গত সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) ওভাল অফিসে বসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন আইওয়া-তে ১৫ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল ইস্পাত কারখানা নির্মাণের ঘোষণা দিচ্ছিলেন, তখন তার পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন মূলত যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিকরা। তবে সেখানে একজন ব্যতিক্রম ছিলেন: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ডান কাঁধের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা এক ভারতীয় ব্যক্তি।
রবি রুইয়া নামক এই ব্যক্তি এসার গ্রুপের সহ-প্রতিষ্ঠাতা। এই গ্রুপেরই মালিকানাধীন, মিনেসোটা-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান “মেসাবি মেটালিকস” ইস্পাত কারখানাটি নির্মাণ করছে। এটি হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় কারখানা। এর এক দশক আগে, ২০১৬ সালের অক্টোবরে, আরেকটি বড় চুক্তি স্বাক্ষরের সময় তার ভাই শশী রুইয়া আরেকজন প্রেসিডেন্টের সাথে ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি হয়েছিলেন, তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
এসার গ্রুপের কার্যক্রম কেবল ইস্পাত ও ধাতব শিল্পেই সীমাবদ্ধ নয়। এই বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী অনেক বছর ধরে জ্বালানি তেলের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল। এরপর ২০১৬ সালে তারা ভারতের অন্যতম বৃহৎ একটি বেসরকারি তেল শোধনাগার একটি রুশ-নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়ামের কাছে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারে বেচে দেয়। এসার অয়েল-এর নাম বদলে তখন নতুন নাম রাখা হয় নায়ারা এনার্জি।
নায়ারা এনার্জির অর্ধেক মালিকানা এখন রাশিয়ার বৃহৎ জ্বালানি কোম্পানি রোসনেফটের হাতে। ইউক্রেনে মস্কোর যুদ্ধের জেরে কোম্পানিটির ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এমন এক সময়ে নায়ারা রাশিয়ায় পেট্রোলিয়াম পণ্য সরবরাহকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যখন ইউক্রেনের একাধিক হামলার শিকার হয়ে রাশিয়ার তেল ও গ্যাস ডিপোগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে জ্বালানি সংকটে পড়েছে।
৯৯ বছর মেয়াদি চুক্তির আওতায় নায়ারা ভারতে এখনও এসারের ব্র্যান্ডিং ব্যবহার করে যাচ্ছে। কোম্পানিটি কয়েক হাজার পেট্রোল পাম্প পরিচালনা করে। নায়ারা এনার্জির ওপর ইউরোপীয় ইউনিয়নেরও (ইইউ) নিষেধাজ্ঞা আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে আইওয়ার এই ইস্পাত প্রকল্পটির কথা জানানো হলো। হোয়াইট হাউস একে আমেরিকানদের জন্য বিশাল অর্থনৈতিক বিজয় হিসেবে প্রচার করে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে: এর ফলে শত শত কর্মসংস্থান তৈরি হবে, আয় হবে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের রাজস্ব। তাছাড়া এই ইস্পাত প্রকল্প রাশিয়া-কেন্দ্রিক যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কোনো নিয়ম লঙ্ঘন করছে—এমন কোনো প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
তবে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা রুশ বিনিয়োগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত একটি ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই মেগাপ্রকল্প ঘোষণার বিষয়টি এক ভিন্ন বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে আসে। এ ঘটনা থেকেই স্পষ্ট, নজিরবিহীন অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের কর্মসূচির পরও রাশিয়াকে অর্থনৈতিকভাবে একঘরে করতে যুক্তরাষ্ট্র কতটা হিমশিম খাচ্ছে।
আর এই ইস্পাত কারখানা ঘোষণার সময় নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কারণ ট্রাম্প এমন এক আইনে সই করার মাত্র কয়েকদিন পর এই ঘোষণা এল, যে আইনে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা দেশগুলোর ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্কারোপ করে তাদের শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা তাকে দেওয়া হয়েছে। আর ভারত হলো রাশিয়ার তেলের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রেতা। তবে রাশিয়ার জ্বালানি খাতের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের অন্যতম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত যে ভারতীয় শিল্পগোষ্ঠী, তারাই এখন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম ইস্পাত কারখানা গড়ে তোলার পেছনে রয়েছে।
এই ইস্পাত কারখানা প্রকল্প আসলে কী?
