৮ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

অর্থনীতি

প্রবাসীদের চাহিদায় বাংলাদেশের ফল রপ্তানিতে রেকর্ড, ১১ মাসে আয় ১২.৩ কোটি ডলার

প্রবাসীদের চাহিদায় বাংলাদেশের ফল রপ্তানিতে রেকর্ড, ১১ মাসে আয় ১২.৩ কোটি ডলার

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে আম, পেয়ারা, কাঁঠালসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন দেশীয় ফলের চাহিদা বাড়ায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে দেশের ফল রপ্তানি রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।
চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সময়ে ফল রপ্তানি করে বাংলাদেশ ১২ কোটি ৩০ লাখ ২০ হাজার ডলার আয় করেছে। আগের অর্থবছর ২০২৪-২৫-এর পুরো বছরে এ খাত থেকে আয় হয়েছিল ৬ কোটি ৭৫ লাখ ১০ হাজার ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে ফল রপ্তানি থেকে আয় ৮২ শতাংশের বেশি বেড়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এটিই ফল রপ্তানি থেকে দেশের সর্বোচ্চ আয়। গত তিন অর্থবছর ধরে এ খাতে দ্রুত প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ফল রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ২ কোটি ৯২ লাখ ৪০ হাজার ডলার, যা ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল মাত্র ১০ লাখ ৬০ হাজার ডলার।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবদুল ওয়াহেদ বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের ফল মূলত মধ্যপ্রাচ্য এবং প্রবাসী বাংলাদেশি অধ্যুষিত ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমাদের অধিকাংশ রপ্তানি প্রবাসী বাংলাদেশিদের চাহিদা পূরণ করে। আমরা এখনও আন্তর্জাতিক মূলধারার ফলের বাজারে প্রবেশ করতে পারিনি, কারণ বৈশ্বিক ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী মান-অনুবর্তিতা, প্যাকেজিং ও ব্র্যান্ডিংয়ে আমরা এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারিনি।”

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক খাদ্য নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণে উন্নতি, রপ্তানিমুখী ফল চাষের সম্প্রসারণ এবং বিদেশি বাজারে প্রবেশাধিকারের সুযোগ ফল রপ্তানি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ‘বাদাম, তাজা বা শুকনো’ শ্রেণির পণ্য থেকে রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ এসেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে এ খাত থেকে আয় হয়েছে ১২ কোটি ২৮ লাখ ১৮ হাজার ডলার, যেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আয় ছিল ৬ কোটি ৬০ লাখ ৫০ হাজার ডলার।

এছাড়া হিমায়িত ফল ও বাদাম রপ্তানি থেকে আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৮২১ ডলারে। তাজা ফলের রপ্তানিও সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। রপ্তানিকারকদের মতে, গ্রীষ্ম মৌসুমে আম এখনো দেশের প্রধান রপ্তানি ফল। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, ওমান, কুয়েত, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে এর চাহিদা বেশি।

উন্নত মান ও প্রতিযোগিতামূলক দামের কারণে পেয়ারা ও কাঁঠালও জনপ্রিয়তা পেয়েছে। পাশাপাশি আনারস, লিচু, কলাসহ অন্যান্য মৌসুমি ফলের চাহিদাও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের ফল সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, ওমান, কুয়েত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি দেশসহ বিভিন্ন গন্তব্যে রপ্তানি হচ্ছে।

ইপিবির পরিচালক কুমকুম সুলতানা বলেন, বাংলাদেশে ফল চাষে, বিশেষ করে পার্বত্য জেলাগুলোতে, উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। তিনি বলেন, “পার্বত্য অঞ্চলে এক ধরনের ফল বিপ্লব ঘটছে। ড্রাগন ফল, কাজুবাদাম ও কফির মতো ফসলের চাষ দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে, যা সত্যিই আশাব্যঞ্জক।” তিনি আরও বলেন, অবকাঠামোগত সহায়তা বাড়ানো গেলে ফল রপ্তানি আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।

তার ভাষ্য, “প্যাকিং শেড, ফসলোত্তর প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা এবং অন্যান্য মৌলিক অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা গেলে রপ্তানিকারকেরা আন্তর্জাতিক বাজারের আরও বেশি সুযোগ কাজে লাগাতে পারবেন।”
ইপিবির সহসভাপতি মোহাম্মদ হাসান আরিফ বলেন, ফল রপ্তানি দেশের অর্থনীতিতে বেশি অবদান রাখে, কারণ এ খাত মূলত দেশীয় কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল। তিনি বলেন, “অন্যান্য অনেক খাতের মতো ফল উৎপাদনে আমদানিনির্ভর উপকরণের প্রয়োজন খুব বেশি হয় না।”

তিনি আরও জানান, রপ্তানি বাজারে আরও বেশি কৃষক ও উদ্যোক্তাকে যুক্ত করতে কাজ করছে ইপিবি। খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, কোল্ড-চেইন ব্যবস্থা, আধুনিক প্যাকেজিং সুবিধা এবং উন্নত ফসলোত্তর ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগের ফলে পণ্যের মান ও সংরক্ষণক্ষমতা বেড়েছে।, তারা আরও বলেন, রপ্তানিযোগ্য মানের ফলের স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করতে বেসরকারি কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠান এবং চুক্তিভিত্তিক চাষের ভূমিকা ক্রমেই বাড়ছে।

লজিস্টিকস এখনো বড় চ্যালেঞ্জ
ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট, কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ পর্যবেক্ষণ এবং পণ্যের উৎস শনাক্তকরণ (ট্রেসেবিলিটি) ব্যবস্থা চালুর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতাদের আস্থা বেড়েছে। তবে রপ্তানিকারকদের মতে, লজিস্টিকস-সংক্রান্ত সমস্যাগুলো এখনো বড় বাধা হয়ে রয়েছে। উচ্চ বিমান ভাড়া, মৌসুমে কার্গো পরিবহনের সীমিত সুযোগ, পর্যাপ্ত শীতাতপনিয়ন্ত্রিত পরিবহন ব্যবস্থার অভাব এবং শুল্ক প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা রপ্তানি বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবদুল ওয়াহেদ বলেন, গত বছর জেলা থেকে প্রায় ১০ হাজার টন আম রপ্তানি হয়েছে। চলতি মৌসুমে এর পরিমাণ আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি বলেন, “কোয়ারেন্টিন সনদ প্রদান ও প্যাকেজিং সুবিধাসহ অধিকাংশ রপ্তানিসংশ্লিষ্ট সেবা ঢাকাকেন্দ্রিক। এসব সুবিধা বিভাগীয় পর্যায়ে থাকলে রপ্তানি আরও সহজ ও ব্যয়সাশ্রয়ী হতো।” তিনি আরও বলেন, পরিবহন ব্যয় কমানো এবং রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজ করা গেলে ফল রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব। খাতসংশ্লিষ্টদের আশা, আম রপ্তানির মৌসুম পুরোদমে চলতে থাকায় অর্থবছর শেষ হওয়ার আগে ফল রপ্তানি থেকে আয় আরও বাড়বে।সংবাদ সুত্র দ‍্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড