এস্টোরিয়া ও লং আইল্যান্ড সিটি নিয়ে গঠিত বহুল প্রত্যাশিত নিউ ইয়র্ক স্টেট এসেম্বলী ডিষ্ট্রিক্ট ৩৬ এর নির্বাচন অবশেষে শুরু হয়েছে। শনিবার ২৪ জানুয়ারী থেকে শুরু হচ্ছে আগাম নির্বাচন। ৩ ফেব্রুয়ারী মঙ্গলবার নির্বাচনের চুড়ান্ত দিন। এই নির্বাচনে ইতিহাস সৃষ্টির লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছে বাংলাদেশী কমিউনিটি। এজন্য একমাত্র বাংলাদেশী- আমেরিকান প্রার্থী মেরী জুবাইদাকে নির্বাচিত করতে সবাইকে এগিয়ে আসার আহŸান জানিয়েছে মেরী জুবাইদা ক্যাম্পেইন। কমিউনিটি নেতা ও ক্যাম্পেইনের অন্যতম পরিচালক জেমস করজা, ডিয়াগো, আমীন মেহদী, জাবেদ উদ্দীন ও জাহাঙ্গীর আলম এক বিবৃতিতে বলেছেন, ইতিহাস সৃষ্টির প্রান্তে এসে দাঁিড়য়েছে কমিউনিটি। শনিবার থেকে আগাম ভোট। এবং ৩ ফেব্রæয়ারী হবে চুড়ান্ত দিন। এর মধ্যে সবাইকে মেরী জোবাইদার নাম দেখে সেখানে ভোট দেয়ার আবেদন জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য যে, অ্যাসেম্বলি ডিস্ট্রিক্ট ৩৬ এর বিশেষ নির্বাচন পুরো কমিউনিটিতে রাজনৈতিক কৌতুহলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
মেয়র মামদানী দায়িত্ব নেয়ার পর এসেম্বলীম্যান হিসেবে তার এই পদ খালি হয়েছে। যার প্রেক্ষিতে এই শুন্য পদে আগামী ৩ ফেব্রæয়ারী হচ্ছে বিশেষ নির্বাচন।
মামদানী প্রাইমারী নির্বাচনে বিজয়ের পর পরই বাংলাদেশী আমেরিকান মেরী জুবাইদা গত জুলাই মাসে সম্ভাব্য খালি আসনে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে মাঠে নামেন। শুরু হয় গনসংযোগ ও ফান্ড রেইজিং। বাংলাদেশী কমিউনিটি সহ বিভিন্ন কমিউনিটির সমর্থনে তার প্রার্থীতা নিয়ে শুরু হয় চাঞ্চল্য। একক প্রার্থী হিসেবে নভেম্বর পর্যন্ত নির্বাচনী প্রচারনা চালিয়েছেন তিনি। ৪ নভেম্বর মামদানীর বিজয়ের পরবর্তী পর্যায়ে একই আসনে প্রতিদ্ব›দ্বীতার ঘোষণা দেন ইকুয়েডোরিয়ান ডায়ান মরেনো, মিশরীয় রানা আবদেলহামিদ ও ভারতীয় বংশোদ্ভুত শিবানী ধীর। তৃমুখী এই লড়াইয়ের প্রেক্ষিতে এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে বাংলাদেশী কমিউনিটি ঐক্যবদ্ধভাবে সমর্থন করছে মেরী জোবাইদাকে।
ডেমোক্রেটিক পার্টির আনুষ্ঠানিক সমর্থন না পেলেও মেরী জোবাইদা থার্ড পার্টি প্রতিদ্বন্বী হিসেবে প্রচারণা চালাচ্ছেন। ইতোমধ্যেই প্রায় ৩ হাজার ভোটারের স্বাক্ষর সংগ্রহ করে তিনি রীতিমত চমকে দিয়েছেন সবাইকে। মাঠের রাজনীতি, ভোটার সংযোগ এবং কমিউনিটি সংগঠনে অন্য প্রার্থীদের তুলনায় তার অবস্থান অত্যন্ত শক্ত বলেই মনে করা হচ্ছে।
মেরী জোবাইদা দীর্ঘদিন ধরে কুইন্সের অভিবাসী স¤প্রদায়ের বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে ঘনিষ্টভাবে কাজ করছেন। বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় ও বাংলাদেশি কমিউনিটির সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার স্বোচ্চার কন্ঠস্বর হিসেবে তার রয়েছে ব্যাপক পরিচিতি। শিক্ষা , স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, নারী ও শিশু সুরক্ষা এবং কমিউনিটিকে আইনি সহায়তা বিষয়ক কার্যক্রমই তার জনপ্রিয়তার মূল ভিত্তি। স্থানীয় ভোটারদের কাছে একজন সহযোদ্ধা এবং সমস্যা সমাধানে অগ্রনী কন্ঠস্বর হিসেবে তিনি সমাদৃত। মেরী জুবাইদা কেবল প্রার্থী নন, বরং কমিউনিটির প্রতি তিনি একজন দায়বদ্ধ সংগঠক হিসেবে পরিচিত। কমিউনিটি ও অলাভজনক সংস্থার সাথে কাজ করার রয়েছে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। যার ফলে বাস্তবভিত্তিক প্রচারণা এবং ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগের ওপর জোর দিচ্ছেন তিনি।