠোর করার চেষ্টা চলছে।

এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে আগে বৈধভাবে প্রবেশ করা কিছু বিদেশির ভিসা বাতিলের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। প্রশাসন এমন প্রায় ২ লাখ মানুষের ব্যবসা ও পর্যটন ভিসা বাতিলের পরিকল্পনা করছে, যারা ভিজিটর ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর আশ্রয়ের আবেদন করেছেন বা করছেন। প্রশাসনের যুক্তি, অস্থায়ী ভিসার সুযোগ ব্যবহার করে স্থায়ীভাবে থাকার প্রবণতা ঠেকাতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে আসার সব দরজা বন্ধ হয়ে গেছে।

পরিবারভিত্তিক অভিবাসন, কর্মসংস্থান, শিক্ষার্থী ও অন্যান্য বৈধ ভিসার পথ এখনো রয়েছে। কিন্তু আগের তুলনায় আবেদনকারীদের জন্য যাচাই-বাছাই, আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ, কাগজপত্র এবং সাক্ষাৎকারের গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে।

বাংলাদেশিদের জন্যও এসব পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে পরিবারভিত্তিক অভিবাসী ভিসার অপেক্ষায় থাকা আবেদনকারীদের সাক্ষাৎকারের সময়সূচি ও প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসতে পারে। তাই কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট বা অনানুষ্ঠানিক তথ্যের ওপর নির্ভর না করে মার্কিন দূতাবাস, পররাষ্ট্র দপ্তর ও ইউএসসিআইএসের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি।

ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান নীতির লক্ষ্য শুধু অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ নেই; বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ ও স্থায়ীভাবে বসবাসের প্রক্রিয়াতেও কঠোর যাচাই আরোপ করা হচ্ছে। ফলে বৈধ অভিবাসনের দরজা পুরোপুরি বন্ধ না হলেও, সেই দরজা দিয়ে প্রবেশের প্রক্রিয়া আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন ও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।