


আজকের এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে, যার মধ্য দিয়ে গোটা বিশ্বের মতো কানাডাও যাচ্ছে, আপনাদের সঙ্গে থাকতে পারা একই সঙ্গে আনন্দ ও কর্তব্য বলে মনে করি। আজ আমি বিশ্বব্যবস্থা যে বিঘ্নের সম্মুখীন তার সঙ্গে একটি দারুণ কল্পকাহিনির অবসান ও কঠোর বাস্তবতার সূচনা নিয়ে কথা বলব। এই নতুন বাস্তবতায় ভূ-রাজনীতি এবং বড় ও প্রধান শক্তি কোনো সীমা মানছে না। তার মধ্যে কোনো সংযম নেই।
অন্যদিকে আপনাদের বলতে চাই, অন্য দেশগুলো, বিশেষ করে কানাডার মতো মধ্যবর্তী দেশগুলো শক্তিহীন নয়। তাদের এমন এক নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলার সক্ষমতা রয়েছে, যেখানে মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা, টেকসই উন্নয়ন, সংহতি, সার্বভৌমত্ব এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের আঞ্চলিক অখণ্ডতার মতো আমাদের মূল্যবোধ জায়গা পাবে। অপেক্ষাকৃত কম ক্ষমতাধর শক্তির শুরু হয় সততা দিয়ে। মনে হচ্ছে, প্রতিদিন আমাদের মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে, আমরা বৃহৎ শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার যুগে বাস করছি; নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা ম্লান হচ্ছে; শক্তিশালীরা যা ইচ্ছা তাই করতে পারে; আর দুর্বলদের কেবল দুর্ভোগ পোহাতে হবে। থুসিডাইডিসের সেই উক্তিটি এখানে এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যেন এটাই স্বাভাবিক। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটাই এখন স্বাভাবিক যুক্তি।
এই যুক্তির মুখোমুখি হয়ে দেশগুলোর মধ্যে মেনে চলা কিংবা মানিয়ে নেওয়া এবং ঝামেলা এড়ানোর এক জোরালো প্রবণতা দেখা দিয়েছে, যেন সম্মতিই তাদের নিরাপত্তা নিয়ে আসবে। বেশ, কিন্তু তাতে কাজ হচ্ছে না। তাহলে আমাদের হাতে আর কী কী বিকল্প আছে? ১৯৭৮ সালে চেক প্রজাতন্ত্রের ভিন্নমতাবলম্বী এবং পরবর্তী সময়ে প্রেসিডেন্ট ভাক্লাভ হ্যাভেল ‘শক্তিহীনদের শক্তি’ নামে একটা প্রবন্ধ লিখেছিলেন। এতে তিনি একটি সহজ প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন। কমিউনিস্ট ব্যবস্থা কীভাবে নিজেকে টিকিয়ে রেখেছিল?
তার উত্তরটা শুরু হয়েছিল এক সবজি বিক্রেতাকে দিয়ে। প্রতিদিন সকালে এই দোকানদার তাঁর জানালায় একটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাখে। সেখানে লেখা থাকে, ‘বিশ্বের শ্রমিকরা ঐক্যবদ্ধ হও’। সে এটা বিশ্বাস করে না; কেউ করে না। কিন্তু ঝামেলা এড়াতে, সম্মতির ইঙ্গিত দিতে, একসঙ্গে থাকার জন্য এই সাইনবোর্ডটি ঝুলিয়ে রাখত। যেহেতু প্রতিটি রাস্তার প্রত্যেক দোকানদার একই কাজ করে, তাই ব্যবস্থাটি টিকে থাকে। এই টিকে থাকাটা কেবল সহিংসতার মাধ্যমে নয়, বরং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের মাধ্যমে, যা তারা গোপনে মিথ্যা বলে জানে। হ্যাভেল এটিকে ‘মিথ্যার মধ্যে বসবাস’ বলে অভিহিত করেছেন।