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, বিশেষ নির্বাচনে ব্যালটে থাকার জন্য ন্যুনতম ১,৫০০ স্বাক্ষরের স্থলে বিভিন্ন কমিউনিটি থেকে প্রায় তিন হাজার স্বাক্ষর সংগ্রহ করে ব্যালটে তিনি তার নাম নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছেন। তার এই দ্রæত এবং বিস্তৃত স্বাক্ষর সংগ্রহ কমিউনিটিতে নিজের শক্তিশালী সমর্থন এবং গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ। এছাড়া নিউ ইয়র্ক সিটি রাজনীতিতে নিজের শক্ত অবস্থানকে আবারো স্পষ্ট করেছেন স্বল্প সময়ে প্রায় অসম্ভভ স্বাক্ষর সংগ্রহে সফলতার মাধ্যমে।
নিজ ইনস্টগ্রামের এক স্ট্যাটাসে মেরী লিখেছেন,“আমাদের কমিউনিটি এই প্রচারণাকে ব্যক্তিগতভাবে গ্রহণ করেছে। প্রচন্ড শীতের মধ্যে দ্বারে দ্বারে ভোটারদের সাথে কথা বলেছি আমরা। যার প্রমাণ হচ্ছে প্যায় তিন হাজার ভোটার পিটিশনে স্বাক্ষর দিয়ে প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়েছেন আমার প্রার্থিতাকে। এর মাধ্যমে প্রমানিত হয়েছে, প্রার্থী হিসেবে আমাদের অবস্থান অত্যন্ত শক্ত ও সুসংহত।”
কুইন্স ডেমোক্রেটিক পার্টি সমর্থন জানিয়েছে ডায়ানা মরেনোকে। তবে মাঠ পর্যায়ের ভোটার সংযোগ, কমিউনিটি উপস্থিতি এবং সরাসরি প্রচারনায় তিনি অনেকটাই পিছিয়ে। এস্টোরিয়া রং আইল্যান্ড সিটির বাসিন্দাদের কাছে ডায়ানা তেমন পরিচিত নন। এছাড়াও মাত্র কয়েকদিন আগে প্রভাবশালী পলিটিকো পত্রিকায় ডায়ানা মরেনো ও রানা আবদেলহামিদের বিরুদ্ধে তাদের স্টাফদের সাথে প্রতারনামুলক আচরনের খবর প্রকাশিত হয়েছে। যা নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে দুজনের প্রচারনাতেই।
বাংলাদেশী-আমেরিকান জোবাইদার নির্বাচনী এজেন্ডা মূলত স্থানীয় ও সামাজিক ইস্যুর ওপর কেন্দ্রীভূত। আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, নারীর নিরাপত্তা এবং কমিউনিটির কল্যাণমূলক নীতিই তার প্রচারণার মুখ্য ইস্যু। কেবল রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নয়, বাস্তবে সমস্যা সমাধানকারী হিসেবে এই নির্বাচনকে দেখছেন স্থানীয় ভোটাররা। যার ফলে বিশেষ নির্বাচনের প্রচারণা ইতিমধ্যেই অন্যান্য প্রার্থীর তুলনায় শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে গেছে তাকে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, অ্যাসেম্বলি ডিস্ট্রিক্ট ৩৬ এর এই নির্বাচন কেবল একটি আসনের জন্য নয়, বরং কমিউনিটি ভিত্তিক নেতৃত্ব এবং অভিবাসী ও সংখ্যালঘু স¤প্রদায়ের রাজনৈতিক দৃশ্যমানতার এক বড় পরীক্ষা এটি। ভোটের মাঠে জুবাইদার শক্তিশালী ভিত্তি, সক্রিয় স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক এবং ব্যাপক জনসমর্থন তাকে এই নির্বাচনে বিশেষ অবস্থান দিয়েছে। নিউইয়র্ক রাজনীতিতে কমিউনিটি ভিত্তিক নেতৃত্বের এই সাফল্য ভবিষ্যত রাজনীতির জন্য সৃষ্টি করতে পারে এক নতুন মডেল ।
আনুষ্ঠানিক দলীয় সমর্থন ছাড়াও কমিউনিটির সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং তৃণমুল রাজনীতি কতটা কার্যকর সেটাই প্রমানিত হওয়ার সম্ভাবনা এই নির্বাচনে। ৩ ফেব্রæয়ারীর ব্যালটে যে রায় আসবে, তা শুধুমাত্র একজন প্রার্থীর নয়, নিউ ইয়র্ক সহ যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অগ্রযাত্রার কমিউনিটির মাইলফলক হতে পারে মেরী জুবাইদার এই নির্বাচন।