নতুন এই প্রকল্পের মাধ্যমে মিনেসোটার মেসাবি আয়রন রেঞ্জে প্রতিষ্ঠানটির আকরিক লোহা উত্তোলন কার্যক্রমকে আইওয়া স্টেটে প্রস্তাবিত নতুন ইস্পাত কমপ্লেক্সের সঙ্গে যুক্ত করা হবে।
হোয়াইট হাউস ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, আইওয়ার এই ইস্পাত কারখানায় অন্তত ১ হাজার ৭৫০টি স্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি হবে। পাশাপাশি এটি ‘আইওয়া ও মিডওয়েস্ট অঞ্চলজুড়ে বিভিন্ন সরবরাহকারী ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ অব্যাহত রাখবে’। এছাড়া কারখানাটি নির্মাণকালে প্রায় ৬ হাজার কর্মসংস্থান হবে।
ওয়াশিংটন আরও জানিয়েছে, প্রথম দফায় এ কারখানায় বছরে ৭৫ লাখ টন ইস্পাত উৎপাদন হবে। পরে তা ১ কোটি টনে উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কারখানাটিতে ২০৩০ সাল নাগাদ উৎপাদন শুরুর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। হোয়াইট হাউসের তথ্যমতে, নির্মাণকালে ও কার্যক্রম শুরুর প্রথম ১০ বছরে সব মিলিয়ে প্রায় ৯৫ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলবে এই প্রকল্পের প্রথম পর্যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক সাংবাদিকদের বলেন, ‘অনুযায়ী ইস্পাত পণ্যের ওপর যে শুল্ক বসানো হয়েছে, এটি মূলত তারই ফলাফল। ওই শুল্কগুলো না থাকলে এই খনি ও ইস্পাত কারখানা কখনোই গড়ে উঠত না।”
এতে সুর মিলিয়ে ট্রাম্পও বলেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই আমি সব ধরনের বিদেশি ইস্পাতের ওপর ৫০ শতাংশ ভারী শুল্কারোপ করেছিলাম। তারই ফল হিসেবে আমাদের ইস্পাত শিল্প এখন আবার দারুণভাবে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। সবাই এখন শুল্ক এড়ানোর জন্যই খোদ আমেরিকায় কারখানা তৈরি করছে।’
রাশিয়ার সঙ্গে এসারের সম্পর্ক কেমন?
এসার গ্রুপের জ্বালানি শাখা এসার অয়েল ২০০৮ সালে ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য গুজরাটের উপকূলে অবস্থিত ভাদিনার শোধনাগারে অপরিশোধিত তেল পরিশোধন শুরু করে।
কিন্তু ২০১৬ সাল নাগাদ প্রতিষ্ঠানটি বিপুল ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়ে। ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অভ ইন্ডিয়া তাদের ঋণখেলাপির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। ফলে তেল ব্যবসা বিক্রির জন্য মরিয়া হয়ে উপযুক্ত ক্রেতা খুঁজছিল তারা। সময়টাও ছিল বেশ অনুকূল। কারণ ঠিক সেই সময়েই বিদেশি পুঁজি টানার জন্য রাশিয়ার শীর্ষ জ্বালানি প্রতিষ্ঠান রোসনেফটের কিছু শেয়ার বিক্রি করার পথ খুঁজছিলেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
এ পরিস্থিতিতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে একের পর এক চুক্তির পথ সুগম করেন তিনি, যা রোসনেফট ও এসার উভয় পক্ষের জন্যই লাভজনক হয়। প্রথমে ভারতের সরকারি তেল কোম্পানিগুলো রোসনেফটের শেয়ার কেনে, যার ফলে রুশ প্রতিষ্ঠানটির প্রয়োজনীয় নগদ অর্থের সংস্থান হয়। এরপর রোসনেফট অন্যান্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে জোট বেঁধে ভাদিনার শোধনাগার কিনে নেয়। এর মধ্য দিয়ে বিশাল ঋণ থেকে মুক্তি পায় এসার।
এসার অয়েল হয়ে যায় নায়ারা এনার্জি। এই কোম্পানিতে রাশিয়ার রোসনেফটের মালিকানা ৪৯ শতাংশ ও রুশ সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড ক্যাপিটাল পার্টনার্সের রয়েছে আরও ৪৯ শতাংশ শেয়ার। এ চুক্তির জন্য ক্রেতারা এসারকে ১২.৯ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করে। চুক্তির অংশ হিসেবে নায়ারা ভারতে নিজেদের হাজার হাজার পেট্রোল পাম্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ৯৯ বছরের জন্য এসারের ব্র্যান্ডিং ব্যবহারের স্বত্ব পায়।
নায়ারা কি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার আওতায় আছে?
হ্যাঁ। রুশ তেলের বিরুদ্ধে ইইউ গত বছরের জুলাইয়ে নায়ারার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ফলে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ব্যবহার করে প্রক্রিয়াজাত করা পেট্রোলিয়াম পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ হয়। সেইসঙ্গে শোধনাগারটির জন্য ইইউর শিপিং ইন্স্যুরেন্স, আর্থিক ও অন্যান্য সেবার সুযোগও সীমিত করা হয়।
নিষেধাজ্ঞার পর অন্যান্য সরবরাহকারী সরে গেলে ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত নায়ারার ভাদিনার শোধনাগারটি কেবল রাশিয়ার তেল পরিশোধন শুরু করে। তখন থেকেই অপরিশোধিত তেল আমদানি ও পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানির জন্য আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীদের ওপর নির্ভর করে আসছে নায়ারা।
চলতি বছরের জুলাইয়ে রাশিয়ার বিভিন্ন তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলার পর দেশটিতে জ্বালানি সংকট দেখা দিলে রাশিয়ার কাছেই পেট্রোলিয়াম বিক্রি করে নায়ারা এনার্জি।
গত কয়েক মাসে ইউক্রেন রাশিয়ার তেল স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়ে সেগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। ফলে রাজধানী মস্কোসহ পুরো দেশজুড়ে জ্বালানির জন্য দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশ রাশিয়ার জন্য এই সংকট ছিল নজিরবিহীন। এ সংকটের জেরে অনেক অঞ্চলে জ্বালানি রেশনিং করতে হয়েছে।
রাশিয়ার সঙ্গে এমন সম্পর্কের কারণে নায়ারা এনার্জি আরও বৃহত্তর নজরদারির মুখে পড়ে। নিষেধাজ্ঞা ও ইইউর আইনের বাধ্যবাধকতার কথা উল্লেখ করে এসএপি-সহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এই শোধনাগারকে সেবা দেওয়া স্থগিত করে।
নায়ারা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দিল্লি হাইকোর্টে আপিল করলে চলতি মাসের শুরুর দিকে আদালত এসএপি ইন্ডিয়াকে সেবা ফের চালু করার নির্দেশ দেয়।এসার বা এই ইস্পাত কারখানা কি কোনো নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করছে? নায়ারা ইইউর নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকলেও এসারের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র বা ইইউর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
২০১৬ সালের অক্টোবরে ভাদিনার শোধনাগার বিক্রির জন্য রোসনেফট ও ইউনাইটেড ক্যাপিটাল পার্টনার্সের সাথে এসার যখন চুক্তি করে, তখন ওবামা প্রশাসনের অধীন যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছিল, এই চুক্তি কোনো নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করেনি। মেসাবি-তে এসারের বিনিয়োগ কিংবা আইওয়াতে ইস্পাত কারখানা নির্মাণের প্রস্তাবিত বিনিয়োগে কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের প্রমাণ মেলেনি।
তবে কিংস কলেজ লন্ডনের সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (সিএসএসএস) নিষেধাজ্ঞাবিষয়ক গবেষক ঋষিকা চৌহান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে এসারের এই বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানটিকে ‘আমেরিকান চাপের (আর্ম-টুইস্টিং) সামনে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। কারণ এখন যুক্তরাষ্ট্রে এই বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর সম্পদ ও বিনিয়োগের ওপর অনায়াসে নিষেধাজ্ঞা ও অন্যান্য ব্যবস্থা নেওয়া যাবে; তাদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আইনও প্রয়োগ করা যাবে।’
ঋষিকা চৌহান বলেন, রাশিয়া ও ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞায় ‘এমন বিধান আছে, যার আওতায় রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি কেনে কিংবা রাশিয়ান তেলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দিতে সহায়তা করে—এমন নির্দিষ্ট দেশ থেকে পণ্য আমদানিকারী রাষ্ট্রগুলোর ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করা যেতে পারে।’
আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘এসার নিশ্চিতভাবেই এসব নিয়ম ও যুক্তরাষ্ট্রের আরও বহু নিষেধাজ্ঞা আইন ও নির্বাহী আদেশের আওতায় চলে আসতে পারে। প্রক্রিয়াটি অতটা সহজ নয়, তবে ট্রাম্প নিজের স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে প্রায়ই নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ককে ব্যবহার করে থাকেন।’রাশিয়ার সঙ্গে এসারের এই সম্পর্ক অন্যান্য দেশেও বিশেষ নজরদারির মুখে পড়েছে।
রুশ ক্রেতাদের কাছে ভাদিনার শোধনাগার বিক্রির সময় রাশিয়ার ভিটিবি ব্যাংক ঋণ পুনর্গঠনের জন্য এসারকে ৩.৯ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছিল। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সর্বাত্মক আগ্রাসন শুরুর পরপরই ব্যাংকটির ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউর বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। গার্ডিয়ান ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা প্ল্যাটফর্ম সোর্সম্যাটেরিয়ালের ২০২৬ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ভিটিবি ব্যাংকের সেই ঋণ ট্যাক্স হ্যাভেন মরিশাসে সরিয়ে নেয় এসার।
ইস্পাত কারখানা ঘোষণার সময়টি কেন তাৎপর্যপূর্ণ?
নভেম্বরে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনে লড়তে যাচ্ছে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি ও ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগের মুখে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা এযাবৎকালের সর্বনিম্নে নেমে গেছে।
দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প শুল্কারোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন খাতের পুনরুজ্জীবনকে তার অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির মূল ভিত্তি বানিয়েছেন। তার দাবি, আমদানির ওপর কঠোর বাধা তৈরি করলে বিনিয়োগ আবারও যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসবে।
তাছাড়া ওয়াশিংটন এমন একটি আইনও এনেছে, যার মাধ্যমে রাশিয়া বা ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক রাখা দেশগুলোর পণ্য আমদানির ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্কারোপের ক্ষমতা প্রেসিডেন্টকে দেওয়া হয়েছে। রাশিয়ার জ্বালানি ক্রেতাদের ওপর চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যেই এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এর ফলে নয়াদিল্লি বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। কারণ ইউক্রেনে আগ্রাসনের পর ভারতই কম দামে বিক্রি হওয়া রাশিয়ান অপরিশোধিত তেলের অন্যতম বৃহৎ ক্রেতা হয়ে উঠেছিল। এই ইস্যুতে ২০২৫ সালে ভারত থেকে পণ্য আমদানির ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিলেন ট্রাম্প। পরে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল কেনা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিলে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি সেই শুল্ক প্রত্যাহার করে নেন।
যুক্তরাষ্ট্রের শাস্তির হুমকি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তেল কেনা কিছুটা কমলেও রাশিয়াই ভারতের জন্য অপরিশোধিত তেলের সবচেয়ে বড় উৎস রয়ে গেছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদন অনুসারে, আগস্টে রাশিয়া থেকে প্রতিদিন প্রায় ২১ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে ভারত।
ট্রাম্পের আমেরিকায় বিনিয়োগের কী ধরনের সুবিধা মিলতে পারে, তা বোঝার মতো একটি সাম্প্রতিক উদাহরণও রয়েছে। চলতি বছরের মে মাসে ভারতীয় ধনকুবের গৌতম আদানির বিরুদ্ধে দায়ের করা ফৌজদারি জালিয়াতি ও ঘুষের অভিযোগ খারিজ করার উদ্যোগ নেয় ওয়াশিংটন। এর আগে আদানির আইনজীবীরা দেশটির বিচার বিভাগকে জানিয়েছিলেন, তার শিল্পগোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্রে ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত। পরে আগস্টে একজন ফেডারেল বিচারক মামলাটি খারিজ করে দেন।
ঋষিকা বলেন, ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্রে মূলধনি বিনিয়োগ হয়তো রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে চাওয়া কোম্পানিগুলোকে একধরনের সুবিধা দেয়, কিন্তু এটি ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞা ও শুল্কের অস্ত্র প্রয়োগ থেকে কোনো স্থায়ী সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেয় না।