এই ব্যবস্থার শক্তি আসে তার সত্যতা থেকে নয়, বরং সবার ইচ্ছা থেকে, যেন এটি সত্য। আর এর ভঙ্গুরতাও আসে একই উৎস থেকে। যখন একজন ব্যক্তি কাজ বন্ধ করে দেয়, যখন সবজি বিক্রেতা তার সাইনবোর্ডটি সরিয়ে ফেলে, তখন ভুল ভাঙতে শুরু করে। বন্ধুরা, এখন সময় এসেছে কোম্পানি ও দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে যেসব সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রেখেছে সেগুলো সরিয়ে ফেলার। কয়েক দশক ধরে আমরা যাকে নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা বলে অভিহিত করেছি, তার অধীনে সমৃদ্ধ হয়েছে কানাডার মতো বহু দেশ। আমরা এর প্রতিষ্ঠানগুলোতে যোগদান করেছি, এর নীতিগুলোর প্রশংসা করেছি এবং তাদের দেওয়া ভবিষ্যৎ পথরেখা থেকেও উপকৃত হয়েছি। এ কারণে আমরা এর সুরক্ষার ভিত্তিতে মূল্যবোধভিত্তিক বৈদেশিক নীতি অনুসরণ করতে পারি।
আমরা জানতাম যে আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার গল্পটি আংশিকভাবে মিথ্যা ছিল। যেমন সবচেয়ে শক্তিশালীরা যখন সুবিধাজনক অবস্থায় থাকবে, তখন প্রতিকূল ব্যাপারগুলো থেকে নিজেদের অব্যাহতি দেবে এবং বাণিজ্য নিয়মগুলো অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে প্রয়োগ করা হবে। আমরা এও জানতাম, আন্তর্জাতিক আইন ছিল বৈষম্যমূলক। অভিযুক্ত বা ভুক্তভোগীর পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে শাস্তি বা কঠোরতার মাত্রা প্রয়োগ করা হতো। এই কল্পকাহিনিটি কার্যকর ছিল যে, বিশেষ করে মার্কিন আধিপত্য জনসাধারণের পণ্য, উন্মুক্ত সমুদ্রপথ, একটি স্থিতিশীল আর্থিক ব্যবস্থা, যৌথ নিরাপত্তা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য কাঠামো হিসেবে সহায়তা করেছিল। তাই আমরাও জানালায় সাইনবোর্ডটি স্থাপন করেছিলাম; তাদের আচার-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিলাম। মূলত আমরা বাগ্মিতা ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধানগুলো এড়িয়ে গিয়েছিলাম। এই দর কষাকষি আর কাজ করছে না। আমাকে বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে বলার অনুমতি দিলে বলব, আমরা একটি চিড় ধরা ব্যবস্থার মধ্যে আছি; রূপান্তরের মধ্যে নয়।
গত দুই দশক ধরে অর্থ, স্বাস্থ্য, জ্বালানি এবং ভূ-রাজনীতির একের পর এক সংকট অতি বিশ্বায়নের ঝুঁকি উন্মোচন করেছে। কিন্তু অতি সম্প্রতি বৃহৎ শক্তিগুলো অর্থনৈতিক বিশ্বায়নকে অস্ত্র হিসেবে, শুল্ককে সুবিধা হিসেবে, আর্থিক অবকাঠামোকে জবরদস্তি হিসেবে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলকে শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার শুরু করেছে। একীভূতকরণ যখন অধীনতা আরোপ করার উপায় হয়ে যায়, তখন একীভূতকরণ পারস্পরিক সুবিধা আনবে– এমন মিথ্যার মধ্যে বেশি দিন বাস করা যায় না।
মধ্যম শক্তিগুলো যে বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভর করেছে, সেগুলোর কাঠামো এখন হুমকির মুখে। এসব প্রতিষ্ঠান এখন কার্যকরভাবে কোনো সমাধান দিতে পারে না। যেমন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা, জাতিসংঘ, কপ। ফলে অনেক দেশ একই সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছে– তাদের অবশ্যই শক্তি, খাদ্য, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, অর্থ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে বৃহত্তর কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন দরকার হয়ে পড়েছে। আর এই প্রবণতার কারণ এখন বোঝা যায়। যে দেশ নিজেকে খাওয়াতে পারে না; নিজের জ্বালানি জোগাড় করতে পারে না বা নিজেকে রক্ষা করতে পারে না, তার কাছে স্বাভাবিকভাবে খুব বেশি সুযোগ নেই। যখন নিয়মগুলো আর আপনাকে রক্ষা করতে পারে না, তখন নিজেকেই রক্ষা করতে হবে। তবে আসুন, আমরা স্পষ্টভাবে খেয়াল রাখি, এ পরিস্থিতি আমাদের কোন দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
দুর্গ নিয়ে গঠিত বিশ্ব দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হবে। ধীরে ধীরে আরও ভঙ্গুর ও দুর্বল হয়ে পড়বে। আরেকটি সত্য আছে। যদি বৃহৎ শক্তিগুলো তাদের ক্ষমতা ও স্বার্থের জন্য নিয়ম, মূল্যবোধের ভানও পরিত্যাগ করে, তাহলে পারস্পরিক লেনদেন থেকে প্রাপ্ত সুবিধাগুলো ভাগাভাগি করা কঠিন হয়ে পড়বে। আধিপত্যবাদীরা তাদের সম্পর্ককে অব্যাহতভাবে অর্থনৈতিক মুনাফার উৎসে পরিণত করতে পারবে না। মিত্ররা অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে রক্ষাকবচ হিসেবে বৈচিত্র্যের সন্ধান করবে। তারা বীমা কিনবে, সার্বভৌমত্ব পুনর্গঠনের বিকল্প পন্থা খুঁজবে, যে সার্বভৌমত্ব একসময় ছিল নিয়মের ওপর নির্ভরশীল, ইদানীং ক্রমবর্ধমান চাপ সহ্য করার ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এটি ক্ল্যাসিক বা চিরায়ত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বিষয়। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিদ্যার যেমন মূল্য রয়েছে, তেমনি কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের মূল্যের মতো সার্বভৌমত্বের মূল্যও ভাগাভাগি হতে পারে।
আঘাতের মুখে টিকে থাকার ক্ষমতা অর্জনের জন্য সম্মিলিত বিনিয়োগ প্রত্যেকের আলাদা নিজস্ব দুর্গ তৈরির চেয়ে সস্তা। সবাই একই গুণমান বজায় রাখলে বিচ্ছিন্নতা ও ভাঙনের আশঙ্কা কমে আসে। পরিপূরকতা ইতিবাচক যোগফল হিসেবেই ভূমিকা রাখে। কানাডার মতো মধ্যম শক্তির জন্য প্রশ্নটি নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া কিনা– এ প্রশ্ন অর্থহীন। তাকে অবশ্যই এমনটা করতে হবে। প্রশ্ন হলো– আমরা কি কেবল উঁচু দেয়াল তৈরি করে খাপ খাইয়ে নিতে পারি, নাকি আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী কিছু করতে পারি। কানাডা প্রথম দেশগুলোর মধ্যে একটি, যারা জাগরণের ডাক শুনেছিল, যা আমাদের কৌশলগত অবস্থানকে মৌলিকভাবে পরিবর্তনে ধাবিত করেছিল।
ক্ষমতাবানদের ক্ষমতা আছে। কিন্তু আমাদেরও কিছু একটা আছে। ভান বন্ধ করে নৈতিকতা ও বাস্তবভিত্তিক পদ্ধতি গড়ে তোলা; নিজ দেশে আমাদের শক্তি ও সক্ষমতা গড়ে তোলা এবং একসঙ্গে কাজ করার ক্ষমতা অর্জন করা। এটাই কানাডার পথ। আমরা খোলাখুলি ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এটি বেছে নিই। আর এটি এমন একটি পথ, যা উন্মুক্ত এবং আগ্রহীরা যে কেউ এটি গ্রহণ করতে পারেন।
মার্ক কার্নি: কানাডার প্রধানমন্ত্রী; ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে তাঁর দেওয়া
ভাষণের সংক্ষেপিত ভাষান্তর













